বাঁদরামির কারণে বানরের নির্বাসন!

বানরের বিশেষ স্বভাব বোঝাতে মানুষের সমাজেও ‘বাঁদরামি’ কথাটা প্রচলিত। কিন্তু এই স্বভাবের কারণেই নিজভূমি থেকে নির্বাসিত হতে হচ্ছে জিব্রাল্টারের বিশেষ জাতের ৩০টি বানরকে! মানুষের নাগরিক জীবনে ঝামেলা পাকানোর অপরাধে ওদের পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে দূর দেশের এক অভয়ারণ্যে। কিন্তু ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণাধীন জিব্রাল্টারের পরিবেশমন্ত্রী অবশ্য একে ‘নির্বাসন’ বলতে রাজি নন। যদিও বানর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দোষ বানরগুলোর নয়, মানুষরাই দিন দিন ওদের এলাকায় ঢুকে পড়ে এই ঝামেলা তৈরি করেছে। দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে।
ইউরোপ মহাদেশে একমাত্র জিব্রাল্টারেই এখনো কিছু বন্য বানরের বসবাস আছে। বারবারি ম্যাকাকু প্রজাতির এই বানর জিব্রাল্টার মাঙ্কি হিসেবেও পরিচিত। অবশ্য স্থানীয়রা এদের স্রেফ ‘মনোস’ বা বানর বলেই ডাকে। ইউরোপ আর আফ্রিকাকে আলাদা করা ভূমধ্যসাগরের প্রবেশ পথ জিব্রাল্টার প্রণালি দেখতে পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে সারা বছরই। আর এই বানরগুলোও দীর্ঘদিন ধরে এই শহরের পথে-ঘাটে বেড়ে উঠতে উঠতে পর্যটকদের সঙ্গে এতটাই স্বচ্ছন্দ যে ছবি তোলার জন্য পর্যটকদের ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে, বসতে বা হাসতেও অভ্যস্ত ওরা।

কিন্তু কিছুদিন ধরে জিব্রাল্টারের এই বানরদের বাঁদরামি বেড়ে গেছে বলেই শহরের বাসিন্দাদের অভিযোগ। ওরা এখন খাবারের খোঁজে শহরের পথে-ঘাটে ময়লার ঝুড়ি ওলটপালট করে ফেলছে, হানা দিচ্ছে যেখানে-সেখানে। মানুষের ঘরবাড়ি, দোকানপাটে হানা দিয়ে সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিও করছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতেই চিহ্নিত করা হয়েছে সবচেয়ে বেশি ‘বাঁদরামি’ করা ৩০টি বানরকে। বানরগুলোর শরীরে ‘জিপিএস’ যন্ত্র ঝুলিয়ে দিয়ে ওদের সারা দিনের দৌড়ঝাঁপের গতিপথ পর্যবেক্ষণ করেছেন জিব্রাল্টারের পরিবেশ দপ্তরের লোকজন। তাঁরা দেখতে পেয়েছেন জিব্রাল্টারের মোট দুই শয়ের মতো বারাবারি ম্যাকাকুর মধ্যে এই ৩০টি বানরই বেশি ঝামেলা পাকাচ্ছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বানরগুলোকে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে স্কটল্যান্ডের ব্লেয়ার ড্রুমন্ড সাফারি পার্কে। গত কয়েক সপ্তাহে ওই বানরগুলোকে ধরে এনে একটা ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। খুব শিগগির ‘দুর্ধর্ষ’ হিসেবে চিহ্নিত ওই ৩০টা বারবারি ম্যাকাকুকে একটা বিশেষ বিমানে করে নিয়ে যাওয়া হবে স্কটল্যান্ডের ওই সংরক্ষিত বনাঞ্চলে। ভাড়া করা বিশেষ বিমানটিতে ওদের সঙ্গে থাকবেন জিব্রাল্টারের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দুজন কর্মী।

জিব্রাল্টারের পরিবেশমন্ত্রী জন কর্তেস বলেছেন, ‘ওদের চলে যাওয়া দেখাটা দুঃখজনক। কিন্তু ওরা একটা দারুণ পরিবেশে যাচ্ছে। আর তা ছাড়া ওদের মেরে ফেলার চেয়ে এটা অনেক ভালো। আমরা মনে করি না ওদের নির্বাসন দেওয়া হচ্ছে। আমরা মনে করছি, ওরা আমাদের দূত হিসেবে সেখানে থাকবে।’ব্লেয়ার ড্রুমন্ড সাফারি পার্কের ম্যাকাকু অংশের প্রধান ক্রেইগ হোমস জানিয়েছেন, এই বানরগুলোর জন্য অনেক গাছপালাওয়ালা আলাদা একটা জায়গাজুড়ে বিশেষ আবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জিব্রাল্টারের চেয়ে স্কটল্যান্ডের ওই অঞ্চলের তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশ কম বলে সেখানে একটা পাথুরে এবং বেশি তাপমাত্রার এলাকাও তৈরি করা হয়েছে। ওদের জন্য যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে বলেও জানান তিনি।
জিব্রাল্টার ন্যাচার রিজার্ভ নামে পরিচিত এই পাথুরে এলাকায় এই বারবারি ম্যাকাকুর বসবাস কয়েক শত বছর ধরে। ধারণা করা হয়ে থাকে ১৮ শতকের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ সৈনিকেরা আফ্রিকা থেকে এই প্রজাতির বানর নিয়ে এসেছিলেন জিব্রাল্টারে। ১৯৯৩ সালে আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের অধীনে এ এলাকাটিকে বন্যপ্রাণীর জন্য বিশেষ সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয় এবং ২০১৩ সালে এলাকাটিকে আরও সম্প্রসারিত করা হয়। শ দুয়েক বারবারি ম্যাকাকু ছাড়াও এলাকাটি অতিথি পাখিদের জন্য বিশেষ আশ্রয়।
এদিকে জিব্রাল্টারের বানর ব্যবস্থাপনা দলের প্রধান এরিক শ বলেছেন, ওই ১১টি পুরুষ আর ১৯টি নারী বানরকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। তিনি বলেন, ‘সমস্যাটা হলো আমরাই দিন দিন ওদের এলাকায় ঢুকে পড়েছি। আমাদের বুঝতে হবে যে, ওদের সঙ্গে ভাগাভাগি করেই এখানকার এই পাথুরে এলাকাটায় বসবাস করছি আমরা।’