বলছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্মিত বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের বাসিন্দা পূর্ণিমা সাহা। আবাসিক হলটির উদ্বোধন হলো গত ১৭ মার্চ। প্রতিষ্ঠার ১৬ বছর পর এই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের অন্তত একটি হল পেলেন। ক্যাম্পাসের বাইরে ১৬ তলা একটি ভবন নির্মাণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই একমাত্র আবাসিক হলে ৬২৪ ছাত্রীর আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে ১২০০ ছাত্রীর আসন বরাদ্দ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ভবনটিতে ছাত্রীদের জন্য মোট ১৫৬টি কক্ষ, ১টি পাঠাগার, ১টি ক্যানটিন, ১টি ডাইনিং, প্রতি তলায় ৭টি শৌচাগার, ৯টি গোসলখানা ও ৪টি লিফট আছে।

নতুন আবাসিক হলে কেমন কাটছে ছাত্রীদের দিনরাত্রি? জানতে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছিলাম আমরা। গণিত বিভাগের ছাত্রী পূর্ণিমা সাহা বলছিলেন, ‘ভালো–মন্দ নিয়েই তো জীবন আমাদের। নতুন হলে কিছু কিছু সমস্যাও আছে। সবাই মিলেই সংকটগুলো মোকাবিলা করব। সুখ-দুঃখগুলো ভাগ করে নেব। আর এই সময়টাই বাকি জীবনের জন্য সেরা স্মৃতি হয়ে থাকবে। এটাই বড় পাওয়া।’

দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সানজিদা ইসলাম মনে করেন, আবাসিক শিক্ষার্থী হতে পারাটা একই সঙ্গে আনন্দের এবং গৌরবের। বিশেষ করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবার থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য এ রকম একটা নিরাপদ আবাসস্থল খুব প্রয়োজন। নামাজের ঘর ও পাঠকক্ষ থাকায় শিক্ষার্থীদের জন্য খুব সুবিধা হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে সানজিদা জানান, ধীরগতির ইন্টারনেট ও সুপেয় পানির অপর্যাপ্ততার কারণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। বাথরুম সব সময় পরিষ্কার থাকে না, এতেও অস্বস্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। সানজিদা বলেন, ‘রমজান মাসে সাহরির সময় দ্রুত খাবার শেষ হয়ে যায়। এতে অনেক শিক্ষার্থীকে না খেয়ে ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। অনেকের টিউশনি থাকে। সারা দিনের ক্লান্তিতে অনেকে অসুস্থ হয়ে যান। এসব সমস্যা সমাধানে কর্তৃপক্ষের আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন।’

সবাই একে অপরের কাছাকাছি থাকায় পড়ালেখায় সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে, গ্রুপস্টাডি করতে সুবিধা হচ্ছে, এসব প্রসঙ্গও উঠে এল শিক্ষার্থীদের কথায়।

রমজান মাসের আগেভাগেই হলে উঠতে পেরে বেশি খুশি ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান। তিনি বলেন, ‘ঈদের আগেই মনে হয় আমাদের ঈদের আমেজ চলে এসেছে। হলে ওঠার আগেও আমরা অনেকে দল বেঁধে মেসে থাকতাম। মেসে সবার সঙ্গে ইফতার করতাম। তবু দেখা যেত ১০-১২ জনের বেশি হতো না। এখন আমরা অনেকজন মিলে একসঙ্গে ইফতার করতে পারি।’

নুসরাত জানালেন, হলের ডাইনিং ও ক্যানটিনে ৩০০ থেকে ৪০০ শিক্ষার্থী একসঙ্গে বসে ইফতার করছেন। একে অপরের সঙ্গে ইফতারি ভাগাভাগি করে খাচ্ছেন। রমজান উপলক্ষে ক্যানটিনেও তৈরি করা হচ্ছে নানা স্বাদের খাবার। দল বেঁধে ইফতার করাটাই এই ছাত্রীদের কাছে আনন্দের। পরিবারের সঙ্গে থাকা হচ্ছে না, সেই দুঃখ কিছুটা আছে। কিন্তু হলের উৎসবমুখর পরিবেশে দুঃখ চাপা পড়তে সময় লাগে না।

ইদানীং হলে ঘুরতে আসছেন সাবেক ছাত্রীরাও। নিজেদের এই হলে থাকার সুযোগ হলো না, তা নিয়ে খানিকটা আফসোস যে তাঁদের মনে কাজ করে না, তা নয়। তবু নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা হল হয়েছে, এ নিয়ে তাঁরা খুশি। সম্প্রতি বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল ঘুরতে এসেছিলেন মনোবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী তানজিনা শিমু।

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ১৬ বছর পর অনাবাসিক তকমা ঘুচিয়ে আবাসিক হলো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। একসঙ্গে সবাই হলে থাকার ফলে সবার সঙ্গে সবার জানাশোনা হবে, বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রমে ছাত্রীরা আরও বেশি যুক্ত হবে, আমি মনে করি এসবের মাধ্যমে তাঁরা পড়াশোনার পাশাপাশি নেতৃত্ব চর্চার সুযোগ পাবেন। ছাত্রীদের লাইব্রেরিটাও দেখে ভালো লাগল। এটা নিশ্চয়ই পড়াশোনায় খুব সাহায্য করবে।’

ছাত্রী হলের প্রভোস্ট শামীমা বেগম বলেন, ‘ছাত্রীরা হলের সুবিধা পেয়ে ভীষণ খুশি। তাদের পড়াশোনার সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। গ্রন্থাগার সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। বিভাগ অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ বই সংগ্রহ করে দেওয়া হবে। ছাত্রীরা যেন হলের হয়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, ক্রিড়া, সামাজিক সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে, সে ব্যবস্থা করা হবে। হলের ভেতরে যেন বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করা যায়, সে ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।’