বাবা কানে স্টেথোস্কোপ দিয়ে রোগীকে জোরে জোরে শ্বাস নিতে বলতেন। আমিও তখন পাশ থেকে চিৎকার করে বলতাম, ‘ওটা দিয়ে কী শোনা যায়? আমিও শুনতে চাই।’ এভাবেই সেই স্টেথোস্কোপ আর প্রেসক্রিপশনের প্রেমে পড়া। সেটা ছিল শুরু, এখন আমি নিজেই সাদা অ্যাপ্রন পরে ছুটি প্রতিদিন। যে মানুষটা আমার স্বপ্নদ্রষ্টা, তিনি আর কেউ নন, আমার বাবা ডা. নুরুল আলম কুতুবী।

২০০৬ সালে বাবা হার্ট অ্যাটাক করেন। তখন বুঝতে শিখেছি, কাছ থেকে দেখেছি—মানুষ কীভাবে মানুষকে সম্মান করে আর ভালোবাসে। বাবার রোগীরা বাবার জন্য রোজা রাখা শুরু করেছিলেন। শুক্রবারে মসজিদে বাবার নাম বলে সে কী কান্না! মানুষজনের ভিড়ে বাসায় দাঁড়ানো যায় না। আমি তখন অনেক ছোট। বুঝতে পারছিলাম না, বাবার এমন কী হলো যে সবাই এত কান্নাকাটি করছেন। বাবা তো হাসপাতালে শুয়েই আছেন। ব্যথা তো পাননি। কাটাছেঁড়াও হয়নি। তাহলে কী এমন হলো!

মায়ের হাত ধরে হাসপাতালে বাবাকে দেখতে গেলাম। দেখি, এক রোগী চিৎকার করে বাবার জন্য হায়াত চাইছে আর বলছে, ‘এই মানুষটা না থাকলে আমি কোনো দিন আমার ছেলেকে ফিরে পাইতাম না। আল্লাহ, তুমি আমার জীবন নিয়ে যাও, তবু মানুষটাকে ফেরত দাও।’ অবাক হয়ে শুনছিলাম সেই আর্তনাদ। মনে মনে ভাবছিলাম, আমি কত সৌভাগ্যবান, এমন একজন সুপারম্যান আমার বাবা! সেদিনই মনে মনে ভাবনাটা দৃঢ় হলো—আমি বাবার মতো হতে চাই।

সবার দোয়ায় সুস্থ হয়ে বাবা আমাদের মাঝে ফিরে এলেন। তাঁর মুখে অ্যানাটমির গল্প শুনতাম, তাঁর শিক্ষকদের গল্প শুনতাম, আর শুনতাম মানবদেহের মতো এক ‘ম্যাজিক বক্সের’ গল্প। গণিতটাই বেশি ভালো লাগত, কিন্তু শেষমেশ বাবার মুখে শিরা–উপশিরার গল্প শুনতে শুনতে আমিও একই পথে হাঁটলাম—ওই যে বাবার মতো মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার লোভে। মানুষের জীবনের গল্পে খুব ছোট করে হলেও যেন আমার নামটা থাকে।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন