নারিন্দার ওস্তাদ

‘মাস্টারস বাংলাদেশ ২০০৫’ খেতাব পাওয়া বিডবিল্ডার রহমত উল্লাহ ছবি: সুমন ইউসুফ
‘মাস্টারস বাংলাদেশ ২০০৫’ খেতাব পাওয়া বিডবিল্ডার রহমত উল্লাহ ছবি: সুমন ইউসুফ

১২ মে। ঢাকার গুমোট গরম আর তীব্র যানজট ঠেলে পুরান ঢাকার নারিন্দায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল পাঁচটা। সেখানকার হাবিবউল্লাহ সর্দার শরীরচর্চাকেন্দ্রের ভেতরে পা রাখতেই চোখে পড়ল জনা পঞ্চাশেক তরুণের সরব উপস্থিতি। কেউ মুগুর ভাঁজছেন, কেউ–বা ব্যস্ত বুকডন দিতে। নজর কাড়লেন মধ্যবয়সী একজন। নাকের নিচে পুরু গোঁফ, মাথায় পাতলা হয়ে আসা চুল, সব মিলিয়ে পেটানো শরীর। তরুণদের এটা-সেটা বুঝিয়ে দিচ্ছেন যত্ন নিয়ে। তরুণেরাও বিপুল আগ্রহে এগিয়ে আসছেন তাঁর কাছে। তাঁদের একজন প্রশ্ন করে বসলেন, ‘ওস্তাদ, রাতে কী খাব?’
তরুণের প্রশ্নের ধরন বেশ কৌতূহল–জাগানিয়া। এগিয়ে যাই আমরা ‘ওস্তাদের’ উত্তর শোনার জন্য। মধ্যবয়সী ওস্তাদ উত্তরে বললেন, ‘রেড মিটকে “না” বলো!’ শরীরচর্চাকেন্দ্রের ভেতর এমন উত্তর সহজেই অনুমেয়। তবে অনুমানের বাইরে একটা বিষয় খেয়াল করলাম আমরা। ঢাকা সিটি করপোরেশনের অন্য শরীরচর্চাকেন্দ্রগুলো থেকে ৭৭ নম্বর ওয়ার্ডের শরীরচর্চাকেন্দ্রটি বেশ আলাদা। মনে প্রশ্ন জাগে, কেন এই ব্যতিক্রম? প্রশ্নটাও পেড়ে ফেললাম সেখানে আসা এক তরুণের কাছে। উত্তরে তিনি আবার ওই ওস্তাদের প্রসঙ্গই আনলেন, ‘এই শরীরচর্চাকেন্দ্রের অবস্থা এত ভালো একমাত্র লাকি ওস্তাদের জন্যই। তিনি আছেন বলেই, এখনো এই জায়গাটায় তরুণেরা আসে।’ তো কে এই ‘লাকি ওস্তাদ’? মনের প্রশ্ন মনেই থাকে, কেননা ততক্ষণে আমরা লাকি ওস্তাদকে চিনে ফেলেছি। মধ্যবয়সী ওই মানুষটাই নারিন্দার লাকি ওস্তাদ, আমাদের কাছে যিনি পরিচিত রহমত উল্লাহ নামে। শরীর গঠনে নারিন্দা ও আশপাশের এলাকার তরুণদের কাছে এক আদর্শের নাম।

রহমত উল্লাহ যখন তরুণ
রহমত উল্লাহ যখন তরুণ

শরীরচর্চাকে জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছেন রহমত উল্লাহ। জীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে এখনো অবিচল রয়েছেন নিজের পথে। পেশায় ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৭৭ নম্বর ওয়ার্ডের ছোট এক চাকুরে। তবে শরীরচর্চায় বিপুল আগ্রহের কারণে শরীরচর্চাকেন্দ্রটির গুরুদায়িত্ব বর্তেছে তাঁর সুঠাম কাঁধেই। রহমত উল্লাহ আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিলেন তরুণদের দেখভাল করার এক ফাঁকে, ‘এখানে সকাল ও বিকেল মিলে প্রায় ৩০০ জন আসেন শরীরচর্চা করতে। এঁদের মধ্যে প্রায় সবাই তরুণ।’
শুরুর কথা জানতে চাই আমরা। প্রশ্ন শুনে আমাদের সামনে খুঁজে পেতে কতগুলো কাগজ নিয়ে এলেন রহমত উল্লাহ। কাগজগুলো দেখে বোঝা গেল, শরীর গঠন প্রতিযোগিতায় অর্জন করা বিভিন্ন সনদ আর সম্মাননা সেগুলো, যেগুলোর মধ্যে চোখে পড়ল ১৯৮৪ সালে জাতীয় শরীর গঠন প্রতিযোগিতায় পাওয়া তৃতীয় পুরস্কার (সেবারই ওই প্রতিযোগিতায় প্রথম নাম লিখিয়েছিলেন জাস্টিস লালমোহন দাস লেনে জন্ম নেওয়া রহমত উল্লাহ।) তালিকায় আরও দেখা গেল ঢাকা সিটি করপোরেশন আয়োজিত শরীর গঠন প্রতিযোগিতা, মিস্টার ওয়ারী বডি বিল্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপ, নো স্মোকিং ঢাকা সিটি বডি বিল্ডিং কম্পিটিশনসহ স্থানীয় নানা প্রতিযোগিতায় পাওয়া অনেক সনদ।
১৯৮৪ সাল থেকে জাতীয় বডি বিল্ডিং ফেডারেশন আয়োজিত প্রতিযোগিতায় বেশ কয়েকবার অংশ নিয়েছেন রহমত উল্লাহ। একাধিকবার হাতে উঠেছে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও পঞ্চম স্থানের পুরস্কার । বড় সাফল্যটা ধরা দিয়েছে ২০০৫ সালে, সেবার জাতীয় বডি বিল্ডিং প্রতিযোগিতায় ৬০ কেজি বিভাগে জিতে নিয়েছেন ‘মাস্টারস বাংলাদেশ’ খেতাব।
সনদগুলো দেখতে দেখতে পুরোনো দিনের কথা জানতে চাই আমরা। রহমত উল্লাহর দৃষ্টি শরীরচর্চাকেন্দ্রের জানালার ওপারে। গোঁফের আড়ালে হাসি টেনে বললেন, ‘তখন ধ্যানজ্ঞান বলতে ছিল শুধুই ফুটবল। স্কুল ফাঁকি দিয়ে দিন পার করতাম ফুটবল মাঠে।’ ম্যারাডোনার পায়ের জাদুতে মুগ্ধ কিশোর রহমত উল্লাহ চোখ বন্ধ করলেই নিজেকে আবিষ্কার করতেন জাতীয় ফুটবল দলে। স্বপ্নের কাছাকাছি গিয়েছিলেন যেবার গেন্ডারিয়া স্ট্যান্ডার্ড ক্লাবের হয়ে অনূর্ধ্ব ১৩ দলে খেলার সুযোগ পেলেন। ফুটবলের পাশাপাশি সাঁতারেও তখন বেশ নামডাক। তাই খেলাধুলায় আরও ভালো করতে হলে যে সুঠাম শরীর চাই, তত দিনে সেটা বুঝে ফেলেছেন রহমত উল্লাহ।
তত দিনে আবার আরেক নায়কের খোঁজ পেয়েছেন তিনি। সেই নায়কের কথাই বলছিলেন রহমত উল্লাহ, ‘আর্নল্ড শোয়ার্জেনেগার আমার প্রিয় নায়ক। তাঁর ছবি দেখেই প্রথম অনুপ্রাণিত হই শরীর গঠনের ব্যাপারে। কষ্টের সংসার ছিল আমাদের, বাড়িতে না বলে একদিন ১৫ টাকা ফি দিয়ে ভর্তি হলাম সদরঘাটের নবযুগ শরীরচর্চাকেন্দ্রে। প্রতি মাসে ফি জোগাড় করতেও খুব কষ্ট হতো।’ আর এভাবে শরীরচর্চা করতে গিয়েই পাঠ্যবইয়ের চর্চা লাটে উঠল রহমত উল্লাহর! জীবনের মাঝামাঝি পর্যায়ে এসে পড়াশোনার অভাব বেশ ভালোভাবেই টের পান দুই সন্তানের এই জনক। তাই একবিন্দু ছাড় দিতে রাজি নন সন্তানদের পড়াশোনার ব্যাপারে।
ফের বডি বিল্ডিং প্রসঙ্গ। শরীর গঠনের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার শুরু হলো কীভাবে? রহমত উল্লাহ বললেন, ‘এ বিষয়ে প্রথম জেনেছি মিস্টার ইউনিভার্সের খবর পড়ে। আর তত দিনে দেহ আমার নিজের কথা শোনে! তার পরই স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিযোগিতার খোঁজ নিয়ে অংশ নিতে শুরু করি।’

সৌদি আরবের এক হোেটলের সুইমিংপুলে, রহমত উল্লাহ যেন সুপারম্যান
সৌদি আরবের এক হোেটলের সুইমিংপুলে, রহমত উল্লাহ যেন সুপারম্যান

কিন্তু ওসব করে তো পেট চলে না। আর তত দিনে বাবা অলেক ভূঁইয়া অবসর নিয়েছেন সিটি করপোরেশনের চাকরি থেকে। মিস্টার বাংলাদেশ হওয়ার স্বপ্ন থমকে যায় সদ্য কৈশোর পেরোনো রহমত উল্লাহর। ১১ জনের সংসারে চেপে বসে আর্থিক অনটন। নির্মাণশ্রমিক হিসেবে ১৯৮৪ সালে পাড়ি জমান ইরাকে। তার পরও থেমে থাকেনি তাঁর শরীরচর্চা, ‘যেখানেই গিয়েছি, শরীরচর্চা চালিয়ে গিয়েছি। ইরাকে একজন সাধারণ শ্রমিক হিসেবে অমানুষিক পরিশ্রমের ফাঁকেও নিয়মিত চর্চা করতাম। অনেক কর্মকর্তাই আমার ইচ্ছার কথা জেনে বেশ সহযোগিতা করেছেন। সুযোগ দিয়েছেন খাওয়া–দাওয়া বা জিমে যাওয়ার ব্যাপারে।’
১৯৮৭ সালে আবার বাংলাদেশে ফিরে আসেন রহমত উল্লাহ। কয়েক মাস পরই চলে যান সৌদি আরবে। সেখানে ছিলেন ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত। বিদেশ–বিভুঁইয়ের পাট চুকিয়ে দেশে ফিরেই আবার পূর্ণোদ্যমে শুরু করেন শরীরচর্চা, আবার নাম লেখাতে শুরু করেন বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়। সাফল্যের প্রমাণগুলো তো আগেই দেখেছি আমরা। কেবল প্রতিযোগিতায় অংশই নেননি রহমত উল্লাহ, যুক্ত হয়েছেন বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক কাজেও। অংশ নিয়েছেন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আয়োজিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ওপর একাধিক কার্যক্রমে। স্ত্রী আয়শা আক্তার ও স্কুলপড়ুয়া দুই সন্তান সামিয়া ভূঁইয়া ও আরমান ভূঁইয়াকে নিয়ে তাঁর ছোট সংসার।
অনেক কথা শেষে আমরা বেরিয়ে পড়ি হাবিবউল্লাহ সর্দার শরীরচর্চাকেন্দ্র থেকে। তখনো তরুণেরা ওস্তাদের কাছে এটা–সেটা জানতে চাইছেন। বাইরে বেরিয়েও ‘রেহাই’ নেই! রহমত উল্লাহকে পুরো এলাকাবাসী চেনে এক নামে—লাকি ওস্তাদ। রহমত উল্লাহ এই পরিচয়ে খুব খুশি, ‘একজন সাধারণ ক্রীড়াবিদ হিসেবে যতটুকু শিখেছি, তা যুবসমাজের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চাই। যারা শরীরচর্চা করে, তারা কখনো মাদকাসক্ত হয় না। আমি শুধু তাদের সেই অমূল্য বাণী মনে করিয়ে দিই, স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। মহল্লায় চলতে গেলে কেউ যখন “ওস্তাদ” বলে ডাকে, আমার খুব ভালো লাগে।’