নটবর আকরাম খান

আকরাম খান
আকরাম খান

আকরাম খান একটি কিংবদন্তী নাম। সর্বসাধারণ্যে হয়তো নয়, তবে আন্তর্জাতিক মানের নৃত্যকলা মহলে তো অবশ্যই। যদিও ২০১২ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক খেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মুখ্য অংশটিতে তিনি ও তাঁর কোম্পানির সদস্যদের চমক লাগানো নৃত্যপ্রদর্শনী সারা বিশ্বব্যাপী প্রচারিত হবার ফলে তিনি এখন অসংখ্য ক্রীড়ামোদীর কাছেও একটি পরিচিত নাম। সমসাময়িক কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার হিসেবে স্বীকৃত ও সম্মানিত তিনি।
তিনি কাজ করেছেন বিখ্যাত পাকিস্তানি-ব্রিটিশ লেখক-চলচ্চিত্রনির্মাতা-নাট্যকার হানিফ কোরেশীর (১৯৫৪...) সঙ্গে। কাজ করেছেন অস্ট্রেলিয়ান কণ্ঠশিল্পী ও সুরকার কাইলি মিনগোর (১৯৬৮...) সঙ্গেও। অরুন্ধতী রায় ও অরবিন্দ আদিজার সাথে কাজ করবেন ভবিষ্যতে এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন সামপ্রতিক এক সাক্ষাত্কারে। ভারত উপমহাদেশের কৃষিজীবীদের নিয়ে অরুন্ধতী রায়ের ধ্যাণ ধারণায় অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি রচনা করেছিলেন তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি ‘মা’। যা আমার দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল মন্ট্রিয়েলের এক মিলনায়তনে।
আকরাম খান বর্তমান যুগের আধুনিক নৃত্যকলার এক দুর্বার শক্তি। তিনি কেবল নৃত্যেই নয়, নৃত্যের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত না হয়েও রূপকল্পের আত্মীয়তায় আবদ্ধ। শিল্পকলার এমন সব শাখার প্রতিও সাগ্রহে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং তাদের সৃষ্টি থেকে গ্রহণ করেছেন তাঁর নিজের পুষ্টিসার। সে কারণেই হয়তো ভারতীয়-ব্রিটিশ ভাস্কর অনিশ কাপুর (১৯৫৪...) ও ব্রিটিশ ভাস্কর-নৃত্যশিল্পী এন্টনি গর্মলি (১৯৫০...) আকরাম খানের সঙ্গে কাজ করতে বিপুলভাবে আগ্রহী। এই লোকেদের কেউই নগণ্য নন, সবাই বিবিধ পদক-পদবী প্রাপ্ত খ্যাতনামা ব্যক্তি, শিল্পকলা জগতে তাঁদের সকলেরই আকাশচুম্বী প্রসিদ্ধি।
২০০৫ সালে আকরাম রচনা করেছিলেন জিরো ডিগ্রি নামক একটি রূপক কাহিনি। যার মঞ্চায়নে মুখ্য ভূমিকায় অংশগ্রহণ করেছিলেন বিখ্যাত বেলজিয়ান নৃত্যশিল্পী সিদি লার্বি চের্কাওয়ি। কাহিনিটির মূল বিষয়, যা আকরাম খানের সকল সৃষ্টিকর্মেরই একটি অন্তঃস্রোতা সুরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তা হলো ‘আত্মপরিচয়’। অর্থাত্ আমরা কারা। পৃথিবীর বৃহত্তর মানচিত্রে আমার অবস্থান কোথায়। এতে সহযোগিতা করেছিলেন এন্টনি গর্মলি ও ভারতীয় সংগীতবিশারদ নিলিন নহি।
২০০৮ সালে আকরাম খান অংশ নিয়েছিলেন আরও একজন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রশিল্পী জুলিয়েট বিনোশ (১৯৬৪...) এর সঙ্গে। লণ্ডনের রয়েল ন্যাশনাল থিয়েটারে অনুষ্ঠিত রহ-ও শীর্ষক নৃত্যনাট্যে। প্যারিসে জন্মগ্রহণ করা মিস বিনোশ ইংলিশ প্যাশেন্টসহ আরও অনেক চলচ্চিত্রে মূল নায়িকার ভূমিকাতে অভিনয় করে বিশেষ খ্যাতি ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। রহ-ও এর নির্মাণকালে মিস বিনোশ আর তিনি যখন একসঙ্গে কাজ করছিলেন, সেসময়কার অভিজ্ঞতার ওপর আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেত্রী ও ব্যালেরিনা বিনোশ মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেন, আকরাম খান যা কিছু উচ্চারণ করতেন, মুখে তাই তিনি আবৃত্তি করে যেতেন। যা কিছু অঙ্গভঙ্গি দেখাতেন তাঁকে, তাই তিনি ছোট্ট খুকির মতো নকল করে যেতেন পাকা দুঘন্টা, বিরামহীনভাবে।
নৃত্যমঞ্চে আকরাম খান একটি ঐশ্বরিক ব্যক্তিত্ব। অন্য সকলেই তাঁর অতি বাধ্য বিনীত শিষ্যমাত্র, নিজ নিজ জায়গাতে তাঁরা যতই বিখ্যাত হোন না কেন। আকরাম খানের নৃত্যপারদর্শিতা নিয়ে মন্তব্য করেছেন এক প্রতিবেদক, ‘হি ইজ দ্য ডার্লিং অব দ্য ড্যান্স ওয়ার্ল্ড, অ্যান্ড বিয়ন্ড, উইথ আর্টিস্টস সাচ অ্যাজ অনিশ কাপুর অ্যান্ড এন্টনি গর্মলি লাইনিং আপ টু ওয়ার্ক উইথ হিম।’ ভাবতে অবাক লাগে কত বড় মাপের শিল্পী তিনি যে ভাষ্কর্য আর কথাসাহিত্যের মতো ভিন্ন জগতের নামকরা মানুষগুলোও ওঁর সঙ্গে কাজ করার জন্যে উদগ্রীব থাকেন।
ছোট আকারের এই বিশাল পুরুষটি কে?
হ্যাঁ, তিনি বাঙালি।
হ্যাঁ, তিনি বাংলাদেশি বাঙালি।
হ্যাঁ, তিনি বাংলাদেশি মুসলমান বাঙালি।
এবং হ্যাঁ, তিনি জন্মসূত্রে ব্রিটিশও।

দেশ নৃত্যনাট্যের একটি দৃশ্যে আকরাম খান
দেশ নৃত্যনাট্যের একটি দৃশ্যে আকরাম খান

আকরাম খানের জন্ম ২৯ জুলাই, ১৯৭৪ সালে। লণ্ডনের উইম্বলডন অঞ্চলে। তাঁর বাবা, মোশাররফ হুসেন খান, ১৯৬৯ সালে লণ্ডনে এসে ওই উইম্বলডনের কাছাকাছি বালাম অঞ্চলে একটি রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করেন। খান সাহেবের জন্ম নবাবগঞ্জের আলগীর চর গ্রামে। আকরাম খানের মা, আনোয়ারা খান (ডাকনাম মিতা) স্বামীর সঙ্গে যোগ দেন ১৯৭৩ সালে। আনোয়ারা খানের বাবা, আজিজুর রহমান খলিফা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিভাগের একটি কিংবদন্তী নাম। আমি নিজে তাঁর ছাত্র ছিলাম স্নাতকশ্রেণীর পুরো তিনটি বছর। অঙ্কশাস্ত্রে যেটুকু সামান্য জ্ঞান আমি অর্জন করেছি তার অনেকটাই তাঁর কাছ থেকে পাওয়া। তাঁর আদিবাস নদিয়ার শান্তিপুর অঞ্চলে। দেশভাগের পরপরই তিনি সপরিবারে চলে এসেছিলেন ঢাকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান পরিষদ, বিশেষ করে গণিত বিভাগে, তখন চরম শিক্ষকসংকট। হিন্দু অধ্যাপকদের অধিকাংশই চলে গিয়েছিলেন ওপার বাংলায়। উপযুক্ত অধ্যাপকের নিদারুণ অভাব সেসময়। তখন এই লোকটি, আমাদের অতিপ্রিয় খলিফা স্যার, একা, স্নাতক ক্লাসের তিনটি পেপারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন এবং অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেই স্বারোপিত দায়িত্ব তিনি পালন করেছিলেন, যা তাঁর প্রাক্তন ছাত্ররা পরম কৃতজ্ঞতার সঙ্গে মনে রেখেছে আজীবন।
খলিফা সাহেবের জীবনে অঙ্ক ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ের স্থান ছিল কি না জানি না, তবে তাঁর মেয়ের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল, তিনি খুব গল্প-উপন্যাস পড়তে পছন্দ করতেন। রবীন্দ্র রচনাবলীর পুরোটাই নাকি তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল। তবে গানবাজনা নৃত্যকলাতে তেমন আগ্রহ বোধ হয় তাঁর ছিল না, যতটা ছিল তাঁর স্ত্রীর। আসলে মিতা খানের মা, সে সময়কার অতি রক্ষণশীল, গোঁড়া মুসলিম সমাজের চোখ ফাঁকি দিয়ে, লুকিয়ে লুকিয়ে, তাঁর মেয়েকে নাচ শিখিয়েছিলেন। নৃত্যকলার প্রতি বিশেষ একটা অনুরাগ নিয়েই হয়তো জন্মগ্রহণ করেছিলেন মিতা, আকরাম খানের অনেক গুণের উত্স হয়তো তিনিই। ওদিকে তাঁর বাবা মোশাররফ হুসেনের পরিবারও শিক্ষাদীক্ষা শিল্পকলাতে একেবারে উদাসীন ছিলেন তা নয়। তিনি নিজে ছাত্রবয়সে নাট্যাভিনয় করেছেন। তাঁর এক ছোট বোন, বন্যা, বাফা (বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টস) থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উচ্চমানের নৃত্যশিল্পী হিসেবে একসময় খ্যাতিলাভ করেছিলেন দেশের শিল্পানুরাগী মহলে। বাংলা টিভিতে নৃত্য পরিবেশনও নাকি করেছেন কিছুদিন। সুতরাং বলা যায়, নাচের তালে তালেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন আমাদের আকরাম খান। ওটা তাঁর রক্তে, তাঁর জিনের ভেতর।
মিতা খানের শিল্পানুরাগের জীবন যে বেশিদূর এগুতে পারেনি সে তো বলাই বাহুল্য। যদি তিনি জন্মাতেন অন্য কোনও দেশে, অন্য কোনও সময়, তাহলে ভবিষ্যতে একদিন মার্থা গ্র্যাহাম বা আনা পাভলোভার মতো বিশ্ববিখ্যাত নৃত্যশিল্পী হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারতেন কি না কে বলবে। বাংলাদেশের গতানুগতিক মুসলিম পরিবারে মেয়েদের সে-স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। বুকভরা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তাঁরা যখন সন্তানের মা হন তখন তাঁদের প্রাণের কোনো গোপন সুড়ঙ্গ বেয়ে সেই সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা একসময় সেই সন্তানের শরীরে রোপণ করার চেষ্টা করেন। তাঁর নিজের ব্যর্থ স্বপ্ন একসময় সন্তানের স্বপ্নতে পরিণত হয়। শোনা যায়, আকরাম খানের বয়স যখন দুই কি তারও কম তখনই তার পায়ের মধ্যে তাল আর ছন্দের আভাস পরিলক্ষিত হতে শুরু করে। একবার তার ফুফু, বন্যা, লণ্ডনে ভাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসে লক্ষ্য করেন দুবছরের শিশুর আশ্চর্য তালজ্ঞান। টিভির পর্দায় দেখা নর্তকীর নাচের সঙ্গে নিখুঁত সমন্বয় রেখে নেচে যাওয়ার চেষ্টা। বন্যা তাঁর ভাবী মিতাকে বললেন, ওকে বোধহয় নাচের ক্লাসে দেওয়া উচিত ভাবি।
ছেলেকে নাচ শেখানোর কল্পনা হয়তো বাবা-মা কারুরই ছিল না গোড়াতে। কিন্তু তার চরিত্রের আরেকটি বৈশিষ্ট্যের কারণে শেষ পর্যন্ত তাঁদের সিদ্ধান্ত সেদিকেই মোড় নেয়। আকরামের অতিরিক্ত দুরন্তপনা আর চঞ্চল স্বভাব। এতই চঞ্চল যে তার ব্যবহার তাঁদের সহ্যের বাইরে চলে যাচ্ছিল। ভেবে পাচ্ছিলেন না কি ভাবে ছেলেকে শান্ত করা যায়। বন্যার প্রস্তাব শুনে ওঁরা ভাবলেন, কে জানে, নাচের প্র্যাকটিস করে করে ক্লান্ত হয়ে গেলে ছেলে হয়তো সত্যি সত্যি একটু দমে যাবে। তখন থেকেই আকরাম খানের নাচের তালিম শুরু এবং সেটা মায়ের স্কুলে। নাচ শিখতে বেশ পরিশ্রম লাগে, রীতিমতো ঘাম ছোটে শরীরে। তারপর অন্য কিছু করার মতো তেজ থাকে না গায়ে। খেয়েদেয়ে সোজা ঘুমোতে চলে যাওয়া। কিন্তু নাচ শেখাতে শেখাতে তার মা আবিষ্কার করলেন যে, তাঁর ছেলে আর দশটা ছেলেমেয়ের মত দায়সারা ভাবে নেচেই ক্ষান্ত হওয়ার মতো নয়, তার ভেতরে আলাদা কিছু আছে। স্বতন্ত্র একটা প্রতিভা, যা না থাকলে কেউই এগুতে পারে না খুব একটা। উত্সাহিত হয়ে দ্বিগুণ উদ্যমের সঙ্গে নাচ শেখাতে থাকলেন ছেলেকে। ভবিষ্যতে বড় কিছুর লক্ষণ হয়তো তখনই তিনি দেখতে পেয়েছিলেন আকরাম খানের নাচের মধ্যে। দৃপ্ত পদচারণা, ধনুকের মতো ঋজু শরীর, দ্রুত আবর্তন, কথক নৃত্যের জন্যে যা যা প্রয়োজন সবই ছিল তাঁর শিশুপুত্রের মাঝে। সর্বোপরি ছিল আকরামের দারুণ আগ্রহ নৃত্যানুশীলনের প্রতি। ওই বয়সে বাচ্চাদের দিয়ে রোজ নিয়ম করে প্র্যাকটিস করানো যে কোনো বাবামায়ের জন্যে ভীষণ কসরতের ব্যাপার। আকরামের বেলায় তা হয়নি। তবে এটাও ঠিক যে শত হলেও আকরাম তখন ছোট বাচ্চা বই কিছু নয়। তার মন ঘুরেফিরে চলে যেত টেলিভিশনের ‘নাইট রাইডার’ প্রোগ্রামের দিকে বা মাইকেল জ্যাকসনের নাচগানের দিকে। সেই বালসুলভ দুর্বলতা থেকে ছাড়িয়ে তাকে নাচের প্র্যাকটিসে নিয়ে যাবার দায়িত্বটি মিতা খান প্রায় এককভাবেই পালন করতেন।
পাঠকের কৌতূহল জাগা স্বাভাবিক যে আকরাম খান কি তাহলে কোনো গতানুগতিক শিক্ষা পাননি? না তা নয়। অবশ্যই পেয়েছিলেন। তবে খান পরিবারের অন্যান্যরা বা তাঁদের বন্ধুবান্ধবের ছেলেমেয়েরা ভালো ভা্লো প্রাইভেট স্কুলে গিয়ে লেখাপড়া করেছে। তারপর বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বড় বড় ডিগ্রি করে ভালো ভা্লো চাকরি নিয়েছে। আকরাম খানের বেলায় তা হয়ে ওঠেনি। তাঁর ছোট বোন, যার জন্ম হয়েছিল ১৯৭৮ সালে এবং বড় ভাইয়ের অনুকরণে ও মায়ের তাড়নাতে নিজেও ভালো নাচ করতে শিখেছে, সেও প্রাইভেট স্কুলে ঢোকার সুযোগ পেয়েছিল। আকরাম খান সে ব্যাপারে নিজেই বলেন অকপটে, ‘নাহ, আমার দ্বারা সেটা হয়ে ওঠেনি। কোনো প্রাইভেট স্কুলেই আমি ভর্তিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারিনি।’ তবে সাধারণ স্কুলের পড়াশোনা তাঁর অবশ্যই ছিল। কিন্তু তাঁর মন ছিল প্রধানত নাচের মধ্যে। তাঁর মা শেখাতেন কথক নাচ, যাতে অনেক গোণাগুণির ব্যাপার আছে। আছে অনেক ভগ্নাংশের মারপ্যাঁচ, অর্থাত্ গণিত। সেগুলোতে আকরাম খানের কোনো সমস্যাই হয়নি কোনোদিন। গোনাগুণির কাজটা অতি সহজেই করে ফেলতে পারতেন। তাতে করে ছোটবেলায় একসময় এমন একটা ধারণা হয়ে গিয়েছিল তাঁর যে তিনি বুঝি তাঁর নানার মতো গণিতের জিনিয়াস বা সেরকম কিছু হবেন বড় হয়ে। তা তিনি হননি বটে, তবে মায়ের লাইনের জিনিয়াস হয়েই যে জন্মেছিলেন তার লক্ষণ সেই এতটুকু বয়স থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। বয়স যখন তিন তাঁর মা তাকে নিয়ে যেতেন প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে, নাচ দেখাবে বলে। ইতিমধ্যে সুনাম ছড়িয়ে গিয়েছিল পাড়ায় পাড়ায় যে খান পরিবারের তিন বছরের ছেলেটি দারুণ নাচতে পারে।
প্রথম প্রথম অনুষ্ঠান করতে গিয়ে আকরাম খান খুব নিরুত্সাহী হয়ে পড়তেন। নাচতে থাকাকালেই লোকজনের গালগল্প আর ওঠাবসাতে ভয়ানক বিরক্ত হয়ে যেতেন তিনি। তখন তার মা তাকে বলতেন, ‘ওরা যাতে গল্প থামিয়ে তোমার নাচের দিকে তাকিয়ে অবশ হয়ে যেতে পারে এমন নাচ দেখানোর চেষ্টা কর, তাহলেই বুঝব তুমি কত বড় নাচিয়ে।’ আসলে ঠিক তাই হয়েছিল। ওটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে ধরে নিয়ে এমন আশ্চর্য সব নাচ পরিবেশন করতে থাকলেন যে শ্রোতা-দর্শক যেন মন্ত্রপড়া পুতুলের মতো বোবা হয়ে কেবল তাকিয়ে থাকলেন ওর দিকে নড়াচড়া করতেও যেন ভুলে গেলেন। অর্থাত্ দর্শকদের কি ভাবে জমিয়ে রাখতে হয় সে কৌশলটি তিনি আয়ত্ত করে ফেলেছিলেন বলতে গেলে শৈশবেই।
অচিরেই এটা পরিষ্কার হয়ে গেল মিতা খানের কাছে যে, তাঁর ছেলে সাধারণ মেধা নিয়ে জন্মায়নি, অতএব তাকে সাধারণ প্রশিক্ষণের খোপে ধরে রাখা যাবে না, উচিতও না। আকরামের বয়স যখন সাত তখন তিনি ওকে নিয়ে ভর্তি করালেন নামকরা কথকশিল্পী শ্রী প্রতাপ পাওয়ারের নাচের স্কুলে। সত্তর আর আশির দশকে এই শিক্ষকটি ছিলেন লণ্ডনের নৃত্যকলা জগতের অবিসংবাদিত অধিপতি। ভারত, ব্রিটেন, কানাডা, ঘানা আর ট্রিনিদাদ মিলিয়ে তাঁর ছাত্রপছাত্রী আর শিষ্যসংখ্যা হয়তো এক হাজারে পৌঁছে গেছে ইতািমধ্যে। মিতা খান নিজে ছিলেন কথকের অনুরাগী, অতএব তাঁর মেধাবী ছেলেকে কথকের সবচেয়ে ভালো শিক্ষকের কাছে নিয়ে যাবেন সেটাই তো স্বাভাবিক। সেসময় আকরামের হয়তো নিজস্ব কোনও পছন্দ-অপছন্দ দানা বেঁধে ওঠেনি, সুতরাং কথক না ভারতনাট্যম না মনিপুরি, তা’ই বা সে বুঝবে কেমন করে। পদ্মশ্রী উপাধিপ্রাপ্ত প্রতাপ পাওয়ার হয়তো প্রথম তালিমেই বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর এই নতুন ভর্তি-হওয়া মুসলমান বাংলাদেশি ছাত্রটি তাঁর অন্যান্য ছাত্রছাত্রীদের মতো নয়। তাদের চেয়ে অনেক, অনেক কাঠি ওপরে।
তিনি নিজে ছিলেন ভারতের নামকরা গুরু, লক্ষেৗ ঘরানার পণ্ডিত বিরজু মহারাজের শিষ্য। শিষ্যত্বের উপযুক্ত গুণাবলি সবই তিনি দেখতে পেলেন আকরামের ভেতর। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন যে এই ছেলেকে তাঁর সব বিদ্যা, সব জ্ঞানের ভাণ্ডার ঢেলে দিতে হবে। ছাত্রের গৌরব যে শিক্ষকেরই গৌরব সেটা তিনি ভালো করেই জানতেন। কথক শেখার জন্য ভারতীয় সংগীতের আরও অনেক শাখার সঙ্গে পরিচয় থাকতে হয়, বুত্পত্তি অর্জন করতে পারলে তো আরও ভালো। সবচেয়ে প্রয়োজনীয় যে যন্ত্রটি সেটি বোধহয় তবলা। কথক আর তবলার তাল যেন একে অন্যের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি। পরস্পরের পরিপূরক। তবলা ছাড়া কথক একেবারেই নিষ্প্রাণ নিঃস্পন্দ। তাই আকরাম গোড়াতেই তবলাটা ভালো করে শিখে নিয়েছিলেন। ভালো করে মানে সত্যিকার ওস্তাদরা যে ভাবে তবলা বাজায়। ইউটিউবে ওঁর তবলা শুনে আমি তো হতবাক। আমার মাথা ঘুরছিল। নাচের মঞ্চতে তাঁর পায়ের যেমন তীব্রগতি তবলার পিঠে তাঁর হাতের অংগুলেরও প্রায় একই ঝড়ো গতি। আকরাম খানের স্পর্শ পেয়ে বুঝি পৃথিবীর সকল জড়পদার্থই পর্বতবাহী তীব্র জলস্রোতের মত বেগবান হয়ে ওঠে।
ভারতীয় সংগীতের গতানুগতিক ধারা অনুযায়ী সব ছাত্রই শিষ্য হয়ে ওঠে না সবসময়। শিষ্য হতে হলে কিছু বাড়তি গুণাবলির প্রয়োজন হয়, যেমন কঠোর নিয়মানুবর্তিতা, একনাগাড়ে দীর্ঘ সময় ধরে প্র্যাকটিস করাতে কোনরকম দ্বিধা প্রকাশ না করা, শিক্ষকের পদ্ধতির প্রতি পূর্ণ আস্থা, সর্বোপরি ভক্তি, অকপট ও অকাতর ভক্তি শিক্ষকের প্রতি। আকরাম খানের চরিত্রে এগুলো ছিল বলেই হয়তো প্রতাপ পাওয়ার নিঃসঙ্কোচে ওকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করে নেন। তিনি নিশ্চয়ই টের পেয়েছিলেন যে, এই ছেলে কেবল নিজেরই নাম ছড়াবে না, গুরুর নামও ছড়াবে একই সঙ্গে। তিন বছর যেতে-না-যেতেই তিনি ওকে অ্যাকাডেমি অব ইন্ডিয়ান ড্যান্সের এক বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ দেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ব্রিটেনের শেক্সপিয়ারান কোম্পানি প্রোডাকশনের স্বনামধন্য পরিচালক পিটার ব্রুকস। তিনি আকরাম খানের নাচ দেখে এতই মুগ্ধ হয়ে গেলেন যে, তত্ক্ষণাত্ প্রস্তাব দিলেন তাঁর কোম্পানির সঙ্গে কাজ করতে। আকরাম ও তার বাবা-মা সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন। ছেলের বয়স তখন মাত্র দশ! এমন সুযোগ কজনের ভাগ্যে ঘটে? তার একবছর পরই মঞ্চস্থ হয় পিটার ব্রুকসের বিখ্যাত মহাভারত মহাকাব্যের নাট্যরূপ। যাতে ১১ বছরের বাংলাদেশি মুসলমান ছেলে আকরাম খান নিশাদার তরুণ যুবরাজ একমন্যের ভূমিকাতে নৃত্য পরিবেশন করেন। তার পরের আরও দুটি বছর তিনি সেই কোম্পানির সঙ্গে দেশবিদেশ ভ্রমণ করে বেড়ান। ১৯৮৮ সালে পিটার ব্রুকস তাঁর পাণ্ডুলিপির সংক্ষিপ্ত সংস্করণ চলচ্চিত্ররূপে দাঁড় করালে সেটা টেলিভিশনে প্রচার হয়। অর্থাত্ ব্রিটেনের একটা বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বাংলাদেশ থেকে আগত একটি মুসলমান ছেলেকে ‘মহাভারতে’র অন্যতম কিশোর চরিত্রের ভূমিকাতে নৃত্যাভিনয় করতে দেখার সুযোগ পান। ব্রিটেনের নৃত্যজগতে উদয় হলেন ভবিষ্যতের এক উজ্জ্বল তারকা।
পিটার ব্রুকসের কোম্পানির সঙ্গে দুনিয়া ঘুরতে গিয়ে স্কুলের লেখাপড়াতে বিস্তর ব্যাঘাত যে ঘটেছিল আকরামের সেটা সহজেই অনুমেয়। তবুও, একটু দেরিতে হলেও, একসময় এ-লেভেলের পাটটা চুকিয়ে ফেলতে পারলেন মোটামুটি সাফল্যের সঙ্গেই। উল্লেখযোগ্য, ওতে দুটি বিষয় তিনি বিশেষভাবে বাছাই করেছিলেন—গণিত ও বাংলা। গণিতের ঝোঁক হয়তো উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত, কিন্তু লণ্ডনে জন্ম-হওয়া ছেলের বাংলা শেখার ইচ্ছা? অসম্ভব কিছু নয়, তবে ওতে তার মায়ের হাত হয়তোবা ছিল কিছুটা। বাবাও নিশ্চয়ই চাইতেন তাঁর ছেলেমেয়েরা ভালো বাংলা শিখুক। (ক্রমশ:)
মীজান রহমান, গণিতবিদ
অটোয়া, কানাডা