নীল সাগর খাড়া পাহাড়
অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সুবাদে ভিয়েতনামের হালং বে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের ভোটে আমাদের সুন্দরবন-কক্সবাজারের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বীও ছিল এই হালং বে। ঘুরে এসে লিখেছেন পল্লব মোহাইমেন

হালং বের নাম শুনলে ভালো যেমন লাগে, তেমন মনের মধ্যে একটা খচখচানিও কাজ করে। হালং বে ঘুরে যখন ফেসবুকে সেলফি দিলাম, তখন সেখানে সাংবাদিক আরাফাত সিদ্দিকীর কমেন্ট ছিল, ‘এই হালং বের বিরুদ্ধে আপনি একসময় কত লড়াই করেছেন।’ খচখচানিটা এখানেই। এ কমেন্টে আমার উত্তরটা ছিল হালং বের বিরুদ্ধে নয়, লড়াই ছিল সুন্দরবন-কক্সবাজারের পক্ষে...। প্রায় তিন বছর ধরে গোটা দুনিয়ায় চলা প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনে আমাদের কক্সবাজার ও সুন্দরবনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছিল হালং বের সঙ্গে। ১১.১১.১১ তারিখে ভোটের শেষ দিন শেষ ১৪তেও ছিল এ দুটি স্থান। তবে প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের একটি হিসেবে হালং বে টিকে যায়।
প্রকৃতি সব সময় সুন্দর। হালং বের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গেও কোনো শত্রুতা নেই বরং আছে মুগ্ধতাই। তাই গত মাসের শেষ ভাগে অ্যাসোসিও আর ক্যাননের আমন্ত্রণে যখন ভিয়েতনাম গেলাম, তখন নির্ধারিত সময়ের চেয়ে এক দিন বেশি থাকলাম শুধু হালং বে দেখব বলে।
টাকা-পয়সার একটা বিশেষ মজা আছে ভিয়েতনামে। রাজধানী হানয়ে নেমেই সেটা টের পাওয়া গেল। ১০০ ডলার ভাঙালে সেখানে পাওয়া যায় ২১ লাখের বেশি স্থানীয় মুদ্রা ভিয়েতনামিজ দং (ভিএনডি)। তো কোটিপতি হওয়া কোনো ব্যাপারই না, এখানে ‘সব বনে গা ক্রৌড়পতি’। পুরান ঢাকার মতো হানয়ের ওল্ড কোয়ার্টার এলাকায় হাঁটতে হাঁটতে একটু পর পর দেখা যায় ছোট ছোট পর্যটন অফিস। এরই একটায় গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম দিনে দিনে হালং বে ঘুরে আসার প্যাকেজ কী আছে? ডিলাক্স প্যাকেজই পাওয়া গেল। জনপ্রতি ছয় লাখ ৩৩ হাজার দং, ঘাবড়ানোর কিছু নেই। মাত্র ৩০ ডলার, আমাদের টাকায় আড়াই হাজারের মতো। বাসে করে যাওয়া, প্রমোদতরিতে করে ঘোরা, খাওয়া সব এই প্যাকেজের আওতায়।

৩১ অক্টোবর সকালে যাত্রা শুরু করলাম আমরা। সঙ্গী বাংলা ট্রিবিউনের হিটলার এ হালিম ও ইত্তেফাক-এর মোজাহেদুল ইসলাম। হানয় থেকে ১৭৮ কিলোমিটার দূরে হালং বে। ঘণ্টা তিনেক লাগবে আমাদের যেতে। ট্যুরিস্ট বাসে বেশির ভাগই বিদেশি পর্যটক। ঘণ্টা খানেক চলার পর বাস যেখানে থামল, সেখানে নামলাম যেন এক ভাস্কর্যের বাগানে। মার্বেল, গ্রানাইট ইত্যাদি নানা পাথরে ছোট-বড়-মাঝারি ভাস্কর্য চারদিকে। এসবের মাঝখানে বড়সড় একটা ঘর। দরজায় ইংরেজিতে লেখা ‘প্রতিবন্ধীদের ওয়ার্কশপে স্বাগত।’ ভেতরে এমব্রয়ডারি থেকে শুরু করে পেইন্টিং, পটারি-বিভিন্ন রকম শিল্পকর্ম তৈরি হচ্ছে। আর শিল্পীদের সবাই প্রতিবন্ধী। এই কারখানার শিল্পকর্মগুলো রপ্তানি হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। সে তালিকাও বেশ দীর্ঘ।
হালং বের পথে আবার ছুটল বাস—দুই পাশের কারখানা, বাড়িঘর ধানখেত বদলে যেতে থাকল। মাঝেমধ্যে স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়ের ঝাঁক ঝাঁক সাইকেল, এরপর ধীরে ধীরে দিগন্তে দেখা দিল উঁচু উঁচু পাহাড়। দ্রুত অগ্রসরমাণ ভিয়েতনামি অর্থনীতির স্বরূপও চোখে পড়ল হালং বে এলাকায় ঢুকতে। নতুন নতুন বড় বড় দালান-হোটেল, মোটেল, পর্যটকদের টানার সব বন্দোবস্ত একেবারে তৈরি। আরও অনেক ইমারতের নির্মাণকাজও চোখে পড়ল।
জেটি থেকে যে প্রমোদতিরতে আমরা উঠলাম, সেটা আদতে রেস্তোরাঁর মতো। বসার আয়োজনও তেমন। হালং বের অবস্থানটা তনকিন উপসাগরে। হালং বেতে সাগরের পানি ফুঁড়ে উঠেছে অসংখ্য খাড়া খাড়া পাহাড়। কোনোটা সবুজে ঢাকা, কোনোটা ন্যাড়া। প্রমোদতরির গতির কারণে পাহাড়ের দিকে তাকালে মনে হয়, একটার ওপর থেকে আরেকটা সরে যাচ্ছে। যেন শুটিংয়ের সময় তৈরি করা সেটের চাকাওয়ালা দেয়াল সরিয়ে দিচ্ছে কেউ। হিটলার বলেই দিলেন, ‘না এলে মিস করতাম।’ এ পাহাড় দেখে রাঙামাটির শুভলংয়ের খাড়া পাহাড়ের কথাও মনে পড়ে যায়।
পর্যটকদের জন্য রাখা সাইনবোর্ড আর আমাদের গাইড চ্যাংয়ের কাছ থেকে জানা গেল হালং বের আয়তন এক হাজার ৫৩৩ বর্গকিলোমিটার। পর্যটকদের জন্য মূল এলাকা ৪৩৪ বর্গকিলোমিটার। ছোট ছোট দ্বীপ আছে প্রায় দুই হাজারের মতো। তবে পর্যটনের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে ৭৫টি দ্বীপ।

উপসাগরের স্বচ্ছ নীল পানি কেটে কেটে আমরা পৌঁছালাম একটা জেলেপাড়ায়। চ্যাং বলল, ‘র্যাফটিং করলে পয়সা লাগবে না। আর দেশি নৌকায় তিনজন ঘুরলে লাগবে এক লাখ ২০ হাজার দং। লাইফ জ্যাকেট পরে আমরা আমরা উঠে পড়ি নৌকায়। ছোট ছোট অনেকগুলো বৈঠা নৌকা। দেশি-বিদেশি অনেক পর্যটক। অনেকে আবার একা বা দোকলা র্যাফটিং করছেন বৈঠা চালিয়ে। পাহাড়ঘেরা সাগর, কোথাও দুই পাহাড়ের মাঝখানে প্রাকৃতিক তোরণ। সেই তোরণের নিচ দিয়ে নৌকার যাতায়াত। তোরণের গায়ে চুনাপাথরের কারুকাজ। কোথাও ছোট ছোট সুড়ঙ্গও আছে। এক জায়গায় দেখা গেল ছোট চৌকোনা একটা পাহাড় হেলে পড়েছে বড় পাহাড়ের গায়ে।
৪০ মিনিট নৌকায় ঘুরে আবার প্রমোদতরিতে ফেরা। এবারে যাব ব্যাং তং তিন গুহায়। কিছুদূর যেতেই চোখে পড়ল মাঝারি দুই পাহাড় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, যেন চুম্বনরত। চ্যাংয়ের ভাষায় ‘কিসিং রক।’
বিস্ময়টা অপেক্ষা করছিল ব্যাং তং তিনে। সার বেঁধে আমরা ঢুকলাম এই গুহাতে। প্রকৃতির দারুণ খেয়ালে অপরূপ সব আকৃতি অপেক্ষা করছিল আমাদের। লাল, নীল, বেগুনি, হলুদ, সবুজ আলো দিয়ে গুহাটাকে সাজানো হয়েছে। হাজার বছরের বিবর্তনে তৈরি হয়েছে এ গুহা। এমন গুহা হালং বেতে আছে ১০০টির মতো। এগুলোর বেশির ভাগই আবিষ্কার হয়েছে জেলেদের হাতে।
এক জায়গায় থেমে চ্যাং তাঁর লেজার পয়েন্টার দিয়ে একটা ছায়া দেখাল। মানুষের আদল। ‘এ হচ্ছে রোমিও। তাকিয়ে আছে জুলিয়েটের দিকে।’ লেজার পয়েন্টার আরেকটু উঁচুতে তাক করল চ্যাং। দেখা গেল দীর্ঘকেশী জুলিয়েট বারান্দায় অপেক্ষমাণ।’
গুহা থেকে বেরিয়ে আবারও সাগরে, মুক্ত আকাশে। কিছু পাহাড়ের বাইরেও আলোর ব্যবস্থা আছে। রাতে নাকি হালং বে আরও সুন্দর। আমরা স্থলভাগ থেকে গিয়েছিলাম মাত্র চার কিলোমিটার দূরে। ১৬ কিলোমিটার দূরে কিছু কিছু ভাসমান হোটেল আছে, যেগুলোতে রাত কাটানো যায় অপরূপ এই পাহাড়ময় উপসাগরে। আমাদের সুন্দরবনের মতো হালং বেও ইউনেসকোর প্রাকৃতিক বিশ্ব ঐতিহ্য। আর ২০১১ সাল থেকে এটি প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের একটি হয়ে গেছে। সাইনবোর্ডে এটা দেখে মনটা একটু খারাপ হয়ে যায় বৈকি।