বনের ভেতরে রাস্তা শতবর্ষী গাছ পাচার

গভীর বনের ভেতরে দিয়ে তৈরি হয়েছে রাস্তা। ট্রাকে বোঝাই করে সে পথ দিয়ে নেওয়া হচ্ছে বড় বড় গাছের গুঁড়ি। বনের গভীরে আরও কিছু দূর গিয়ে দেখা গেল একটি জায়গায় দুটি ট্রাক দাঁড়িয়ে। পাশেই গঙ্গারাম নদের তীরে কাটা গাছের স্তূপ। কয়েকজন শ্রমিক নদপথে ভেলা দিয়ে টেনে আনা গাছ তীরে নামাতে ব্যস্ত।
সম্প্রতি রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের লক্ষ্মীছড়ি সংরক্ষিত বনের দোজরি এলাকায় গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা যায়। ট্রাকে গাছ তুলছিলেন কয়েকজন শ্রমিক। তাঁদের একজন বিনয় চাকমা জানান, ছয় মাস ধরে বনের কলাবনিয়া ও ভুলংতলি এলাকায় তিন শ শ্রমিক ছয় মাস ধরে আট শ গাছ কেটেছেন। এ জন্য গত ছয় মাস ধরে বনের ভেতরেই তবু করে করে থাকছেন তাঁরা।
কার নির্দেশে গাছ কাটছেন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমাদের মাঝি (শ্রমিকদের দলনেতা) শুক্রধন চাকমা। তাঁর সঙ্গে চুক্তিতে আমরা কাজ করছি। শুক্রধনের কাছে শুনেছি, দীঘিনালার নাগর চাকমা নামের এক কাঠ ব্যবসায়ীর জন্য এসব গাছ কাটা হচ্ছে।
বাঘাইছড়ি সদরের ৫০ কিলোমিটার দূরে গঙ্গারাম নদের তীরে লক্ষ্মীছড়ি সংরক্ষিত বনের অবস্থান। সম্প্রতি এই বনে গিয়ে চাম্পা, গর্জন, চাঁপালিশসহ বিভিন্ন জাতের শতবর্ষী কাটার দৃশ্য চোখে পড়েছে। বনে গাছ আনা–নেওয়ার কাজে যুক্ত শ্রমিকেরা জানান, গত বছর খানেক ধরে এই বনের কয়েক হাজার গাছ পাচারকারীদের করাতের ঘায়ে কাটা পড়েছে। গঙ্গারাম নদের তীরে গাছ পাচারের জন্য ১৫ কিলোমিটার সড়ক তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া মেলাছড়া এলাকা কমপক্ষে ১০ কিলোমিটার সড়ক তৈরি করে গাছ পরিবহন করা হচ্ছে। সেখান থেকে থেকে ট্রাকযোগে শতবর্ষী এসব গাছ দীঘিনালা হয়ে পাচার করা হচ্ছে। দীঘিনালার অন্তত তিনজন ব্যবসায়ী গাছ পাচারের সঙ্গে যুক্ত বলে তাঁরা জানান।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তর বন বিভাগের আওতায় বাঘাইছড়ি উপজেলায় তিন লাখ ৯৩ হাজার ৮৪০ একর সংরক্ষিত বন রয়েছে। এর মধ্যে শুধু সাজেক ইউনিয়নে লক্ষ্মীছড়ি, বাঘাহাহাট, মাচালং ও শিজক রেঞ্জে সংরক্ষিত বনের পরিমাণ প্রায় তিন লাখ একর। এ চার রেঞ্জের প্রতিটিতে একজন করে রেঞ্জ কর্মকর্তা, একজন করে বিট কর্মকর্তা ৩৬ জন বন প্রহরী ও ৩৬ জন গার্ড থাকার কথা। শিজক রেঞ্জে একজন বিট কর্মকর্তা থাকলেও বাকি তিনটি রেঞ্জের কোনোটিতেই বিট কর্মকর্তা নেই। এ ছাড়া প্রতিটি রেঞ্জে ৩৬ জন বন প্রহরীর স্থলে সাতজন আর ৩৬ জন গার্ডের মধ্যে আছেন মাত্র পাঁচজন করে। লোকবলের অভাবে সংরক্ষিত বনে শতবর্ষী গাছ কাটা ও চুরি হলেও কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না বন বিভাগ।
গাছ কাটায় নিয়োজিত শ্রমিক বিনয় কান্তি চাকমা, বলেন, ‘আমরা মাসিক ১০-১২ হাজার টাকায় বনের গাছ কাটি। আমাদের দলে ১০০ জন শ্রমিক রয়েছে। ছয় মাসে আট শতাধিক বড় আকারে শতবর্ষী গাছ কেটে টুকরো করা হয়েছে।’
গাছ কাটার অভিযোগ সম্পর্কে নাগর চাকমা বলেন, ‘আমরা ছয় মাস আগে বনের গাছ কাটা শেষ করেছি। এখন শুধু পরিবহন করছি। সংরক্ষিত বনের গাছগুলো পারমিট দেখিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়।’
এ ব্যাপারে বাঘাইহাট রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, গাছ আনা-নেওয়ার জন্য অনুমতি নেওয়া হয় বাগানমালিকদের। এ জন্য প্রথমে বাগানের দলিল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠাতে হয়। সেখান থেকে তদন্ত করে দেখা হয় বাগান সৃজন করা হয়েছে কি না। এরপর জেলা প্রশাসনের কার্যালয় থেকে অনুমতি সংগ্রহ করেন বাগানমালিকেরা। কিছু অসাধু লোক এসব অনুমতি নিয়ে বনের গাছ কেটে নিজেদের বাগানের গাছ বলে পাচার করছে।
আবদুল মান্নান বলেন, ‘লক্ষ্মীছড়ি রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা নেই। আমি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছি। সংরক্ষিত বনের গাছ কর্তনের অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় অভিযান চালানো হয়। গত এক বছরে প্রায় তিন হাজার ঘনফুট কাঠ জব্দ করা হয়েছে। উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বনের শতবর্ষী গাছ কেটে পাচারের বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নেব। সংরক্ষিত বনের গাছ কেটে প্রকাশ্য বাজারজাত করার নিয়ম নেই।’
গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে লক্ষ্মীছড়ির বনে ঘুরতে এসে গাছ কাটার দৃশ্য দেখেছিলেন বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ ও দুবাই চিড়িয়াখানায় সংরক্ষক হিসেবে কর্মরত ড. রেজা খান। ১ মার্চ দুবাই থেকে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, সাজেকের সংরক্ষিত বনে ১০০ থেকে ৩০০ বছরের পুরোনো গাছ রয়েছে। এসব শতবর্ষী গাছ পাখি, হনুমান, উল্লুকসহ বিভিন্ন প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। পর্যায়ক্রমে বন ধ্বংসের কারণে এ সব প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।