তাঁকে ডাকা হয় ‘গ্র্যান্ডফাদার অব জোকস’ নামে। রম্য ম্যাগাজিন উন্মাদ–এর সম্পাদক হওয়ার সুবাদে তিনি অনেকের ‘বস’। এছাড়া আরও অনেক পরিচয়ে পরিচিত কার্টুনিস্ট ও রম্যলেখক আহসান হাবীবের জন্মদিন এ মাসের ১৫ তারিখে। সম্প্রতি রস+আলো তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিল ঢাকার মিরপুরে, উন্মাদ কার্যালয়ে। মিরপুরের বিখ্যাত ‘খ্যাতা পুরি’ খেতে খেতে কী বললেন তিনি? সঙ্গে ছিলেন আবদুল্লাহ মামুর, আদনান মুকিত, মহিতুল আলম ও মাহফুজ রহমান
রস+আলো: অন্যান্য ‘বস’ থেকে ‘বস’ আহসান হাবীবের পার্থক্যকী?
আহসানহাবীব: অন্যান্য বস তো সিরিয়াস বস, আমি হালকা–পাতলা বস। সবার সঙ্গে ক্যাজুয়াল একটা সম্পর্ক আছে বস হিসেবে।
র.আ.: বসকে বশ করতে অনেকে অনেক কিছু করে। ‘উন্মাদ’–কর্মীরা আপনাকে বশ করতে কী করে?
আ.হা.: আমাকে বশ করা সিম্পল। মিরপুরে একটা পুরি পাওয়া যায়, সেটার নাম ‘খ্যাতা পুরি’, সেটা নিয়ে এলেই আমি বশ হয়ে যাই!
র.আ.: ‘ও, আপনিই কবি আহসান হাবীব? আমার বাবা আপনার কবিতার খুব ভক্ত।’ এমন কথায় আপনার অনুভূতি কী হবে?
আ.হা.: এটা প্রায়ই হয়। অনেক স্কুলের প্রধান শিক্ষকও এসে বলেন, ‘আপনার কবিতা তো স্কুলে পড়াই।’ প্রথম দিকে সেটা এনজয় করি। প্রথমে একটা ভাব করি যেন আমিই কবি আহসান হাবীব। পরে অবশ্য ব্যাখ্যা করি, ‘আপনি যে কবি আহসান হাবীবের কথা বলছেন, তিনি অনেক আগে মারা গেছেন। আর আমি আসলে কার্টুনিস্ট।’ মজার বিষয় হলো কবি আহসান হাবীব বরিশালের যে স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন, আমিও সেখানে পড়াশোনা শুরু করেছিলাম! সেদিক থেকে আমাদের একটু মিল আছে!
র.আ.: আপনি তো কাটুর্নিস্ট, বাজারের লিস্টও কি ছবি এঁকেই করেন?
আ.হা.: একটা সময় ছিল যখন সবাই লিস্ট নিয়ে বাজার করতে যেত। এখন সেটা হয় না। অনেক সময় হয় কি আমার মেয়ে কিংবা স্ত্রীকে যখন কিছু একটা কিনতে দিই, তখন তাঁরা যদি সেটা না বোঝে তখন ছবি এঁকে বুঝিয়ে দিতে হয়। সেই অর্থে হয়তো মাঝেমাঝে আঁকতে হয়।
র.আ.: কোনটি শুনলে বেশি হাসি পায়? জোকস না কিছু রাজনীতিবিদের বাণী?
আ.হা.: রাজনীতিবিদদের বাণীগুলো যখন জোকসের সঙ্গে মিলে যায়, তখন হাসি পায়।
র.আ.: জলাভূমি থাকলে এডিস মশা হয়, আবার জলাভূমি না থাকলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। আপনার মতে এ সমস্যার প্রতিকার কী?
আ.হা.: এটা একটা জটিল সমস্যা। তবে উন্মাদে একটা সমস্যা বিভাগ আছে, সেখানে প্রশ্নটা পাঠালে এর একটা সমাধান দিতে পারব।
র.আ.: আমরা জানি আপনার ডাক নাম শাহীন । আপনি চাইলে শাহীনবাগে থাকতে পারতেন । পল্লবীতে থাকেন কেন?
আ.হা.: যেহেতু আমার মা পল্লবীতে একটা বাসা বানিয়েছেন, তাই থাকতে হচ্ছে।
র.আ.: নিউটনের জায়গায় আপনি হলে মাথার ওপর পড়া আপেল টানিয়ে কী করতেন?
আ.হা.: সত্যিই যদি একটা আপেল পড়ত তাহলে অ্যাপল কম্পিউটারের লোগোর মতো একটা কামড় দিয়ে রাখতাম।
র.আ.: ‘হ্যালো, এটা কি উন্মাদের অফিস?’ লেখার সময় একই নম্বর থেকে বারবার এমন ফোন এলে কী উত্তর দেন?
আ.হা.: আমি প্রতিবারই বলি, ‘হ্যাঁ, এটা উন্মাদের অফিস।’ আমি কখনোই রাগি না। যতবারই এই প্রশ্ন করবে, আমি বলব, ‘হ্যাঁ, এটা উন্মাদের অফিস।’ আমরা উন্মাদে যোগাযোগের জায়গায় টেলিফোন নম্বর না লিখে ‘সরাসরি গালি’ লিখতাম। একবার একজন ফোন করলেন, ‘আমি কি গালি দিতে পারি? আমি কিন্তু এই এই গালি দেব!’ আমি বললাম, ‘দেন।’ তিনি বললেন, ‘নাহ্, থাক!’
র.আ.: জাতীয় অর্থনীতিতে
‘উন্মাদ’–এর অবদান কতটুকু?
আ.হা.: উন্মাদ–এর অবদান তো আমি মনে করি সিরিয়াস! কারণ, উন্মাদ ছাপতে ৩৭ বছর ধরে আমরা দেশি নিউজপ্রিন্ট ব্যবহার করছি।
র.আ.: সবচেয়ে মজার এবং চিরন্তন পলিটিক্যাল জোকস কোনটি?
আ.হা.: এক লোক রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছেন। তার ছেলে এসে বলল, ‘বাবা, আমি রাজনীতি করতে চাই।’ বাবা বললেন, ‘তুমি সিরিয়াস?’ ছেলে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি সুস্থ রাজনীতি করতে চাই।’ বাবা বললেন, ‘হ্যাঁ, তুমি করতে পারো। কিন্তু এতে তোমার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। ঠিক আছে, আমার সাথে চলো।’ ছেলেকে নিয়ে তিনি ছয়তলায় উঠলেন। ছেলেকে বললেন, ‘এবার ছয়তলা থেকে লাফ দাও।’ ছেলে তো হতভম্ব! বাবা বললেন, ‘তুমি যদি রাজনীতি করতে চাও, তাহলে লাফ দাও!’ ছেলে তা–ই করল এবং হাত–পা ভেঙে ফেলল। বাবা নিচে নেমে ছেলেকে বললেন, ‘রাজনীতি করতে হলে নেতাদের কথা মানবা কিন্তু বিশ্বাস করবা না।’ এটাই হলো আমাদের রাজনীতির গূঢ়তত্ত্ব।
র.আ.: রাজনীতির ভেতর যখন পলিটিকস ঢোকে তখন...
আ.হা.: আসলে এটা অনেক পুরোনো একটা ব্যাপার। এখন আরও অ্যাডভান্স হয়ে পলিটিকসে ‘ট্রিকস’ ঢুকে গেছে।
র.আ.: সরকার জোকসের ওপর ভ্যাট বসিয়ে দিলে কী করবেন?
আ.হা.: এটা করা উচিত। অবশ্যই, সব জায়গায় যেহেতু ভ্যাট আরোপ হচ্ছে, জোকসের ওপরেও আরোপ করা উচিত! কারণ, জোকসই একমাত্র সাহিত্য, কেউ হয়তো কোনো বই পড়েনি, কিন্তু জোকসের বই পড়েছে। কাজেই এতে অনেক লাভবান হওয়া যাবে। তবে রাজনীতিবিদেরাও এখন যেভাবে ফানি কথা বলছেন, তাঁরাও তখন ভ্যাটের আওতায় চলে আসবেন!
র.আ.: অনেকেই বলেন, রম্য কোনো সাহিত্য নয় । এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
আ.হা.: এক বিখ্যাত লেখক বলেছিলেন, বাজারের ফর্দটাও যদি সুন্দর করে লেখা হয়, তাহলে সেটাও সাহিত্য। সাহিত্যের ব্যাপারটাই এটা, তুমি জোকস লিখলা, না প্রবন্ধ লিখলা, সেটা ব্যাপার না; তুমি কত সুন্দর করে লিখলা সেটাই সাহিত্য।

র.আ.: ইশকুল টাইম না অফিস টাইম—কোনটা বেশি মজার?
আ.হা.: স্কুল টাইমও না, অফিস টাইমও না, বিজনেস টাইমটা বেশি মজার। আমরা উন্মাদ অফিসে শুধু বসেই থাকি না। অনেক বিজনেস নিয়ে চিন্তা করি। আমরা একবার চিন্তা করলাম, আগুন জ্বালানোর ম্যাচ তৈরি করব। তখন কিন্তু লাইটার ছিল না।
প্রথমে চিন্তা করেছিলাম, ম্যাচের বারুদটা আমরাই তৈরি করব। বারুদের ফর্মুলাটা আবার নিয়েছিলাম বড় ভাইয়ের (হুমায়ূন আহমেদ) কাছ থেকে। এক সময় সালফার গুঁড়া করা শুরু হলো। হঠাৎ সেখানে ধপ করে আগুন জ্বলে উঠল। যে গুঁড়া করছিল তার হাত পুড়ে ম্যাসাকার! ওই প্রজেক্ট ওখানেই শেষ! আরেকবার আমরা আইকা তৈরি করব বলে চিন্তা করলাম। আইকা বানানোর আগে আমাদের পরিচিত একজনকে পাঁচ শ পিস কন্টেইনার তৈরির অর্ডার দিলাম। আইকা নিয়ে গবেষণার একপর্যায়ে বুঝলাম, এটা সম্ভব না! সেই প্রজেক্টও বাদ দিলাম। কিন্তু হঠাৎ করে দেখি, পাঁচ টনি ট্রাকে করে সেই পরিচিত লোক এক হাজার কন্টেইনার নিয়ে হাজির!
র.আ.: ‘উন্মাদ’–এর অফিসে কোনো মানব সম্পদ বিভাগ কিংবা অভ্যর্থনাকারী নেই কেন?
আ.হা.: না, সবই আছে। তবে টাইমটেবলটা একটু অন্য রকম। যেমন আমাদের অফিস সহকারী রাজীবের অফিসে আসার কথা সপ্তাহের ছয় দিন। কিন্তু সে শুধু মঙ্গলবার আসে, বাকি পাঁচ দিন আরেকটা অফিসে কাজ করে। এতে অবশ্য আমার কোনো সমস্যাই হয় না। সেও ঠিকঠাক বেতন পায়।
র.আ.: স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে ‘উন্মাদ’–এর মার্কা কী হবে?
আ.হা.: উন্মাদ–এর মার্কা তো আগে থেকেই আছে—হাই কমোড। এটাকে নেতিবাচকভাবে দেখা উচিত নয়। এটা একটা সিম্বল। যেকোনো আবর্জনা পরিষ্কার করার সিম্বল। পৃথিবীর অনেক বড় বড় দর্শন আর সাহিত্যও কিন্তু বাথরুমে পাওয়া গেছে।
র.আ.: ‘উন্মাদ’–এর সামনের দাঁত দুটো এত বড় কেন?
আ.হা.: উন্মাদ–এর দাঁতটা খরগোশের মতো। খরগোশ তার দাঁত দুটো সব সময় ক্ষয় করে, নাহলে সে মারা যাবে। আমাদের উন্মাদ–এর দাঁতটাও সেটাই করে, সব সময় কামড়ায় বা খোঁচা দেয়। আর চশমা দুটো হলো ম্যাগনিফাইং গ্লাস, সব সময় সে বেশি দেখে।
র.আ.: ‘উন্মাদ’ ডেন্টিস্টের কাছে দাঁতের চিকিত্সা করায় না কেন?
আ.হা.: করায় না, এটা ঠিক নয়। একবার ঠিক হলো টিভিতে উন্মাদকে নিয়ে একটা শো হবে। সেখানে যে উন্মাদ–এর ক্যারেকটারে থাকবে তার দুটো লম্বা দাঁত লাগবে। তখন আমরা এক ডেন্টিস্টের কাছে গিয়েছিলাম, দুটো দাঁত লাগানোর জন্য। ডাক্তার প্রথমে রাজি হয়নি। পরে উন্মাদ–এর কথা শুনে রাজি হলো। দাঁতও লাগানো হলো। কিন্তু অনুষ্ঠানটি আর হলো না।
র.আ.: ‘উন্মাদ’–এর দীর্ঘ পথচলায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে কেবা কারা?
আ.হা.: সবচেয়ে বেশি লাভবান তো হয়েছে মনে হয় ঠোঙা ব্যবসায়ীরা।
র.আ.: হঠাৎ দেখলেন উরুগুয়ের ফুটবলার লুইস সুয়ারেজ আপনার দিকে দৌড়ে আসছেন, কী করবেন?
আ.হা.: প্রথমে তাঁর অটোগ্রাফ নেব। আর তিনি যেহেতু কামড়ের জন্য আলোচিত, তাই বিখ্যাত লোকের কামড় খেলাম নাহয়!
র.আ.: খুবই হাসির একটা কৌতুক শোনানোর পরও কেউ না হেসে গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে থাকলে কেমন লাগে?
আ.হা.: তখন তো অবশ্যই খারাপ লাগে। হয় তিনি কৌতুকটা নিজেই তৈরি করেছেন, এ কারণে তিনি হাসছেন না। নয়তো কিছুক্ষণ আগেই তিনি এই কৌতুকটাই বলেছেন!
র.আ.: ভিড়ের মাঝে নিজের পকেট ভেবে হাত ঢোকানোর পর খেয়াল করলেন সেটা আসলে পাশের ষন্ডামার্কা এক লোকের পকেট, কী অজুহাত দাঁড় করাবেন?
আ.হা.: তখন বলব, ‘ভাই, কিছু মনে করবেন না। আপনার প্যান্টের মতো আমারও একটা আছে।’
র.আ.: সিনেমার নায়ক হলে ভিলেন হিসেবে কাকে নিতেন?
আ.হা.: আমি মারামারির নায়ক হতাম না। রোমান্টিক নায়ক হতাম।
র.আ.: নায়িকা কে হতো?
আ.হা.: সে ক্ষেত্রে আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করে নিতে হবে।

র.আ.: কার্টুনিস্ট হওয়ার সব থেকে বড়বিপদ এবং সব থেকে বড় সুবিধা কী?
আ.হা.: কার্টুনিস্ট হওয়ার কোনো বিপদ নেই। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, কার্টুন আঁকতে তেমন কিছুই লাগে না! আর্টিস্টের যেমন রং–তুলি লাগে, কার্টুনিস্টের তেমন লাগে না। একটা কলম হলেই হয়।
র.আ.: এই মুহূর্তে মাথায় যা ঘুরছে...
আ.হা.: তোমরা কখন বিদায় হবা! হা হা হা!
র.আ.: আমরা এখন বিদায় হচ্ছি ।যাওয়ার আগে জন্মদিনের আগাম শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ।
আ.হা.: তোমাদেরও ধন্যবাদ।