বৈধ জোত পারমিটে অবৈধ কাঠ পাচার!

বনের গাছ কেটে গাড়িতে তুলছেন শ্রমিকেরা। ব্যক্তিগত ভূমিতে লাগানো গাছ কাটার জোত পারমিট দেখিয়ে পাচার করা হয় এসব গাছ। ছবিটি সম্প্রতি বান্দরবানের থানচি উপজেলার তিন্দু সংযোগ সড়ক এলাকা থেকে তোলা l প্রথম আলো
বনের গাছ কেটে গাড়িতে তুলছেন শ্রমিকেরা। ব্যক্তিগত ভূমিতে লাগানো গাছ কাটার জোত পারমিট দেখিয়ে পাচার করা হয় এসব গাছ। ছবিটি সম্প্রতি বান্দরবানের থানচি উপজেলার তিন্দু সংযোগ সড়ক এলাকা থেকে তোলা l প্রথম আলো

ব্যক্তিমালিকানাধীন ভূমিতে লাগানো গাছ কাটার অনুমতিপত্র (জোত পারমিট) দেখিয়ে বান্দরবানের প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের মূল্যবান গাছ কেটে পাচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি রুমা, থানচি ও রোয়াংছড়ি উপজেলার কয়েকটি স্থানে ঘুরে প্রাকৃতিক বনের গাছ চেরাই করে ফেলে রাখতে দেখা গেছে। বৈধ জোত পারমিট দেখিয়ে এসব কাঠ পাচার করা হয় বলে বৃক্ষ নিধনের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকেরা জানান।
থানচির তিন্দু ইউনিয়নের নির্মাণাধীন সংযোগ সড়কে প্রাকৃতিক বন কেটে গাছ চেরাই করে গাড়িতে তুলছিলেন কয়েকজন শ্রমিক। এ সময় কথা হয় শ্রমিক সৈয়দুর রহমান, মোহাম্মদ আলী ও আবদুল হামিদের সঙ্গে। তঁারা বলেন, পেটের দায়ে দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরিতে বনের গাছ কাটছিলেন তাঁরা। তাঁদের সঙ্গে ২০-২৫ জন শ্রমিক ১০-১২ দিন ধরে এই কাজ করছেন।
রুমা উপজেলার শঙ্খ নদের রুমা মুখে কয়েক হাজার ঘনফুট কাঠের স্তূপ দেখা গেছে। সেখানে কর্মরত আবু সাফিয়ান মাঝি (শ্রমিক সর্দার), নুর মোহম্মদ ও আবুল হাসেম বলেন, জেলার কয়েকজন কাঠ ব্যবসায়ী এসব কাঠ সংগ্রহ করেছেন। এই শ্রমিকেরা জানান, বগালেক, বগামুখ, নোয়াপড়া, কেওক্রাডং, দার্জিলিংপাড়া, সাইকদপাড়া, জাদিপাইপাড়া, মুন্নুয়ামপাড়া, আর্থাপাড়া ও শুক্রমনিপাড়া এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা কাঠ সংগ্রহ করেন।
একই দশা রোয়াংছড়ির উপজেলারও। সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রোয়াংছড়ির রনিংপাড়া, পাইনক্ষ্যংপাড়া, ঢেবাপাড়া, মহেন্দ্রপাড়াসহ বিভিন্ন পাড়া এলাকায় অবাধে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল উজাড় করা হচ্ছে। গত ৫ মার্চ পাইনক্ষ্যং রেঞ্জের বন বিভাগের বনকর্মীরা রনিংপাড়া এলাকা থেকে ৫৫০ ফুট বিপণন নিষিদ্ধ চম্পা ফুল কাঠ আটক করেছে বলেও জানা গেছে।
থানচি সদর ইউপির শেরকর বমপাড়ার একজন ইউপি সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন পর্দাক মৌজা ও নাইতিং মৌজায় কোনো জোত পারমিট নেই। কিন্তু সেখানে সিমত্লাংপি পাড়া, প্রাথাপাড়া, বাকলাইপাড়া, তামলাও পাড়া, নোয়াচরণপাড়া, জুলুপাড়াসহ বিভিন্ন পাড়া এলাকায় অবাধে মূল্যবান চম্পাফুল, কড়ই, গর্জন, গুটগুট্যাগাছ কেটে প্রাকৃতিক বন উজাড় করা হচ্ছে। বৈধ জোত পারমিট দেখিয়ে কীভাবে কাঠ পাচার হয় সেটা ব্যাখ্যা করেন থানচি উপজেলার একটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, একটি মৌজার হেডম্যান এবং রুমা উপজেলার একজন জমির মালিক। এই ব্যবসার সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত থাকায় তাঁরা নাম প্রকাশ করতে চাননি। তাঁরা বলেন, বনের গাছ পাচারের জন্য প্রথমে পাচারকারীরা পাহাড়ি জমির মালিকের বন্দোবস্ত দলিল (জমি নয়) জোত পারমিটের জন্য চুক্তিতে কিনে নেন। দলিলের জমিতে থাকা কিছু গাছ দেখিয়ে বন বিভাগ থেকে কাঠ পরিবহনের অনুমতিপত্র অর্থাৎ জোত পারমিট নেওয়া হয়। ওই পারমিট দেখিয়ে অবৈধভাবে কাটা গাছ বৈধ হিসেবে পাচার করা হয়।
এ ব্যাপারে পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলনের বান্দরবানের সভাপতি জুয়ামলিয়ান আমলাই বলেন, বৈধ জোত পারমিটে যেভাবে নির্বিচারে বন উজাড় করা হচ্ছে, তা বন্ধ করা না গেলে আগামী কয়েক বছরে বান্দরবানে আর কোনো প্রাকৃতিক বনাঞ্চল থাকবে না। বন বিভাগের রাইনক্ষ্যং ও সাঙ্গু সংরক্ষিত বনাঞ্চলেও এখন পাচারকারীরা ঢুকে পড়েছে। গাছ টানার জন্য পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি হচ্ছে।
তবে শহরের কাঠ ব্যবসায়ীরা বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। কাঠ ব্যবসায়ী লোকমান হাকিম, জুলু শিকদার বলেন, জোত পারমিটের বাইরে ব্যবসায়ীরা প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের গাছ কাটেন না। স্থানীয় দরিদ্র লোকজন বনাঞ্চল থেকে তাঁদের জীবিকার জন্য গাছ কাটেন। দরিদ্র মানুষের পক্ষে কাঠের পারমিট সংগ্রহ সম্ভব নয়। তাই ব্যবসায়ীরা অনেক সময় তাঁদের জোত পারমিটের কাঠের সঙ্গে সামান্য কিছু কাঠ এসব মানুেষর কাছ থেকেও সংগ্রহ করেন। তবে তা পরিমাণে খুব বেশি নয় বলে তাঁরা দাবি করেন।
বন বিভাগের কর্মকর্তারাও জোত পারমিট নিয়ে কোনো রকম অনিয়মের কথা ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। ভূমিতে গাছের তালিকা দেখে জোত পারমিট দেওয়া হয়। আর গাছের তালিকা দেখে কাঠ ছাড়া হয়। তবে কেউ যদি জোত পারমিটে উল্লিখিত তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে প্রাকৃতিক বনের গাছ পাচার করে, তবে তা ধরার কোনো সুযোগ নেই।
বান্দরবানের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) হারুনুর রশিদ বলেন, অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় জোত পারমিট অনুমোদন দেওয়া হয়। পারমিটের বাইরে গাছ কাটার ও পরিবহনের কোনো সুযোগ নেই। বন বিভাগের অধিভুক্ত সংরক্ষিত বনাঞ্চল ছাড়া অশ্রেণিভুক্ত সরকারি বনে কেউ গাছ কাটলে বন বিভাগের করার কিছু নেই। এ জন্য বন বিভাগের অধিভুক্ত এলাকার বাইরে কোথাও গাছ কাটা হচ্ছে কি না, তাঁদের জানা নেই।