পরদিন বাড়ি ফিরে বাবা আবার বলতেন, ‘ক্রিস্টিয়ানো আজ দুটো গোল করেছে!’

সেই একই নিরুত্তাপ কণ্ঠস্বর, ‘খুব ভালো ক্রিস।’

একের পর এক গোল করে যাওয়া ছাড়া আমার কিছু করার ছিল না।

এক রাতে বাড়ি ফিরে বাবা ভীষণ উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘ক্রিস্টিয়ানো আজ তিন গোল করেছে! এটা অবিশ্বাস্য! তোমাদের ওর খেলা দেখা উচিত!’

পরদিনও সাইড লাইনে দেখলাম বাবাকে, একা। তারপর একদিন...দৃশ্যটা আমি কখনো ভুলব না...আমি তখন খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, দেখলাম মাঠের পাশে একটা বেঞ্চে আমার মা আর বোন একসঙ্গে বসে আছে। তাদের দেখে মনে হচ্ছিল...কীভাবে বলি? মনে হচ্ছিল, তারা খুব আরাম করে বসেছে। বেশ গুটিসুটি মেরে। তারা তালি দিচ্ছিল না, চিৎকার করছিল না। আমাকে দেখে এমনভাবে হাত নাড়ল, যেন আমি একটা কুচকাওয়াজে অংশ নিচ্ছি। মোট কথা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, ওরা জীবনে কখনো ফুটবল ম্যাচ দেখেনি। কিন্তু তারা যে এসেছিল, এটাই আমার কাছে সব।

সেই মুহূর্তে ভীষণ ভালো লাগছিল। যেন আমার ভেতরে একটা মোচড় অনুভব করলাম। তখন আমাদের তেমন টাকাপয়সা ছিল না। জীবন ছিল একটা যুদ্ধ। বড় ভাই কিংবা কাজিনরা যেই পুরোনো জুতোগুলো আমাকে দিত, সেগুলো পরে খেলতাম। ছেলেবেলায় মানুষ টাকাপয়সা নিয়ে ভাবে না, সে বয়সে আনন্দটাই সব। সেই দিনগুলোতে আমি মনের খুব গভীর থেকে আনন্দ টের পেয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল আমার কোনো ভয় নেই, কিছু মানুষের ভালোবাসা আমার সঙ্গে আছে। পর্তুগিজ ভাষায় আমরা বলি, ‘মেনিনো কুয়েরিদো দা ফ্যামিলিয়া।’

অসহ্য একেকটা দিন

ঘটনাটা মনে পড়লে আজও স্মৃতিকাতর হই। কারণ, মনে হয় জীবনের সেই মুহূর্তগুলো খুব দ্রুত চলে গেছে। ফুটবল আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। কিন্তু এই ফুটবলই আমাকে বাড়ি থেকে অনেক দূরে নিয়ে গেছে, আমি পুরোপুরি তৈরি হওয়ার আগেই। ১১ বছর বয়সে বাড়ি ছেড়ে স্পোর্টিং লিসবোন একাডেমিতে চলে আসি। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়।

প্রায় প্রতিদিনই কাঁদতাম। আমি পর্তুগালেই ছিলাম, অথচ মনে হতো আমি একটা অন্য দেশে চলে এসেছি। আশপাশের মানুষের উচ্চারণ শুনে মনে হতো, তারা যেন সম্পূর্ণ একটা অন্য ভাষায় কথা বলছে। সংস্কৃতিটা ভিন্ন ছিল। কাউকে চিনতাম না। খুব একা লাগত। আমার পরিবারের যা সামর্থ্য, তাতে চার মাসে একবারের বেশি আমাকে দেখতে আসা তাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। বাড়ির মানুষগুলোকে এত বেশি মিস করতাম যে, প্রতিটা দিন অসহ্য মনে হতো।

সে সময় ফুটবলই আমাকে কষ্ট ভুলে থাকতে সাহায্য করেছে। মাঠে আমি যেভাবে খেলছি, একাডেমির অনেক ছেলেমেয়েই আমার মতো পারে না, এ বিষয়টা আমি বুঝতাম। এখনো মনে আছে, আমার সতীর্থ একটা ছেলে আরেকটা ছেলেকে বলছিল, ‘ও কীভাবে খেলে দেখেছ? যেন একটা জানোয়ার!’

এসব শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। এমনকি কখনো কখনো কোচরাও বলতেন। আবার এ কথাও শুনতে হতো, ‘বটে...তবে ও একেবারেই বাচ্চা।’

সত্যি। আমি খুব শুকনা ছিলাম। সুগঠিত পেশি ছিল না। অতএব ১১ বছর বয়সেই একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। জানতাম আমার মেধা আছে, কিন্তু আমি অন্য সবার চেয়ে বেশি পরিশ্রম করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ঠিক করেছিলাম, আমি ছোট হতে পারি, কিন্তু আমি ছোটদের মতো খেলব না। আমি যেন পৃথিবীর সেরা হতে পারি, সেভাবেই নিজেকে তৈরি করতে শুরু করলাম।

জিতলেও পেট ভরে না

জানি না কোথা থেকে এই জেদ আমার মাথায় ভর করেছিল। এটা এমন এক ক্ষুধা, যা কখনোই নিবারণ হয় না। হেরে গেলে মনে হয় আমি ক্ষুধার্ত। এমনকি জিতলেও মনে হয় পেট ভরেনি।

ব্যায়াম করার জন্য রাতে গোপনে ছাত্রাবাস থেকে বেরিয়ে পড়তাম। ধীরে ধীরে আমি বড় হতে থাকলাম, গতি বাড়তে লাগল। এরপর আমি যখন মাঠে নামতাম, আমাকে ‘বাচ্চা’ বলা ছেলেগুলো এমনভাবে তাকাত যেন পালানোর পথ খুঁজে পাচ্ছে না। ১৫ বছর বয়সে আমার কিছু সতীর্থকে একটা কথা বলেছিলাম। পরিষ্কার মনে আছে। বলেছিলাম, ‘দেখো, আমি পৃথিবীর সেরা হব।’ ওরা হেসেছিল। তখনো আমি স্পোর্টিংয়ের এক নম্বর দলটাতে জায়গা পাইনি, তবু বিশ্বাস ছিল।

১৭ বছর বয়সে যখন পেশাদার ফুটবল খেলা শুরু করলাম, আমার মা এই চাপ নিতে পারত না। আমার খেলা দেখতে এলে একাধিকবার জ্ঞান হারাত। সত্যি বলছি, আক্ষরিক অর্থেই জ্ঞান হারাত। শুধু আমার খেলার জন্যই চিকিৎসক মাকে ঘুমের ওষুধ দেওয়া শুরু করেছিলেন।

তখন আমি মাকে বলতাম, ‘মনে আছে, একসময় তুমি ফুটবলের কিছুই বুঝতে না?’

আমার স্বপ্ন বড় থেকে আরও বড় হচ্ছিল। জাতীয় দলে খেলব, ম্যানচেস্টারে খেলব...সারা দিন টিভিতে প্রিমিয়ার লিগ দেখতাম। প্রচণ্ড দ্রুত গতির খেলা, গ্যালারিতে দর্শকের গান—এসব আমাকে রোমাঞ্চিত করত। ম্যানচেস্টারে খেলা শুরু করার পর আমি যতটা গর্ব অনুভব করলাম, তার চেয়ে বেশি গর্বিত হলো আমার পরিবার।

যে অনুভূতি অন্য সবকিছুর চেয়ে আলাদা

প্রথম দিকে শিরোপা জিতলে খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তাম। মনে আছে প্রথমবার ম্যানচেস্টারের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার পর আবেগে আপ্লুত হয়েছিলাম। প্রথম ব্যালন ডি’অরের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। কিন্তু স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে আরও বড় হচ্ছিল। স্বপ্নের বিশেষত্বই এটা, তাই না? সব সময় নতুন চ্যালেঞ্জের জন্য তৃষ্ণার্ত থাকা। মাদ্রিদে আমি সব সময় শিরোপা চেয়েছি, সব রেকর্ড ভেঙে দিতে চেয়েছি।

কিন্তু যখন বাবা হলাম, সম্পূর্ণ অন্য এক অনুভূতির মুখোমুখি দাঁড়ালাম। যে অনুভূতি বলে বোঝানো যায় না। সে জন্যই মাদ্রিদের সময়টা আমার কাছে বিশেষ। এখানে থাকার সময়ই আবিষ্কার করেছি, আমি শুধু একজন ফুটবলার নই, একজন বাবাও।

ছেলের সঙ্গে একটা বিশেষ মুহূর্ত আমার আজীবন মনে পড়বে। মুহূর্তটা মনে পড়লে বড় ভালো লাগে। কার্ডিফে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল জিতে আমরা ইতিহাস গড়লাম। শেষ বাঁশি পড়ার পর মনে হচ্ছিল, সারা পৃথিবীকে আমি একটা বার্তা দিতে পেরেছি। কিন্তু যখন আমার ছেলে জয় উদ্‌যাপন করতে মাঠে ঢুকল...মনে হলো আচমকা সব বদলে গেল! এই অনুভূতির সঙ্গে আগে পরিচয় ছিল না। মারসেলোর ছেলের সঙ্গে ও মাঠে ছোটাছুটি করছিল। আমরা একসঙ্গে ট্রফিটা ধরলাম। হাতে হাত ধরে মাঠে হাঁটলাম। বাবা হওয়ার আগ পর্যন্ত জয়ের এই আনন্দটা কখনো বুঝিনি। একই সঙ্গে এতগুলো অনুভূতি আমার ভেতর খেলা করছিল যে, সেটা বোঝানোর মতো শব্দ আমার কাছে নেই। কেবল একটা অনুভূতির সঙ্গেই এর তুলনা হতে পারে। সেই যে মাদিরায় মা আর বোন গুটিসুটি মেরে বসে আমাকে দেখছিল, তখন আমার যেমন লেগেছিল, এই অনুভূতি অনেকটা সে রকম।

আমরা যখন জয় উদ্‌যাপন করার জন্য বারনাব্যুতে ফিরলাম, ক্রিস্টিয়ানো জুনিয়র আর মারসেলিতো তখন সব ভক্তের মাঝখানে মাঠে খেলছিল। ওর বয়সে আমি যখন রাস্তায় খেলতাম, আমার যেমন লাগত, তখন বোধ হয় ওরও তেমনই লাগছিল, ‘মেনিনো কুয়েরিদো দা ফ্যামিলিয়া’।

আমার লক্ষ্য সব সময় একটাই। সব রেকর্ড ভেঙে ফেলা। যত সম্মাননা আছে, আমি সব জিততে চাই। এটাই আমার ধরন। একসময় যখন আমার বয়স ৯৫ হবে, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর সন্তানের হাত ধরে মাঠে হাঁটতে কেমন লাগে—সেই গল্প হয়তো নাতি-নাতনিকে শোনাব। আশা করি এমন আরও অনেক গল্প আমার ঝুলিতে জমা হবে। (সংক্ষেপিত)

ইংরেজি থেকে অনুদিত