বাল্যবিবাহ সর্বনাশ ডেকে আনে

বাংলাদেশে কন্যাশিশুর সংখ্যা আড়াই কোটিরও বেশি। কিন্তু নানা কারণে এসব শিশুর অনেকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষ করে বাল্যবিবাহের মধ্য দিয়ে লঙ্ঘিত হচ্ছে তাদের মানবাধিকার। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও খুব একটা কাজ হচ্ছে না। এ ব্যাপারে প্রথম আলো কথা বলেছে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সম্পাদক নাছিমা আক্তারের সঙ্গে
প্রথম আলো: দেশে এখনো ৬৬ শতাংশ মেয়ের বাল্যবিবাহ হচ্ছে, বিষয়টাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
নাছিমা আক্তার: শিশুবিবাহের হারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ। শতকরা ৬৬ ভাগ মেয়েকে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে দেওয়া হয়, যা আমার দৃষ্টিতে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যের আটটি লক্ষ্যের মধ্যে ছয়টিকেই সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে। তাই দেশের শিশুদের শিশুবিবাহের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে না পারলে, কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। বাল্যবিবাহের ফলে আমাদের সম্ভাবনাময় কিশোর-কিশোরীদের বেড়ে ওঠা, তাদের শিক্ষাজীবন ও বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। বিয়ে মানুষের জীবনের একটি আনন্দময় ঘটনা হলেও বাল্যবিবাহ কোনো উৎসবের আমেজ বয়ে আনে না, বরং সর্বনাশ ডেকে আনে।
প্রথম আলো: সরকার মেয়েদের বিয়ের বয়স নির্ধারণ করে যে খসড়া আইন করেছে, তা কি বাল্যবিবাহ রোধ করেব বলে আপনি মনে করেন?
সরকার ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৪’ নামে একটি খসড়া আইন প্রণয়ন করেছে। এ আইনে বাল্যবিবাহের শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ কারাভোগের মেয়াদ তিন মাসের জায়গায় দুই বছর করা হয়েছে। জরিমানা বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। কিন্তু খসড়া আইনে বিয়ের ন্যূনতম বয়স শর্তাধীনভাবে কনের ক্ষেত্রে ১৬ বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। কারণ, বিয়ের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত এই বয়স জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদের লঙ্ঘন, যেখানে ১৮ বছরের নিচে সবাইকে শিশু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, শিশু আইন ২০১৩ ও জাতীয় শিশুনীতি ২০১১ অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী সবাই শিশু। সরকার যেখানে কন্যাশিশুর বিয়ে প্রতিরোধে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তে বিয়ের বয়স কমিয়ে আনা হলে পরোক্ষভাবে শিশুবিবাহকেই উৎসাহিত করা হবে।
প্রথম আলো: ঠিক কী পদক্ষেপ নিলে বাল্যবিবাহ রোধ হবে বলে আপনার মনে হয়?
নাছিমা আক্তার: বর্তমানেসরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে বাল্যবিবাহ কিছুটা রোধ করা গেলেও স্থায়ীভাবে এ সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে আরও ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। কন্যাশিশুর অধিকার সুরক্ষায় এ-সংক্রান্ত আইন সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা ও আইন মানার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এ ছাড়া বাল্যবিবাহ রোধে বয়স প্রমাণে ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন সনদ দেখানো বাধ্যতামূলক করা, ইউনিয়ন তথ্যসেবাকেন্দ্র থেকে বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর প্রভাবের ওপর লিফলেট বিতরণ, কমিউনিটি রেডিওর মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কিশোরীদের জন্য সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান পরিচালনা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রচারণা চালাতে হবে। এ ছাড়া জনসচেতনতা তৈরিতে সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটকেও কাজে লাগানো যেতে পারে।
প্রথম আলো: মেয়েদের বাল্যবিবাহের ফলে দীর্ঘ মেয়াদে কী কী কুফল বয়ে আনে?
নাছিমা আক্তার: বাল্যবিবাহ কন্যাশিশুদের শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। বাল্যবিবাহ মা ও তাঁদের সন্তানদের স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। শারীরিক ও মানসিকভাবে অপ্রস্তুত মায়ের সন্তান জন্মদানের সময় ঝুঁকি দেখা দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে গর্ভধারণজনিত নানা সমস্যা যেমন অবস্টেট্রিক ফিস্টুলার শিকার হতে হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী অন্তঃসত্ত্বা নারীদের তুলনায় ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী অন্তঃসত্ত্বা নারীদের মৃত্যুঝুঁকি থাকে পাঁচ গুণ বেশি।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রোকেয়া রহমান