পাঁচ যুগ পরেও নিঃসঙ্গ বিকিনি

মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের বিকিনি আটোলে ‘অপারেশন ক্যাসল ব্রাভো’ পরমাণু বিস্ফোরণে আকাশে ‘মাশরুম মেঘ’। ছবি: যুক্তরাষ্ট্র বিমানবাহিনী
মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের বিকিনি আটোলে ‘অপারেশন ক্যাসল ব্রাভো’ পরমাণু বিস্ফোরণে আকাশে ‘মাশরুম মেঘ’। ছবি: যুক্তরাষ্ট্র বিমানবাহিনী

প্রশান্ত মহাসাগরের বিকিনি দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দাদের আর ঘরে ফেরা হয়নি। ফেরা সম্ভব নয় বা আর ফিরতেও চান না তাঁরা। মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের এই বিকিনি দ্বীপপুঞ্জ বা ‘বিকিনি আটোলে’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভয়াবহ হাইড্রোজেন বোমা পরীক্ষার ৬০ বছর পূর্ণ হলো এ বছরই। কিন্তু নয়নাভিরাম এক লেগুনকে চারদিক থেকে ঘিরে রাখা ছোট্ট এই দ্বীপপুঞ্জটির আদি বাসিন্দারা বলছেন, পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তার কারণেই সেখানে আর ফিরতে চান না তাঁরা। দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে।
স্নায়ুযুদ্ধকালীন অস্ত্র প্রতিযোগিতার সময় যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫৪ সালের ১ মার্চ বিকিনি দ্বীপপুঞ্জে ১৫ মেগাটনের একটি হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা চালিয়েছিল। আর বিকিনি দ্বীপে পরীক্ষা চালানো এ বোমাটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের হিরোশিমায় ফেলা আণবিক বোমার চেয়েও প্রায় হাজার গুণ বেশি প্রলয়ংকরী।

প্রায় ৬০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের একটি লেগুনকে বিকিনির আকৃতিতে ঘিরে রাখা এই দ্বীপপুঞ্জের স্থলভাগের মোট আয়তন মাত্র ৯ বর্গকিলোমিটারের মতো। ‘অপারেশন ক্রসরোডস’ নামে ১৯৪৬ সালে এই দ্বীপপুঞ্জ এবং এর আশপাশের সমুদ্র এবং সমুদ্রের তলদেশে পরমাণু বোমার পরীক্ষা চালানো শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত এই অঞ্চলে অন্তত ৬৭টি বড় ধরনের পরমাণু পরীক্ষা চালানো হয়।

প্রথম পরমাণু পরীক্ষাটি চালানোর আগে যখন বিকিনির বাসিন্দাদের সরিয়ে নিতে শুরু করা হয়েছিল তখন তাঁদের বলা হয়েছিল যে কিছুদিনের মধ্যেই আবার ঘরে ফিরতে পারবেন তাঁরা। কিন্তু প্রায় তিন দশক পর প্রথমবারের মতো বাসিন্দাদের ফিরিয়ে আনা হলেও বেশি দিন সেখানে থাকতে পারেননি তাঁরা। পরমাণু বোমায় পরিবেশের যে পরিবর্তন হয়েছে তাতে ওই দ্বীপে জন্মানো ফসল ও ফলমূলেও ভয়াবহ তেজস্ক্রিয়তা থাকায় কয়েক বছরের মাথায় ১৯৭৮ সালেই মানুষজনকে আবারও ফিরিয়ে নেওয়া হয় সেখান থেকে।

পরমাণু পরীক্ষার ৬০তম বার্ষিকীতে রঙেলাপ দ্বীপপুঞ্জের বাস্তুচ্যুত বাসিন্দাদের মিছিল। ছবি: এএফপি
পরমাণু পরীক্ষার ৬০তম বার্ষিকীতে রঙেলাপ দ্বীপপুঞ্জের বাস্তুচ্যুত বাসিন্দাদের মিছিল। ছবি: এএফপি

মার্শাল দ্বীপপুঞ্জে পরমাণু পরীক্ষার ক্ষতিপূরণ দিতে গঠিত ট্রাইব্যুনাল সেখানকার বাসিন্দাদের জখম, অসুস্থতা ও ভূমির ক্ষতির কারণে প্রায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ বাবদ বরাদ্দ করে। কিন্তু ওই দ্বীপের পরিবেশ ‘নিরাপদ’ বলে যুক্তরাষ্ট্রের বারংবার আশ্বাসে আস্থা হারিয়ে মানুষজন সেখানে আর ফিরতে না চাওয়ায় এই ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়া মুখ থুবড়ে পড়ে।
পরমাণু পরীক্ষার ৬০তম বার্ষিকী স্মরণে মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের রাজধানী মাজুরোতে শনিবার সমবেত হয়েছিলেন দ্বীপপুঞ্জ থেকে বাস্তুচ্যুত অনেক বাসিন্দারাই। তাঁদের সঙ্গে আসা নবীন প্রজন্মের অনেকেরই জন্ম হয়েছে অন্যত্র। এই তরুণ প্রজন্মের কাছে বিকিনি বা তার আশপাশের দ্বীপগুলোতে পূর্বপুরুষদের বসতভিটার গল্প অনেকটা রূপকথার মতোই। পুনর্বাসন, নিরাপদ বাসস্থলের মিথ্যা আশ্বাস আর ক্ষতিপূরণ নিয়ে বারংবারের টালবাহানায় ক্লান্ত বাস্তুচ্যুত প্রবীণেরা যেমন আর আদি ভিটায় ফিরতে চান না, তেমনি তেজস্ক্রিয়তার আতঙ্ক এবং অজানা এক ভয়ে অচেনা দ্বীপগুলোতে গিয়ে বসবাসে আগ্রহী নয় নবীন প্রজন্মও। রঙেলাপ দ্বীপপুঞ্জ থেকে বাস্তুচ্যুত ইভেলিন রালফো-জেয়াড্রিক বলছিলেন, ‘আমি আর ফিরে যাব না। আমি বিশ্বাস করি না যে ওই জায়গাটা নিরাপদ এবং আমি আমার সন্তানদের ওই ঝুঁকিতে ফেলব না।’

১৯৫৮ সালে ৬৭টি পরীক্ষা চালানোর পর মার্শাল দ্বীপপুঞ্জে পরমাণু নিরীক্ষা বন্ধ করে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ২০১২ সালের এক প্রতিবেদনেও জাতিসংঘ বলেছে, ওই দ্বীপপুঞ্জ এবং আশপাশের অঞ্চলে এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের বিশেষ দূত ক্যালিন গিওর্গেস্কু এক প্রতিবেদনে বলেছেন, ‘প্রায়-অমোচনীয় পরিবেশগত তেজস্ক্রিয়তায়’ প্রাণ ও প্রকৃতির বিপুল ক্ষতি হয়েছে এবং বহু মানুষই আসলে একটা ‘অনির্দিষ্ট বাস্তুচ্যুত’ জীবন কাটাচ্ছেন। ‘বিশ্বাসহীনতার পরম্পরা’ থেকে বেরিয়ে এসে মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দাদের ক্ষতিপূরণ দিতে এবং স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে যুক্তরাষ্ট্রকে অতিরিক্ত প্রচেষ্টা চালানোর আহ্বান জানানো হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

বিকিনির স্থানীয় সরকারের ৪২ বছর বয়সী কাউন্সিলর ল্যানি ক্র্যামার এই দ্বীপপুঞ্জে পরমাণু পরীক্ষার ফলাফল সম্পর্কে বলেন, মানুষজন কেবল তাঁদের ঘরবাড়িই হারাননি, দ্বীপপুঞ্জ এবং সমুদ্র মিলিয়ে বিশাল এক অঞ্চলের একটা সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘বাস্তুচ্যুত হয়ে আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হারিয়েছি, আমাদের ঐতিহ্যবাহী আচার এবং দক্ষতা হারিয়েছি। হাজার বছর ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আমরা যে জ্ঞান ও সংস্কৃতির চর্চা করতাম আমরা তা থেকেও চ্যুত হয়েছি।’

ইয়াইজু বন্দরের কাছে শোক সমাবেশে জাপানি জাহাজের প্রধান বেতার প্রকৌশলী আইকিচি কুবোয়ামার প্রতিকৃতি বহন করছে সমবেতরা। ছবি: এএফপি
ইয়াইজু বন্দরের কাছে শোক সমাবেশে জাপানি জাহাজের প্রধান বেতার প্রকৌশলী আইকিচি কুবোয়ামার প্রতিকৃতি বহন করছে সমবেতরা। ছবি: এএফপি

বিকিনি দ্বীপপুঞ্জে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু বোমা পরীক্ষার ৬০তম বার্ষিকীতে শোক সমাবেশ হয়েছে জাপানের বন্দর-নগর ইয়াইজুতেও। ওই বিস্ফোরণের সময় ২৩জন জেলেকে নিয়ে একটা জাপানি মাছ ধরার জাহাজ ছিল বিকিনি থেকে মাত্র ৬০ মাইল দূরে। জাহাজটির প্রধান বেতার প্রকৌশলী আইকিচি কুবোয়ামা পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তায় ওই ঘটনার সাত মাস পরই মারা যান। ক্যানসার এবং অন্যান্য তেজস্ক্রিয়তা জাহাজটির আরও ১৫ সদস্য মারা যান পরবর্তী কয়েক বছরেই। জাপানি জাহাজটির যে অল্প কজন নাবিক ও জেলে বেঁচে গিয়েছিলেন তাদের একজন মাতাশিচি ওইশি।

৮০ বছর বয়সী মাতাশিচিও শনিবার এসেছিলেন তাঁর সহযাত্রীদের প্রতি শোক জানাতে। ইয়াইজু বন্দরের কাছেই বেতার প্রকৌশলী আইকিচি কুবোয়ামা এবং অন্যদের স্মরণে নির্মিত সৌধে শ্রদ্ধা জানাতে এদিন সমবেত হন প্রায় দুই হাজার মানুষ। এ শোক সমাবেশে মাতাশিচি বিস্ফোরণের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমার এখনও ওই চোখ ধাঁধানো আলোর কথা মনে আছে আর মনে আছে আলোর পরপরই ওই আত্মা-কাঁপানো গর্জনও । মনে আছে অদ্ভুত এক লাল আকাশ, যত দূর চোখ যায়, চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়া লাল এক আকাশ।’