বাবা আবুল হোসেন খান ছিলেন সরকারের একজন আইন কর্মকর্তা। জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকে বাবাকে দেখেই আমাদের দুই বোনের আইন পেশায় আসার আগ্রহ তৈরি হয়। আমার আর আমার বড় বোনের ছোটবেলা যেন আদালত প্রাঙ্গণেই কেটেছে। সবাই ডিসেম্বরের ছুটিতে যায় কক্সবাজার, আর বাবা ‘ভ্যাকেশন জজ’ হওয়ার কারণে আমরা আদালতে ঘুরেছি।

বাবার কর্মসূত্রে আমাদের নানা জেলায় থাকতে হয়েছে। বাবার বদলি মানেই আমাদের নতুন স্কুল, নতুন এলাকা। বাবাকে ছোটবেলায় দেখেছি সারাক্ষণ কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত। বিভিন্ন মামলা নিয়ে কাজ। মামলা পরিচালনায় বাবার পরিশ্রম, সততা আর নানা চাপ মানিয়ে নেওয়ার কৌশল দেখে মুগ্ধ হতাম।

বাবার দেখানো পথেই আমরা দুই বোন চলেছি। সবার বাবা তো ছোটবেলায় রূপকথার গল্প বলে, আর আমরা শুনেছি নানা মামলা, নানা রহস্যের গল্প। ঈদের সময় বাবার সঙ্গে বিভিন্ন জেলার জেলখানায় যাওয়ার সুযোগ পেতাম। নরসিংদী জেলে বাবার সঙ্গে একবার গিয়েছিলাম। সাত বছর ধরে বিচার চলছে, এমন একজন মানুষকে দেখে মন খুব খারাপ হয়েছিল। আরেকবার এক জনপ্রতিনিধির ভাইয়ের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছিলেন বাবা। রাতে আমাদের বাসায় সে কী হট্টগোল! তখনো ঠান্ডা মাথায় বাবাকে সব সামলাতে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার শুরুর দিকে আইনগত বিষয় বা শব্দের অর্থ খুব একটা বুঝতে পারতাম না। কিন্তু সব সমস্যা সহজ হয়ে যেত বাবার কাছে গেলে। আমার প্রথম আইনের শিক্ষক আমার বাবা। ছোটবেলায় বাবা আমাদের জন্য বিভিন্ন দেশের বিচারকদের বই বা আত্মজীবনী নিয়ে আসতেন, পড়তে উৎসাহ দিতেন। বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ নানা দেশের বিচারকদের আত্মজীবনী পড়তে পড়তেই হয়তো আমার ও আমার বোনের মধ্যে আইন পড়ার আগ্রহ জেগেছে।

বাবা এখন অবসরে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সালিসি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করেন। তাঁর কাছে সালিসির নানা গল্প শুনতে শুনতে আমিও এখন সালিসি মীমাংসায় আগ্রহী হয়ে উঠেছি। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দলগতভাবে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি। আইনসংক্রান্ত সালিসিবিষয়ক কেসের সমাধানের জন্য আমি প্রতিযোগিতায় বাবার সহায়তা নিই। তাঁর পরামর্শেই বিভিন্ন কেস সমাধান করে দলগতভাবে প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করি। এই অর্জন তো শুধু আমার নয়, বাবারও।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন