বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

পরিপাটি করে সাজানো হয়েছে বসার ঘর। স্টিলের কাঠামোর ওপর তৈরি খুব কম উচ্চতার চারটি বসার সোফা, চার রঙের। এক পাশে ডিভানের মতো আরেকটি বসার জায়গা করে ওপরে জুড়ে দেওয়া হয়েছে গদি। সব আসবাবই শিল্পী ঢালী আল মামুনের নিজের কিংবা তাঁর কোনো বন্ধুর ডিজাইন করা। স্থপতি বন্ধুর সহযোগিতায় ঘরের সাজসজ্জায় নিজের শিল্পভাবনা ফুটিয়ে তুলেছেন মামুন। ঘুরেফিরে একদিকের দেয়ালে চোখ আটকে যায়। সেখানে নানা আকৃতির বাঁশ–বেতের মাছ ধরার ফাঁদ। স্থানীয়ভাবে এগুলোকে বলে চাঁই।

default-image

নিচে দুটি ছোট টি–টেবিল। মাছ ধরার চাঁইয়ের ওপর কাচ বসিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই অভিনব টেবিল। টেবিলের ওপর কাঁসার সরা ও বাটি। একদিকে আছে ধামরাই থেকে সংগ্রহ করা মাটির সরা। ঢালী আল মামুনের মায়ের হাতে তৈরি নকশা করা একটি হাতপাখা টেবিলের ওপর রাখা আছে।

default-image

ঢালী আল মামুন জানান, অনেক আগে থেকেই মাছ ধরার ফাঁদের প্রতি তাঁর দুর্বলতা। সে কারণে বিভিন্ন সময় গ্রামগঞ্জ থেকে এগুলো সংগ্রহ করে ঘরে এনে রেখেছেন।

ফাঁদের মাঝখানে ঝুলছে শিল্পীর ছাত্রজীবনের আঁকা একটি কাজ। পাশেই একটি মুখোশ। জানালায় ঝোলানো কাগজ ও শুকনা পাতায় তৈরি বিভিন্ন পাখির অবয়ব বাতাসে দোল খাচ্ছে। দেয়ালে লাল ইট দিয়ে একটি আবরণ তৈরি করা হয়েছে। তাতে সাজিয়ে রাখা বিখ্যাত চিত্রকর কে জি সুব্রামানিয়নের (সবার মানিদা) একটি কাজ। পাশে শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য্য ও নিসার আহমদের দুটি কাজও রয়েছে। চন্দ্রশেখর দের একটি সরাও রয়েছে। ইট রঙের পুরো দেয়াল আলোকিত করেছে এসব চিত্রকর্ম।

default-image

দুই দশক আগের ওই ছবিতে হাত দিয়ে মুখঢাকা একজন নির্যাতিত বসার ঘরের আরেকটি দেয়ালে ঢালী আল মামুনের বড় একটি ক্যানভাসের চিত্রকর্ম নারীর প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। সমাজের নানা অসংগতি, ক্ষমতা, দখল, নিয়ন্ত্রণ, নির্যাতন, ইতিহাস ইত্যাদির প্রভাব রয়েছে শিল্পী ঢালী আল মামুনের কাজে। ঘর সাজানোর ক্ষেত্রেও এসব ভাবনাকে প্রাধান্য দিয়েছেন এই দুই শিল্পী। ঘরজুড়েই শোভা পাচ্ছে মেলা থেকে সংগ্রহ করা নানা মুখোশ, পুতুল।

default-image

ঘরের দেয়ালের ওপর বসার ঘরের পাশেই রাখা আছে বিহার থেকে আনা একটি মাদুর। মাঝেমধ্যে সেটা বিছানো হয় মেঝেতে। মামুনের কাজের একটি বড় অংশজুড়ে আছে তালপাতার সেপাই। ঘরের বিভিন্ন কোণেও তার প্রতিফলন পাওয়া গেল। তালপাতার সেপাই আকৃতির ছোট–বড় অনেক কাজ। বসার ঘরের দেয়ালের পাশে রাখা হয়েছে বড় একটি তালপাতার সেপাই।

কাচগুলোও নকশা করেছেন মামুন। তাতে নানা কারুকাজ করা হয়েছে। কাচের পাশে চুড়ি দিয়ে তৈরি কিছু বৈদ্যুতিক বাতির শেড। পাশে মেলা থেকে সংগ্রহ করা পুতুল, মুখোশসহ নানা সামগ্রী।

default-image

বসার ঘরের পাশেই একটি খাবার টেবিল। গোলাকার টেবিল–চেয়ারগুলোও শিল্পী নিজে নকশা করেছেন। টেবিলের ওপর প্লেটের নিচে দেওয়ার জন্য (প্লেসমেট) পাটি ও বেতের তৈরি চট রাখা আছে। সেদিকে ইঙ্গিত করে শিল্পী দিলারা বেগম জলি বলেন, ‘এই চটগুলো আমার শাশুড়ির তৈরি করা। খাবার টেবিলের প্লেটগুলোও বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা, তাই একটু ভিন্ন।’

ঘরের এক পাশে রয়েছে একটি পুরোনো ড্রেসিং টেবিল। কাঠের এই ড্রেসিং টেবিল ঢালী আল মামুনের মা মোবাশ্বেরা বেগম ব্যবহার করতেন। এক পাশে বাবা ওয়ালিউল্লাহ ঢালীর ব্যবহৃত একটি ছোট টেবিলও রয়েছে।

ঢালী আল মামুন বলেন, ‘আমরা অতীতের অনেক সময়ের সঙ্গে বর্তমানকে নিয়ে বাঁচি। মায়ের টেবিলটি পাকিস্তান আমলের। বাবারটি ব্রিটিশ সময়কার। এসব জিনিস কাছে থাকলে তাঁদের সঙ্গে থাকা হয়।’

default-image

ঘরের এক কোণে একটি বেসিন রয়েছে। বেসিনের স্ট্যান্ডটিও নিজের পছন্দমতো তৈরি করেছেন শিল্পী দম্পতি। বেসিনের নিচে মামুনের নানির তৈরি একটি //চিক্কাবন্দী// বোতলও রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ঘরজুড়ে রয়েছে রাজশাহী থেকে আনা ঝাঁজর, নানা রঙের মাটির পুতুল, বিভিন্ন স্থাপনাকর্ম।

দিলারা বেগম জলি বলেন, ‘কল্পনা আর বাস্তব জগতের সঙ্গে মিলেমিশে চলছে জীবনযাপন। কাজ করতে করতে মাঝেমধ্যে কল্পনায় ঢুকে পড়ি। ঘরের মধ্যে অতীত–বর্তমানের বিভিন্ন সামগ্রী রাখার চেষ্টা করেছি। এ ছাড়া রয়েছে বেশ কিছু বড় বড় শিল্পীর কাজ। যেমন রামকিঙ্কর বেইজ, মানিদা, যোগেন চৌধুরী, সোমনাথ হোরসহ বেশ কিছু গুণী মানুষের কাজ সংগ্রহে রেখেছি।’

default-image

শোবার ঘরেই আঁকাআঁকির কাজ করেন দিলারা বেগম। এখন তিনি কাজ করছেন সুই দিয়ে। শোবার ঘরটিতেও শিল্পের ছাপ। দেয়ালে রাখা আছে কে জি সুব্রামানিয়ানের একটি সরা। শোবার ঘর লাগোয়া একটি বারান্দা রয়েছে। তাতে ছোট একটি বাগান। মাঝেমধ্যে শিল্পী দম্পতি বারান্দায় বসে আকাশ দেখেন। প্রতিটি ঘরে প্রচুর আলো–বাতাস চলাচল করে। শৌচাগারের ছাদও কারুকাজ করা হয়েছে বিশেষভাবে।

অন্য একটি কক্ষে কাজ করেন ঢালী আল মামুন। সেখানে রংতুলি, বই, ক্যানভাসসহ নানা সামগ্রী। তিনি এখন ইতিহাসভিত্তিক একটি কাজে হাত দিয়েছেন। বাঙালির ইতিহাস পলাশীর যুদ্ধ নিয়ে বড় একটি ক্যানভাসে কাজ করছেন। চা–পাতা, এলাচিসহ বিভিন্ন মসলাজাতীয় জিনিসের মাধ্যমে কাজটি তিনি করছেন।

default-image

১ হাজার ৫০০ বর্গফুটের অ্যাপার্টমেন্টে একটি অতিথিকক্ষও রয়েছে। সেই ঘরও সাজানো হয়েছে নানা শৈল্পিক উপকরণে। ঢালী আল মামুন বলেন, ‘বড় দামি কোনো জিনিসের প্রতি আমার আকর্ষণ নেই। একেবারে সাদামাটা আসবাব দিয়ে ঘর সাজিয়েছি। মূলত আলো–বাতাসের দিকটি ভেবেছি। প্রতিটি ঘরে আলো রয়েছে। এটি বড় একটি ব্যাপার।’ আসলেই, বাসা তো এমনই হবে, যেখানে গা এলিয়ে শান্তি পাওয়া যাবে।

ঈদ উপলক্ষে ঘরে বাড়তি কোনো সাজসজ্জা করা হয় না। তবে এই দম্পতির মনে ও মগজে প্রতিটি উৎসবের রং ছুঁয়ে যায়। ঢালী আল মামুনের মা যখন বেঁচে ছিলেন, তখন তাঁকে ঘিরে ঈদ উপলক্ষে ভাইবোনদের মিলন হতো। মা চলে যাওয়ার পর তাতে কিছুটা ভাটা পড়েছে। তবে উৎসবের আনন্দে থাকতে পছন্দ করেন তাঁরা। আর সুযোগ পেলেই কাছে–দূরে কোথাও বেড়াতে ছুটে যান এই শিল্পী দম্পতি।

শিল্পী দম্পতির বাড়ি থেকে যখন বেরোচ্ছি, তখন মনে হলো এ বাড়িতে ঢোকার পর কাউকে বলে দিতে হবে না এ বাড়ির বাসিন্দাদের পেশা কী, কী কাজ করেন তাঁরা। আসলে যে বাড়িতে আমরা বাস করি, সেটা তো আমাদের চিন্তা ও রুচিরই প্রতিফলন। অতীত আর বর্তমানের মিশেল!

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন