যৌতুকের টাকা দিতে না পারায় বোনকে রেখে গেছে

পাঠকের প্রশ্ন বিভাগে আইনগত সমস্যা নিয়ে নানা রকমের প্রশ্ন পাঠিয়েছেন পাঠকেরা। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মিতি সানজানা নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন এবার

মিতি সানজানা

প্রশ্ন: আমরা হিন্দু পরিবার। আমার বোনের বিয়ে হয়েছে আট মাস। এত দিন সংসার করার পর এখন জামাইবাবু ও তাঁর পরিবারের অভিযোগ—আমার বোন সংসারের কোনো কাজ পারে না, আমার বোনের বাচ্চা হবে না, আমার বোনের কাছ থেকে স্বামীর জৈবিক চাহিদা মিটছে না ইত্যাদি। এসব কারণ দেখিয়ে তারা আমার বোনকে ছেড়ে দিতে চাইছে। উল্লেখ্য, এই আট মাসে দোকানে মালামাল তুলবেন বলে আমার বাবার কাছ থেকে জামাইবাবু প্রায় তিন লাখ টাকা নিয়েছেন। এখন বাবা অসুস্থ হওয়ায় টাকা দিতে পারছেন না, তাই তাঁরা আমার বোনকে পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা শোনান। বোনের গায়ে হাতও তোলেন। কিছুদিন আগে বোনকে আমাদের বাড়িতে রেখে গেছেন। এখন আর খোঁজ নিচ্ছেন না। আমাদের করণীয় কী?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

উত্তর: জাতিসংঘ ঘোষিত নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ ১৯৭৯ ও শিশু অধিকার সনদ ১৯৮৯-এর স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে বর্ণিত নারী ও শিশুর সম–অধিকার প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ, পারিবারিক সহিংসতা থেকে নারী ও শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ প্রণীত হয়েছে।

পারিবারিক সহিংসতা বলতে পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে, এমন কোনো ব্যক্তি কর্তৃক পরিবারের অপর কোনো নারী বা শিশু সদস্যের ওপর শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন অথবা আর্থিক ক্ষতিকে বোঝাবে। আপনি অভিযোগ করছেন যে আপনার বোনের স্বামী তাঁকে মারধর করছেন, মানসিক নির্যাতন করছেন, সেই সঙ্গে যৌতুক দাবি করছেন। কাজেই বিষয়টি পারিবারিক সহিংসতার সংজ্ঞায় পড়বে।

এ আইনের অধীন তিনি নিচের প্রতিকারগুলো চাইতে পারবেন—

ক. এ আইন অনুসারে প্রতিকার পাওয়ার অধিকার;

খ. চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তির সুযোগ;

গ. প্রয়োগকারী কর্মকর্তার নিকট থেকে সেবাপ্রাপ্তির সুযোগ;

ঘ. প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০ অনুসারে বিনা খরচে আইনগত পরামর্শ ও সহায়তাপ্রাপ্তি।

আপনি জানিয়েছেন, আপনার পরিবার থেকে তিন লাখ টাকা যৌতুক হিসেবে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে যৌতুক লেনদেন উভয়ই সমান অপরাধ। ১৯৮০ সালের যৌতুক নিরোধ আইনের ২ ধারা অনুসারে যৌতুক বলতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যেকোনো সম্পত্তি বা মূল্যবান জামানতকে বোঝায়। যদি কোনো বিয়েতে এক পক্ষ অপর পক্ষকে অথবা কোনো এক পক্ষের মা-বাবা বা অন্য কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে যেকোনো পক্ষকে বা অন্য কোনো ব্যক্তিকে বিয়ের মজলিশে অথবা বিয়ের আগে বা পরে পণ হিসেবে কিছু প্রদান করে বা প্রদান করতে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়, তবে সেটিই যৌতুক হিসেবে বিবেচিত হবে।

যৌতুক আইনের ৩ ও ৪ নম্বর ধারায় বলা আছে, কোনো ব্যক্তি যৌতুক প্রদান করলে বা প্রদানে সহায়তা করলে বা যৌতুক দাবি করলে এক বছরের কারাদণ্ড বা সর্বাধিক পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় প্রকারের দণ্ডে দণ্ডনীয় হবে।

যৌতুকবিরোধী আইন অনুসারে এ ধরনের অপরাধ আপসের অযোগ্য। এ আইনের ৭ নম্বর ধারা অনুসারে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর এক বছরের মধ্যে অভিযোগ না করলে আদালত এ ধরনের অভিযোগ আমলে নেবে না। প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের নিম্ন আদালত এ ধরনের অপরাধের বিচার করবেন না।

আমাদের দেশে বিবাহ ও বিচ্ছেদ যার যার নিজ নিজ ধর্মীয় আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ধর্ম, রীতিনীতি ও আচার-অনুষ্ঠান অনুযায়ী হিন্দু বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর সাধারণত ওই বিয়ের দালিলিক প্রমাণ সুরক্ষার উদ্দেশ্যে নির্ধারিত পদ্ধতিতে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধক বিবাহ নিবন্ধন করে থাকেন। আমাদের দেশে হিন্দু বিবাহ অবিচ্ছেদ্য হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশের প্রচলিত হিন্দু আইনে বিবাহবিচ্ছেদ করা সম্ভব নয়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এ আইনে পরিবর্তন এনে হিন্দু বিবাহবিচ্ছেদকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো এ বিষয়ে কোনো আইন হয়নি। কোনো কারণে দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করা সম্ভব না হলেও বিচ্ছেদের কোনো ব্যবস্থা প্রচলিত হিন্দু আইনে নেই। তবে আপনি ১৯৪৬ সালের ‘বিবাহিতা নারীর পৃথক বাসস্থান ও ভরণপোষণ আইন’-এর অধীন আদালতে ‘দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের’ জন্য মামলা করতে পারেন।

যেহেতু আপনার বোন মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন এবং তাঁরা যৌতুকের জন্য চাপ দিচ্ছেন, তাই আপনার বোন এ আইনের অধীন স্বামীর কাছ থেকে আলাদা হয়েও ভরণপোষণ পেতে পারেন। আর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণ সাপেক্ষে আদালত তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর করতে পারেন। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই বিবাহবিচ্ছেদ পাবেন না।

লেখা পাঠানোর ঠিকানা

অধুনা, প্রথম আলো, প্রগতি ইনস্যুরেন্স ভবন, ২০–২১ কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।

ই-মেইল: [email protected], ফেসবুক: facebook.com/adhuna.PA খামের ওপর ও ই-মেইলের subject–এ লিখুন ‘মনের বাক্স’