দেওয়ান বনাম দেওয়ান

দলের নেতৃত্বে এখন আদিবাসী নেতা। সে কারণে সাংগঠনিকভাবে দৃঢ় অবস্থানে আছে রাঙামাটি জেলা বিএনপি। তবে দুই দেওয়ানকে ঘিরে বিভক্তির কারণে বেকায়দায়ও পড়েছে দলটি। দুই দেওয়ানই আগামী সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে কেন্দ্রে লবিং চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
দুই দেওয়ান হলেন, জেলা বিএনপির সভাপতি, সাবেক জ্যেষ্ঠ সহকারী জেলা জজ দীপেন দেওয়ান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা মনীষ দেওয়ান। দুই দেওয়ানই দলে কোন্দলের কথা সরাসরি স্বীকার করেননি। তাঁদের বক্তব্য, বড় দল হিসেবে একটু মতভেদ থাকতেই পারে।
দীপেন দেওয়ান বলেন, ‘মনীষ দেওয়ানের সঙ্গে আমার কোন্দল থাকার প্রশ্নই আসে না। তিনি সদ্য বিএনপিতে যোগদানকারী। তিনি ঢাকায় থাকলেও রাঙামাটি এলে আমার নেতৃত্বে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেন।’ মনোনয়ন চাওয়ার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে দীপেন দেওয়ান বলেন, ‘শুধু মনীষ দেওয়ান কেন, সবারই মনোনয়ন চাওয়ার অধিকার আছে।’
মনীষ দেওয়ান বলেন, ‘দলে দ্বন্দ্ব নেই, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা আছে। সেই সূত্রে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙামাটি আসনে অবশ্যই দলের মনোনয়ন চাইব। তবে দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তাঁর হয়ে আমরা সবাই কাজ করব।’
রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপেন দেওয়ান ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরে বিচার ক্যাডারে যোগ দেন। রাঙামাটি আসন থেকে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য জ্যেষ্ঠ সহকারী জজ থেকে ২০০৭ সালে স্বেচ্ছায় অবসরে যান। কিন্তু আইনের বাধ্যবাধকতার কারণে ২০০৯ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেননি। তবে দলকে গুছিয়ে জেলা শাখার সভাপতি হন। অপরদিকে, সাবেক সেনা কর্মকর্তা মুক্তিযোদ্ধা মনীষ দেওয়ানও ২০১০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন। এরপরই শুরু হয় দুই দেওয়ানের নেতৃত্বের কোন্দল।
এদিকে গত জুলাই মাসে একটি সেমিনারে যোগ দিতে বিএনপির মহাসচিবের নেতৃত্বে যুক্তরাজ্য সফর করার পর দলে মনীষ দেওয়ানের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে বলে মনে করেন দলের তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। গত বৃহস্পতিবার রাঙামাটি পৌরসভার মেয়র ও শহর বিএনপির সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে বিএনপিদলীয় জনপ্রতিনিধিরা ঢাকায় মহাসচিবের সঙ্গে দেখা করে মনীষ দেওয়ানকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দিতে অনুরোধ করেছেন।
মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘দীপেন দেওয়ানের অন্তর্মুখী রাজনীতির কারণে আমরা মনীষ দেওয়ানের পক্ষ নিয়েছি।’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দলে দীপেন দেওয়ানের শক্ত অবস্থান থাকলেও সহযোগী সংগঠনগুলোতে মনীষ দেওয়ানের অবস্থান ভালো। আবার বিএনপির আদিবাসী সদস্যদের মধ্যে দীপেন দেওয়ানের অবস্থান শক্ত।
বিএনপি ও ছাত্রদলের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২৯ ও ৩০ আগস্ট কেন্দ্র থেকে বিএনপি ও ছাত্রদলের দুটি প্রতিনিধিদল পৃথকভাবে রাঙামাটি সফর করে। ওই সময় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন দিতে দুই দেওয়ানের অনুসারীরা কেন্দ্রের কাছে যুক্তিসহকারে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেছেন। তবে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করে ভবিষ্যতে সরকার গঠনে একযোগে কাজ করার পরামর্শ দেন।
তবে তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা মনে করেন, জেলা পর্যায়ে দুই দেওয়ানের অনুসারীদের নানা তৎপরতায় জেলা, উপজেলা, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের বিএনপি এবং সহযোগী সংগঠনগুলোতে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। তবে সম্প্রতি বিভক্তি কমিয়ে আনার চেষ্টাও চলছে। সেই প্রচেষ্টার ফল হিসেবে দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে রাঙামাটি শহরে নিজেদের পক্ষের নেতা-কর্মীদের নিয়ে দীপেন দেওয়ান ও মনীষ দেওয়ান একসঙ্গে শোভাযাত্রা করেন।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম বলেন, আসলে দুই দেওয়ানের দ্বন্দ্ব নয়, প্রতিযোগিতা চলছে। বড় দল হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ার প্রতিযোগিতা থাকতেই পারে। তবে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সম্পাদক দীপু তালুকদার বলেন, ‘দলে দ্বন্দ্ব যে আছে সেটা কেন্দ্রের অজানা নয়। আমরা চাই দলের বৃহত্তর স্বার্থে দ্বন্দ্ব নিরসন হবে।’