
কাজে একটু ভুল হলেই ব্লেড দিয়ে হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থান কেটে দেওয়া হতো গৃহকর্মী আদুরির। ছ্যাঁকা দেওয়া হতো গরম ইস্ত্রি দিয়ে। প্রতিদিন কেবল এক বেলা খাবার জুটত। দিনের পর দিন এ রকম চলছিল। একদিন নির্যাতনের পর অজ্ঞান হয়ে যায় আদুরি। মারা গেছে ভেবে তাকে ফেলে দিয়ে আসে একটি ডাস্টবিনের কাছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার ওই ডাস্টবিনের পাশ থেকে আদুরিকে উদ্ধার করেন স্থানীয় দুই নারী। পল্লবীর একটি বাড়িতে কাজ করত আদুরি। সেখানে গৃহকর্ত্রী ও তাঁর স্বজনেরা তার ওপর এ ধরনের অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছেন।
রাশেদা খাতুনের সারা শরীরে তীব্র ব্যথা। যন্ত্রণায় রাতের বেলা ঘুমাতে পারেন না। ব্যথার কারণ হচ্ছে স্বামী তাঁকে ইচ্ছেমতো পিটিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বাড়ি থেকে তাড়িয়েও দিয়েছে। ২৫ দিন ধরে তিনি বাবার বাড়িতে আছেন। দাবি অনুযায়ী যৌতুক না দেওয়ায় রাশেদার এই হাল। কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের নওদাবস গ্রামের দিনমজুর আবদুল জব্বারের মেয়ে রাশেদার বিয়ে হয় সাত মাস আগে পাশের গ্রামের নূর হোসেনের সঙ্গে। কথা ছিল যৌতুক হিসেবে দেওয়া হবে নগদ ৩০ হাজার টাকা ও একটি বাইসাইকেল। বিয়ের সময় দেওয়া হয় নগদ ছয় হাজার টাকা। বাকি টাকা ও বাইসাইকেলের জন্য তিন মাস সময় চাওয়া হয়। সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও যৌতুক না দেওয়ায় রাশেদাকে পিটিয়ে বের করে দিয়েছেন স্বামী।
মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার চরজানাজাত ইউনিয়নের ইলিয়াছ আহম্মদ চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর এক ছাত্রীকে স্কুলে যাওয়া-আসার পথে এলাকার বখাটে যুবক রাসেল গাজি প্রেম নিবেদনের পাশাপাশি অশালীন প্রস্তাব দিতেন। এতে ছাত্রীটি রাজি না হওয়ায় রাসেল ধারালো অস্ত্রের মুখে তাকে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। এ সময় ছাত্রীটির চিৎকারে স্থানীয়রা এলে রাসেল পালিয়ে যান। বিষয়টি ছাত্রীটির বাবা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. সুলতান মাহমুদকে জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান শিক্ষক চলতি বছরের ২২ জুন স্কুলের লাইব্রেরিতে সালিস বৈঠকের ব্যবস্থা করেন। এতে ইউপি চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত হন। সালিসে স্কুলছাত্রীকে চরিত্রহীনসহ নানা অপবাদ দিয়ে দোষী সাব্যস্ত করার চেষ্টা করে বখাটে যুবকের পক্ষের লোকজন। উভয় পক্ষের সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে বখাটে রাসেল ও স্কুলছাত্রীকে ৫০ বার বেত মারার সিদ্ধান্ত হয়। শুধু তা-ই নয়, ছাত্রীটিকে স্কুলে যেতেও নিষেধ করা হয়। সিদ্ধান্ত দ্রুত কার্যকরও হয়ে যায়। গ্রামের লোকদের এই ফতোয়ার কারণে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে ছাত্রীটির ।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর নাটোরের বড়াইগ্রামে কুরষাট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর এক ছাত্রীর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন ওই বিদ্যালয়েরই এক শিক্ষক। বৃষ্টি থাকায় সেদিন ক্লাসে ছাত্রীটি ছাড়া আর কেউ উপস্থিত ছিল না। এই অঙ্কের শিক্ষক ক্লাসে ঢুকে ছাত্রীর শ্লীলতাহানি করার চেষ্টা করেন। এই ঘটনা দেখে ফেলে দশম শ্রেণীর এক ছাত্রী। তার চেঁচামেচিতে অন্য ছাত্রীরা জড়ো হলে শিক্ষক ক্লাস থেকে বেরিয়ে যান। ছাত্রীটির পরিবার পরে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করে।
ওপরের যে চারটি ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হলো তার প্রতিটিতেই নারী ও শিশুর মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। আমাদের দেশে অহরহ এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। যেন নারীরা কোনো মানুষ নয়।
বিভিন্ন সময়ে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন নারীরা। অনেক নারী নিজ যোগ্যতায় ও দক্ষতা গুণে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠাও পেয়েছেন। নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। কিন্তু নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্ক এখনো কাটেনি। প্রতিনিয়ত কর্মস্থলে, পরিবারে, রাস্তাঘাটে নারীরা শারীরিক, মানসিক নির্যাতনসহ ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যা, অ্যাসিড-সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে করা জরিপে এ চিত্র উঠে এসেছে। এ পরিসংখ্যান দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে পাওয়া। গণমাধ্যমে আসেনি বা প্রভাবশালীদের ভয়ে বা পুলিশের উল্টো হয়রানির আশঙ্কায় থানায় অভিযোগ দায়ের না করা এমন অনেক ঘটনাই রয়ে গেছে আড়ালে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে সারা দেশে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয় ৩৬ জন নারীকে, একক ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২০৫ জন, গণধর্ষণের শিকার হন ১২৭ জন, ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে ৮৩ জন নারীকে, ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছেন আটজন, ফতোয়ার শিকার হয়েছেন ২০ জন, অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন ৮০ জন, যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৯৬ জন, গৃহপরিচারিকা নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১১০টি এবং পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩১২ জন নারী।
দিনে দিনে নারী নির্যাতনের ঘটনা যে বাড়ছে, তা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ২০১২ সালের প্রতিবেদনের দিকে তাকালে বোঝা যায়, ওই বছর ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ২৪১ জন নারীকে, একক ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৬০৯ জন নারী, গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৬৭ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৯৮ জন নারীকে, ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছেন ১৪ জন। এ ছাড়া বখাটের হাতে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ৪৫৯ জন, গ্রাম্য ফতোয়ার শিকার হয়েছেন ৪৮ জন, অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন ৬৮ জন, যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৫৩৮ জন, পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৪৮২ জন নারী।
বেসরকারি সংস্থা নিজেরা করি-এর সমন্বয়ক খুশি কবীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিভিন্ন অবস্থানে নারীদের উঠে আসা মানেই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া নয়। পদ মানেই তো ক্ষমতায়ন নয়। পদমর্যাদা বাড়লেও বাড়েনি নারীর নিরাপত্তা। নারীদের পশ্চাৎপদ চিন্তা দূর করতে হবে। নিজের অবস্থা সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে। নারী নির্যাতন রোধে আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না । এ ব্যাপারে সরকারকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে । সমাজ ও রাষ্ট্র আন্তরিক হলেই নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।’
নারী নির্যাতনের মাত্রা বেড়েই চলেছে, উল্লেখ করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভানেত্রী আয়েশা খানম প্রথম আলোকে বলেন, ৯০ দশক থেকে আমরা দেখছি নারী নির্যাতনের নতুন পদ্ধতি। নারীর ব্যক্তিগত ইস্যুতে ফতোয়া দেওয়া শুরু হলো। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই আক্রমণ হচ্ছে সমাজের পশ্চাৎপদ গোষ্ঠী নারীদের ওপর।
তিনি বলেন, আরবি শব্দ ‘ফতোয়া’-এর অর্থ ‘জিজ্ঞাসা’ বা ‘আইনসম্পর্কিত মতামত’। ধর্মীয় আইনবিশেষজ্ঞ বা মুফতি প্রদত্ত ও প্রকাশিত বিধানকে ফতোয়া বলে। কিন্তু বর্তমানে ফতোয়ার রূপ একেবারেই ভিন্ন। একশ্রেণীর সুবিধাভোগী মানুষ নারীকে দমিয়ে রাখতে, নির্যাতন করতে, নারীর অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে, নারীর চলার পথকে সংকীর্ণ করে তোলার জন্য নিজেদের মনগড়া কিছু আইন তৈরি করে নারীদের ওপর চাপিয়ে দেয় । গ্রাম্য মাতবর, মাদ্রাসার মোল্লা, মসজিদের ইমাম, স্থানীয় চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বা স্থানীয় প্রভাবশালী লোক এমনকি কখনো গ্রাম্য ডাক্তার একযোগে বা কখনো স্বতন্ত্রভাবে ফতোয়া দিয়ে আসছে। দোররা মারা, হিল্লা বিয়ে দেওয়া, একঘরে করে রাখা, মুখে চুনকালি মেখে প্রদর্শন, পাথর নিক্ষেপ, জানাজা না দেওয়া ইত্যাদি ফতোয়া দেওয়া চলছেই।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী জানান, উচ্চ আদালত ২০০৯ সালের ১৪ মে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালাসংবলিত রায় দিয়েছেন। যার আলোকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন ২০১০ প্রণীত হয়েছে। তা ছাড়া, ২০১১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালতের দ্বৈত বেঞ্চ বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়ে গৃহকর্মীদের সুরক্ষা বিষয়ে দায়ের করা রিটের রায় দিয়েছেন। এর আগে ওই বছরের ১৩ জানুয়ারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি প্রদান প্রতিরোধে নির্দেশনা দিয়ে রায় দেন। কিন্তু আদালত প্রদত্ত এসব নির্দেশ ও নীতিমালা শুধু নথির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। বাস্তবে তেমন কোনো প্রয়োগ নেই। বাস্তবায়নের জন্য নেই কোনো মনিটরিং কমিটি। এ ছাড়া কখনো সাক্ষী নাই হয়ে যায়, কখনো বাদী ভয়ে পেছায়। এমন পরিস্থিতিতে নারীর প্রতি সহিংসতা উত্তরোত্তর বাড়ছে।