ভিন্ন চোখে দেখা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) যে এত সুন্দর, এ কথা কি লোকে আগে জানত? যাঁরা এখানে পড়ছেন, পড়েছেন, তাঁরাও নিজের ক্যাম্পাসকে এভাবে আগে কখনো দেখেননি। কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ জেলায় অবস্থিত এই বিদ্যায়তনের সৌন্দর্য নতুন করে প্রকাশ পেয়েছে একটি ভিডিও চিত্রে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের ‘নিউজফিডে’ এখন ঘুরেফিরে আসছে এই ভিডিও।
যে কেউ দেখলেই বুঝবেন, কাঁচা হাতের কাজ এটি নয়। আদতে ‘সিনেমাটিক’ এই তথ্যচিত্র তৈরি করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়েরই একদল ছাত্র। তাঁরা আর সবার চেয়ে আলাদা। যে ব্যানারে সংগঠিত হয়ে কাজ করেন, ছবি তোলেন, ছবি নিয়ে আড্ডা বা তর্ক-বিতর্কে মেতে ওঠেন, তার নাম ইসলামিক ইউনিভার্সিটি ফটোগ্রাফি অ্যাসোসিয়েশন। সংক্ষেপে আইইউপিএ। বই-খাতার ব্যাগের পাশাপাশি ক্যামেরার ব্যাগটাও ঝোলে তাঁদের অনেকের কাঁধে। সবার যে ক্যামেরা আছে, তা নয়। মুঠোফোনের ক্যামেরাতেই অনেকে তুলে ফেলেন চমকপ্রদ সব ছবি। গণিত বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র সোহানুর রহমান তেমনই একজন।
সংগঠনটির বর্তমান সভাপতি সোহান জানালেন, ২০১৭ সালে এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগে ছবি তোলা নিয়ে তাঁর তেমন আগ্রহ ছিল না। সংগঠনের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের দেখে ছবি তোলার প্রতি ঝোঁক তৈরি হয়। এরপর ছোট ছোট স্বীকৃতি আসতে থাকে। ২০১৯ সালে বরিশাল ফটোগ্রাফি অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত জাতীয় প্রদর্শনীতে তাঁর ‘লাভ ইন হিউম্যান আই’ ম্যাক্রো ছবিটি বেশ প্রশংসা পেয়েছে। পড়ালেখার বাইরে ছবি তোলা ঘিরেই এখন সোহানের যত ব্যস্ততা।
সাত বছর আগে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের রাবিব আমিন, শবে মেহের আর নাবিয়াল তন্ময়রা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠের এক কোনায় বসে ভেবেছিলেন, কীভাবে শখের ছবিয়ালদের এক ছাদের নিচে আনা যায়। তাঁদের সেই ভাবনার বাস্তবায়ন ঘটে ২০১৫ সালের ১৬ আগস্ট ফেসবুকে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি ফটোগ্রাফি অ্যাসোসিয়েশন নামে একটি গ্রুপ খোলার মধ্য দিয়ে। শুরুতে গ্রুপটিতে ছবি পোস্ট করা আর টুকটাক আলোচনা ও মন্তব্য—কার্যক্রম বলতে ছিল এতটুকুই।
কিন্তু খুব দ্রুতই শবে মেহের ও নাবিয়াল তন্ময়ের নেতৃত্বে ফেসবুক থেকে বেরিয়ে এসে শখের ফটোগ্রাফাররা আয়োজন করেন ‘বেসিক ফটোগ্রাফি ওয়ার্কশপ’, বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের কাছ থেকে শেখেন ছবি তোলার কলাকৌশল, চেনেন ক্যামেরার কলকবজা।
তন্ময় বলেন, এরপর তাঁরা আয়োজন করেছেন ‘আইইউপিএ ফটো ফেস্টিভ্যাল সিজন ১’। তাঁদের এই আয়োজনে অংশ নেন দেশ-বিদেশের নামকরা আলোকচিত্রীরা। ছবি জমা পড়ে ভারত ও ফিলিপাইন থেকেও। দলগতভাবে ছবি তুলতে যাওয়া, ছবি নিয়ে বিশ্লেষণ, দুই মাস ধরে দিনের ও রাতের ক্যাম্পাসের ছবি তুলে নিজেদের ঝালিয়ে নেওয়ার কাজ থেমে থাকেনি আর। করোনাকালে তাঁরা আয়োজন করেছেন ‘অনলাইন ফটো আড্ডা’। এতে অভিজিৎ বিশ্বাসসহ চিত্রকল্পের আলোকচিত্রীরা যোগ দিয়েছেন।
তন্ময় বলেন, অ্যাসোসিয়েশনের সর্বশেষ আয়োজন ইবি নিয়ে এই ‘সিনেমাটিক’ তথ্যচিত্র। ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য তুলে ধরার স্বীকৃতি তাঁরা খোদ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ থেকেও পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্যালেন্ডারে স্থান পেয়েছে তাঁদের তোলা ছবি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠনটি কতটা সরব, তা টের পাওয়া গেল এর সদ্য সাবেক সভাপতি জীবন মালাকারের সঙ্গে কথা বলে। জীবন ২০১৭ সালে এ সংগঠনে যোগ দেওয়ার আগে ছবি তোলা নিয়ে ‘সিরিয়াস’ ছিলেন না, সে কথা স্পষ্ট করেই বললেন। ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত সপ্তম এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন ইন্টারন্যাশনাল ফটো কার্নিভ্যালে চার হাজার ছবির মধ্যে তাঁর তোলা ছবিটি দ্বিতীয় হয়। পরের বছর দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত ‘লেটস ডিএমজেড পিস-এনভায়রনমেন্ট অ্যাওয়ার্ড ২০২০ ’-এ পুরস্কৃত হন। এই পুরস্কারের সেরা ৩০টি ছবি ছাপা হয় দ্য গার্ডিয়ান-এ। হ্যাঁ, সেখানে জীবন মালাকারের তোলা ছবিও ছিল।
সর্বশেষ প্রথম আলোর ২৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘বাংলার মুখ’ শীর্ষক পাঠকদের তোলা আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় প্রদর্শনীর জন্য নির্বাচিত সেরা ১০০ ছবির দুটি ছিল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সংগঠনের দুজনের। একটি নাবিয়াল তন্ময়ের তোলা, আরেকটি জীবন মালাকারের।
চাইলে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি ফটোগ্রাফি অ্যাসোসিয়েশনের ফেসবুক পেজে গিয়ে তাদের বানানো তথ্যচিত্রটি দেখতে পারেন আপনিও। ৪ মিনিট ৫৫ সেকেন্ড একটি সুন্দর সময় কাটবে—এই নিশ্চয়তা দেওয়াই যায়।