সময় একদিন ফুরিয়ে যাবে

হিসাব মেলাতে বসে দেখলাম, বছরের পর বছর ধরে নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটছিলাম, নিজের মতো করে শুধু নিজের জীবন নিয়েই ভাবছিলাম। একদম নিজের ভেতর বুঁদ হয়েছিলাম। এসব করতে করতেই আমার মা, বাবা, ভাই, বোন, আমার বাচ্চা, আমার প্রথম স্ত্রী রীনা, দ্বিতীয় স্ত্রী কিরণ—তাঁদের মোটেও সময় দিতে পারিনি। আমার কাছের মানুষদের দিকে মোটেও মনোযোগ দিইনি। আমার মেয়ে ইরার বয়স এখন ২৩। যখন ও ৫, ৬, ৮ বা ১০ বছর বয়সী ছিল, তখন নিশ্চয়ই ওর জীবনে বিশেষ কোনো স্বপ্ন ছিল, কোনো ইচ্ছা ছিল। কখনো হয়তো ওর খুব ভয় লাগত অথবা ওর ছোটবেলায় হয়তো কোনো এক সময় ওর খুব একা লাগত। কিন্তু ওই সময় আমি ওর পাশে থাকতে পারিনি। আমি যখন একের পর এক সিনেমা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, হতে পারে ও তখন অবসাদ কিংবা দুশ্চিন্তায় ভুগছিল।

আমি কোনো দিনও জানতাম না আমার মেয়ে ইরার স্বপ্নগুলো কী, ওর কী ভালো লাগে, কিসে ওর সবচেয়ে বেশি ভয়। কিন্তু আমি আমার পরিচালকদের স্বপ্ন, আশা, আকাঙ্ক্ষা, ভয়—সবই জানতাম। ২০ বছর আগে লগান ছবিতে কাজ করার সময় আশুতোষ কী খেতে ভালোবাসত, ও কেমন সিনেমা পছন্দ করত, কেমন সিনেমা বানাতে চাইত—আমি সব জানতাম। অথচ ইরা তখন কী দেখলে ভয় পেত, সেটা বলতে পারব না।

গত দুই বছরে এসব ভাবতে ভাবতে আমি উপলব্ধি করলাম, সময় হলো জীবনের সবচেয়ে অমূল্য সম্পদ। এই সম্পদ আমাদের হাতে কতটা আছে, কবে ফুরিয়ে যাবে—আমরা জানি না। আমরা শুধু জানি, সময় একদিন ফুরিয়ে যাবে। আর একবার ফুরিয়ে গেলে, এটা আর আমরা ফিরে পাব না। কিন্তু যত দিনে আমার এই উপলব্ধি হলো, তত দিনে অনেক কিছু হারিয়ে ফেলেছি। আমার সন্তানদের শৈশব, কৈশোর, আমার মা-বাবার সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত—এগুলো আমি আর ফিরে পাব না।

সন্তানেরাই আমাদের ভবিষ্যৎ

আমরা কত ধরনের সংকট নিয়ে কথা বলি। অনেক ছোট ছোট ইস্যু একসময় বাড়তে বাড়তে বড় রাজনৈতিক বিষয় বা অর্থনৈতিক সংকটে মোড় নেয়। আমার মতে, আমরা নিজেদের সন্তানদের কীভাবে বড় করছি, এই বিষয় নিয়ে আমাদের কথা বলা উচিত সবার আগে। কারণ সন্তানদের সঠিক লালন-পালন আর সুশিক্ষা নিশ্চিত করলেই ভবিষ্যতের সমাজ হবে সংকটমুক্ত। আমাদের সন্তানেরাই তো আমাদের ভবিষ্যৎ। আমেরিকান টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব মিস্টার রজার্স বাচ্চাদের নিয়ে একটা শো করতেন। সেখানে তিনি বলতেন, একজন ব্যক্তি যদি তার দেশের জন্য, জাতির জন্য, বিশ্বের জন্য ভালো কিছু করতে চায়, তাহলে সে যেন সবার আগে নিজের সন্তানকে ভালোবেসে, মন দিয়ে ভালো মানুষ হিসেবে বড় করে। কিন্তু এই সুযোগই আমি হাতছাড়া করেছি। আমি আমার সন্তানদের সময়ই দিতে পারিনি। রীনার সঙ্গে যখন আমার বিয়ে হয়, তখন আমার বয়স ছিল ২১ বছর। ছেলে জুনায়েদের জন্মের সময় আমি ২৬/২৭ বছর বয়সী। আজকাল তো দেখি সবকিছুর ওপর ভিডিও টিউটোরিয়াল পাওয়া যায়। ওই সময়ও কেউ যদি ‘কেমন করে ভালো মা-বাবা হতে হয়’ নামে একটা টিউটোরিয়াল ভিডিও বানাত আর সেটা দেখে আমাদের ভুলগুলো শুধরে নিতে পারতাম, খুব ভালো হতো।

শিশুর প্রয়োজন যে ৪টি বিষয়

তারে জমিন পর ছবির শুটিংয়ের সময় ড. শেঠি নামে আমার এক মনোবিজ্ঞানী বন্ধুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোন বিষয়গুলো বাচ্চাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন? জবাবে আমার বন্ধু দারুণ কথা বলেছিল, বাচ্চাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিরাপত্তা ও সুরক্ষা, সম্মান ও স্বীকৃতি এবং বিশ্বাস। আমি বললাম, ওদের আদর, স্নেহ, ভালোবাসার প্রয়োজন নেই? শেঠি বলল, ভালোবাসা দরকার। তবে সেটা অনেক পরের ব্যাপার। আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমরা সব সময় জেনে এসেছি, মানুষের জীবনে ভালোবাসা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তখন ওই বন্ধু আমাকে বুঝিয়ে বলল। আদর আর ভালোবাসা তো আমরা বাচ্চাদের যেকোনো সময়, যেকোনো ভাবেই দিতে পারি। সেটা কাজের ফাঁকে হোক, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সময়ে হোক, ঘুমানোর সময়, সকালে ঘুম ভেঙে—যখনই সুযোগ পাওয়া যায়, তখনই তো বাচ্চাকে আদর-স্নেহ দিতে পারি। কিন্তু যখন আমাদের রাগ হয় বা যখন তারা কোনো ভুল করে, আমরা তাদের ভীষণ বকা দিই। সবার সামনে অপমান করি। আর সারাক্ষণ তাদের প্রত্যাশার চাপে দাবিয়ে রাখি। এর মতো হতে হবে, ওর মতো হতে হবে, পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতে হবে। নানাজনের সঙ্গে তুলনা করি, প্রতিযোগিতার মধ্যে ফেলে দিই। আর যদি কখনো বাচ্চারা আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারে, নানাভাবে তাদের অপমান করি। কিন্তু কঠিন সময়গুলোতেই ওরা আমাদের কাছে আশ্রয় চায়, একটু নিরাপত্তা, একটু সম্মান আর স্বীকৃতি চায়। এগুলো মূল, খাবার পাতে থাকা ভাত-তরকারির মতো ‘মেইন কোর্স’। আর আদর-ভালোবাসা হলো জলখাবারের পর মিষ্টি কিছু (ডেজার্ট)।

এবিপি নিউজের ইউটিউব চ্যানেল অবলম্বনে

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন