শরীরে ক্লান্তি না আসার কোনো কারণ ছিল না। আজ আমরা ঘুম থেকে উঠেছি সূর্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। আমরা মানে শরণ্য, শ্রেয়া আর শাওন—আমাদের ছেলে, মেয়ে আর ওদের মা। ফাউ আমি তো আছিই। ঘুম থেকে উঠে বিমানবন্দর, এরপর বিমানের পেটে করে চট্টগ্রাম, সেখান থেকে গাড়িতে চড়ে ক্রমেই বান্দরবানের গভীরে। সেই কাকডাকা ভোরের পর এখন শেষ দুপুর। মাথার ওপরে সূর্য কাত হয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

default-image

সাইরুতে ঢুকতেই ক্লান্তি উধাও। খোলামেলা পরিসরে চোখ কোথাও বাধা পায় না। উন্মুক্ত আকাশ। এর তলায় পাহাড়ি দৃশ্যপট। বিচিত্র গাছ কোথাও সুশৃঙ্খলভাবে সযত্নে রোপিত। কোথাও বা বুনো গাছ আর লতাপাতা নিজের খেয়ালে ঝোপ বেঁধে আছে। আর এসবের ফাঁকফোকরে, ঢেউখেলানো পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে ভবন, ঘরদোর আর ভ্রমণার্থীদের আয়েশের নানা আয়োজন। অভ্যর্থনাস্থল, অফিস, রেস্তোরাঁ আর নিসর্গ উপভোগের জন্য তৃষ্ণার্ত অতিথিদের অলস সময় কাটানোর জায়গাটুকু মিলিয়ে মূল স্থাপনা। সেটি দিগন্তরেখার একেবারে সমান্তরাল। নিজেকে বুক ফুলিয়ে না দেখিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে থাকে।

অতিথিদের থাকার ঘরগুলো তোলা হয়েছে পাহাড়ের খাড়াই আর উতরাইয়ের ধাপে ধাপে, প্রকৃতি আর শূন্যতার অনুভূতিটুকু রেখে।

কটেজে ঢুকেই সন্তানদের মন ভালো হয়ে গেল। প্রশস্ত ঘর। চওড়া বারান্দা। ঘরের যেখানে যা থাকার সব ঠিকঠাক আছে। বিশেষ করে স্নানঘর দেখে শরণ্যর মুখে একেবারে সূর্যের হাসি। সে ঘোষণা করল, এই কয় দিন সে ঘর ছেড়ে আর কিছুতেই বেরোবে না।

এখানকার কটেজ দুই ধরনের। কোনোটা বঙ্গোপসাগরমুখী, কোনোটা সাঙ্গু নদীর। আমাদের ঘরের দৃশ্য বঙ্গোপসাগরমুখী। ডিসেম্বরের কুয়াশা অবশ্য সে দৃশ্যের সামনে ভারী পর্দা টেনে রেখেছে। তাই বলে আলোকে প্রতিহত করতে পারেনি। মেঝে থেকে ছাদ অব্দি দেয়ালজোড়া জানালা দিয়ে স্রোত বয়ে যাচ্ছে স্নিগ্ধ আলোর।

বাইরে পড়তে যাওয়ার কয়েক মাস পর শ্রেয়া ফিরছে। কী করে শুধু নিজেদের সঙ্গ আমরা শান্তভাবে উপভোগ করতে পারি, সেটাই ছিল আমাদের ভাবনা। তিন দিনের জন্য কোথাও যাব না, কোনো ছোটাছুটি করব না। একদম থিতু হয়ে মন্থর সময় বয়ে যেতে দেব। ডুব দিয়ে থাকব নিজেদের মধ্যে। যে জায়গায় থাকব, সেটি তাই নিজের মধ্যে নিজে সম্পূর্ণ হওয়া দরকার।

দুই পাশের জলাধারের মাঝখান দিয়ে রেস্তোরাঁয় ঢোকার পথ। পানিতে নানা রঙের মাছ ঝাঁক বেঁধে আছে কুচকাওয়াজের অ্যাটেনশন ভঙ্গিতে। পাহাড়ের সামরিক ছায়ার প্রভাব তাহলে ওদের মধ্যেও পড়েছে!

বাংলাদেশে সম্প্রতি তেমন কিছু উঁচুমানের রিসোর্ট হয়েছে—প্যালেস, মারমেইড, ভাওয়াল বা সারা রিসোর্টের মতো। প্রায় সব কটিতেই যাওয়া হয়েছে। বান্দরবানের সাইরু রিসোর্টে যাওয়া হয়নি। সবাই বলল, সেখানেই তাহলে চলো। বেশ তাহলে।

রেস্তোরাঁটা নিচে। খাওয়ার জন্য হেঁটে হেঁটে পাহাড়ি ঢালু পথে বেশ অনেকটাই নামতে হবে। ঢোকার সময় লক্ষ করিনি, ঘর ছেড়ে বেরোনোর সময় চোখে পড়ল আমাদের ঘর দুটি যে ব্লকে, তার নাম সেনরি। সেনরি বম ভাষার শব্দ, মানে জবাফুল। নামতে নামতে দেখা গেল, রিসোর্টের সব ব্লকের নামই বমদের শব্দভান্ডার থেকে নেওয়া। সব কটি নামই আবার মজা করে তারা স দিয়ে শুরু করেছে। যেমন আরেকটা ব্লকের নাম সুম। সুম মানে কুয়াশা। এভাবে একের পর এক চোখে পড়ে সুহারি বা কাকাতুয়া, সাকি বা হরিণ, স্মিৎলাং বা উত্তর পাহাড়।

দুই পাশের জলাধারের মাঝখান দিয়ে রেস্তোরাঁয় ঢোকার পথ। পানিতে নানা রঙের মাছ ঝাঁক বেঁধে আছে কুচকাওয়াজের অ্যাটেনশন ভঙ্গিতে। পাহাড়ের সামরিক ছায়ার প্রভাব তাহলে ওদের মধ্যেও পড়েছে!

রিসোর্টে খাওয়া আছে নানা রকমই। থাই, চায়নিজ, ভারতীয়, দেশি। কিন্তু যস্মিন দেশে যদাচার। পাহাড়ে এসে পাহাড়ি খাওয়া না খেলে কি চলে। নেওয়া হলো বাতাবি রাইস, চিকেন ভর্তা, বাঁশের নলের ভেতরে রান্না করা মুরগি—কায়দা করে যার ইংরেজি নাম দেওয়া হয়েছে ব্যাম্বু চিকেন। তার সঙ্গে চ্যাপা শুঁটকি ভুনা, লইট্টা ভুনা আর কষানো গোমাংস।

default-image

বাতাবি রাইসের স্বাদ সবার মন একেবারে মাতিয়ে দিল। পরের দিনগুলোতে তরকারির বিন্যাস নানাভাবে পাল্টে গেলেও প্রতি বেলায় বাতাবি রাইস রয়ে গেল বহাল তবিয়তে। এই মন মজানো ভাতের রেসিপি ফেরার সময় নিয়ে এলাম আমরা। জলবৎ তরলং। দম দিয়ে তুলে গরম–গরম ভাতে মিশিয়ে নিতে হবে সামান্য ঘি, লেবুর রস, লেবুপাতা, লম্বা দুই ফালি করা কয়েকটা কাঁচা মরিচ আর লবণ। এটুকু হলেই যথেষ্ট। তবে আরও দেওয়া যায় ভুট্টার কচি দানা আর গোল গোল পাতলা করে কাটা বেবিকর্ন। পাহাড় থেকে শিখে আসা ভেতো বাঙালির নতুন অমৃত।

চারপাশে ঘুরেফিরে দেখে বুঝলাম, শুধু ব্লকের নাম নয়, এখানে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের উল্লেখযোগ্য একটা অংশের বসতিও পাহাড়েই। খোঁজ করে জানলাম, বান্দরবানের প্রায় ছয়টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরা এখানে কাজ করছেন। অর্ধশতাংশ কর্মী স্থানীয় লোকের মধ্য থেকে নিতে হবে, এটাই তাঁদের কর্মী নিয়োগের নীতি।

এ রিসোর্টের নাম যে সাইরু রাখা হয়েছে, তার পেছনেও আছে করুণ এক পাহাড়ি ঘটনা। সাইরু ছিল এক ম্রো তরুণীর নাম। তাঁর সঙ্গে ভাব হয়েছিল এক তরুণের। প্রণয়কাতর এই যুগল বান্দরবানের নির্জন এক পাহাড়ে এসে পরস্পরের সঙ্গে দেখা করতেন। মানুষের চোখ এড়িয়ে একান্ত সময় কাটানোর জন্য সেই পাহাড়ই ছিল তাঁদের নির্জন আশ্রয়। তবে ওই তরুণ ম্রো ছিলেন না, ছিলেন অন্য আরেকটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্য। সামাজিক বাধায় তাঁদের প্রণয় পরিণতি পায়নি। ওই তরুণকে জোর করে অন্য এক মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেয় তাঁর পরিবার। সাইরু বিষণ্ন আর একাকী হয়ে যান। একা একাই সেই পাহাড়ে এসে উদাস বসে থাকেন। রোমন্থন করেন তাঁর অতীত মধুর সময়। একবার সাইরু পাহাড়ে যাওয়ার পর তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। কেউ জানতে পারেনি তাঁর কী হয়েছে।

সেই পাহাড়ের গায়ে গড়ে উঠেছে সাইরু রিসোর্ট। উদ্যোক্তারা সেই পাহাড়ি মেয়ের স্মৃতি রিসোর্টের নামের মধ্যে ধরে রেখেছেন। রিসোর্টের অফিসের দেয়ালে লেখা আছে সেই প্রেমগাথা। তবে মধুর একটা কাজ তাঁরা করেছেন। পাহাড়টির শিখরে ছোট্ট একটি চাতাল। এর পাশেই জড়াজড়ি করে লাগানো হয়েছে এক জোড়া গাছ। সাইরুর অসমাপ্ত বাসনা প্রতীক হয়ে বেঁচে আছে।

আমরা সেখানে পৌঁছেছি ৩১ ডিসেম্বর। বছরের শেষ দিন। রাতে খাওয়ার পর নাকি হবে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার আয়োজন। স্থানীয় শিল্পীরা গাইবেন। রাত ১২টায় ওড়ানো হবে ফানুস। রিসোর্টের কর্মীদের সঙ্গে স্বল্পদিনের তরুণ আবাসিকদের উত্তেজনা মিলেমিশে একাকার।

রাতে ঘর ছেড়ে আমরা নেমে এলাম নিচে। শ্রেয়া ক্লান্ত। সে থেকে গেল ঘরে। নেমে আসার পরপরই শুরু হলো সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। পাহাড়ি শিল্পীরা এসেছেন তাঁদের কলা পরিবেশন করতে। কোনো একটি গোষ্ঠীর নয়, পাহাড়ের নানা ক্ষুদ্র জাতির। বিচিত্র ভাষার গান আর নাচে রঙিন হয়ে উঠল সন্ধ্যা।

এই সাংস্কৃতিক কলকাকলির মধ্যেই কিছু তরুণ–তরুণী ছুটে এলেন বড় বড় বেলুন হাতে। কারও হাতে ফানুস ওড়ানোর সরঞ্জাম। নতুন বছরের মুহূর্ত এবার তবে আসন্ন!

চত্বর সরগরম হয়ে গেল দেখতে না দেখতে। ম্যাচ বাক্স আকারের চৌকো চৌকো দেখতে দাহ্য কী একটা জিনিস ফানুসগুলোর তলায় লাগিয়ে দেওয়া হলো। আগুন ধরানো হলো তাতে। সে আগুনে তপ্ত হালকা বাতাস ভরে ফোলানো হতে লাগল ফানুস। বড়রা চেঁচিয়ে ছোটদের বলছেন ফানুস ফোলানোর কাজে হাত লাগাতে। ক্যামেরায় এই স্মরণীয় মুহূর্ত ছবি করে রাখতে হবে যে। কিন্তু চিৎকার করতে করতে বড়রাই কখন ছোটদের হটিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন ফানুসের ওপর।

default-image

উড়তে উড়তে আকাশে তারার মতো মিটমিট করতে লাগল ছোট ছোট অসংখ্য ফানুস। এর মধ্য দিয়ে অভিষেক হলো ২০২২ সালের।

নতুন বছরের ভোরে আমি আর শাওন গিয়ে বসেছি পাহাড়ের শিখরে, সাইরু চত্বরে। চারদিকে স্তিমিত আলো। নিস্তব্ধতার চাদরে হঠাৎ পাখির ডাকের ফোঁড়। একটা মৌমাছি বুনো একটা ফুলগাছে প্রায় স্থির অবস্থানে থেকে নিবিষ্ট মনে উড়ছে। মাঝেমধ্যে নড়েচড়ে উঠে ছোট ছোট ফুলে শুঁড় ঢুকিয়ে মধু শুষে নিচ্ছে। ভারি মধুর! দূর পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে মেঘ ভারী হয়ে ঘুমাচ্ছে। হঠাৎ করে মনে হবে স্তব্ধ মেঘের হ্রদ। মেঘের ভঙ্গিমায় মনে হবে, সে হ্রদে ঢেউ উঠে জাদুবলে চিরস্থির হয়ে আছে।

‘ভাষার ওপারে’ নামে একটা কবিতায় একবার লিখেছিলাম, ‘কোথায় সে হ্রদ যার চিরস্থির জলে/ ঢিল ছুড়লে তরঙ্গ ওঠে না?’ শাওন বলল, মনে হচ্ছে না, এটা তোমার কবিতার সেই হ্রদ?

এরই মধ্যে শ্রেয়া এসে যোগ দিল। গল্প করতে করতে আমরা এগিয়ে গেলাম পাহাড়ের পেছন দিকটায়। পাহাড় সেখানে প্রায় খাড়া হয়ে নেমে গেছে গাছপালার ভেতর দিয়ে। এখানে আসব শুনে আমাদের সহকর্মী বন্ধু সুমনা শারমীন বলেছিল, সাইরুর পেছনে একটা বুনো পথ আছে। এটাই কি তবে সেই পথ? এ পথে নেমে গিয়ে সাইরুতে ফিরে আসার উপায় আছে তো? একবার নেমে গিয়ে এ খাড়া পথেই আবার ফিরে আসতে হলে মারা পড়তে হবে।

আমাদের এত সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কাউকে পাওয়া গেল না। শাওন বলল, চলোই না, এগোতে থাকি। দেখা যাক। আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। পথটা মাঝেমধ্যেই বেশ দুর্গম আর ঢালু। এগোতে এগোতে একটা জায়গায় পৌঁছে থমকে দাঁড়াতে হলো। এখানে প্রায় খাড়া হয়ে হয়ে নেমে গেছে সামনের পথটা। বেশ এবড়োখেবড়ো। ওপর থেকে অনেকটা নিচে ছোট একটা ঝুলন্ত সেতু দেখা যাচ্ছে। এ পথ বেয়ে একবার নামলে উঠে আসা সহজ নয়।

আর এগোব কি না আমরা দ্বিধায় পড়ে গেলাম। শ্রেয়া বলল, আমি বরং নেমে দেখে আসি। সে দিব্যি নিচে নেমে সেতু পার হয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। একটু পরে ফিরে এসে অভয় দিয়ে আমাদেরও নেমে আসতে বলল। দূরে নাকি মানুষের গলার আওয়াজ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে।

আমরাও এবার এগোলাম। নিচের সেই সেতুটির পর কিছুটা পথ পেরিয়ে আরও একটা সেতু। সেটা পার হতেই সাইরু রিসোর্টের নিচের অংশ, পাহাড়ের একেবারে খাদের দিকে তৈরি।

নতুন বছরে খাড়াই–উতরাই মিলিয়ে ভালো অভিজ্ঞতাই হলো।

এরপর আবার নিজেদের নিয়ে মগ্ন মন্থর দিন। গল্পে, আলস্যে, কিছু না করায়, পাহাড় আর প্রকৃতি দেখায়। নড়াচড়া করতে হলেও আপত্তি নেই, তবে সাইরুর ভেতরেই। কখনো ঢালু পথের পাশে বসে আড্ডা দিয়ে। কখনো অদ্ভুত আকার আর রঙের নাম না জানা ফুল দেখে দেখে। আবার কখনো পুলপাড়ে জ্যাকুজির গরম পানিতে সবাই মিলে বসে থেকে। থিয়েটার হলে ছবি দেখে। আবার দেখতে দেখতে ভালো না লাগলে উঠে চলে এসে।

বাইরে চলে যাওয়ার পর এই প্রথম আমাদের কাছে এসেছে মেয়েটা। মাত্র ১২টা দিনের জন্য। এমন একটা জায়গা আমরা চেয়েছিলাম, যেখানে ওর সঙ্গটাই আমরা নিবিড় করে পাই, আর ওকে ঘিরে নিজেদেরও অনুভব করি—জায়গাটা যেন মাঝখানে এসে না দাঁড়ায়, আবার দূরেও ঠেলে না দেয়। সাইরু আমাদের তিনটা দিন করে রাখল প্রশান্ত, স্নিগ্ধ আর পরিপূর্ণ।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন