২ হাজার ৪০০ বর্গফুটের একটা ভাড়া বাড়িতে সংসার সাজিয়েছেন অভিনেত্রী–উপস্থাপিকা তানিয়া হোসাইন ও গায়ক–সংগীত পরিচালক বাপ্পা মজুমদার। চার বছরের বিবাহিত জীবনে মগবাজার ও ইস্কাটন হয়ে আট মাস আগে বনানীর এই বাসায় উঠেছেন তাঁরা। একটু একটু করে নিজের হাতে পুরো বাসা গোছাতে শুরু করেছেন তানিয়া। প্রতিটি জায়গা মাপজোখ করে জিনিস রেখেছেন। তানিয়া হোসাইন বলেন, ‘অপরিকল্পিতভাবে যা ভালো লাগছে, তাই কিনে বাসা ভরে ফেলার পক্ষে আমি না। যেখানে যেটা রাখলে ভালো লাগবে, সেখানে সেটাই রাখার চেষ্টা করেছি।’

default-image

খাবার ঘরে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা ‘দ্য লাস্ট সাপার’–এর আদলে একটা ছবি রাখতে চেয়েছিলেন তানিয়া। তাই খাবার টেবিলের পাশের দেয়ালের মাপমতো চারুকলার এক ছাত্রকে দিয়ে আঁকিয়ে নিয়েছেন ‘দ্য লাস্ট সাপার’–এর অনুকরণে একটি ছবি। এমন আরও অনেক জিনিস আছে তানিয়া–বাপ্পার বাড়িজুড়ে, যা নিজেদের মতো ‘কাস্টমাইজ’ করে নিয়েছেন।

লিফট থেকে বেরিয়ে ফ্ল্যাটে ঢোকার মুখেই একটা টেরাকোটার রঙিন শিল্পকর্ম। তার দুই দিকে দুটি খাড়া লাইট দিয়ে আলোকিত করা। ভেতরে প্রবেশের পর থেকে চোখ শুধু ডানে–বাঁয়ে ঘুরবে, অনেকটা সার্চলাইটের মতো। দুই দেয়ালের সরু একটি প্যাসেজ পেরিয়ে ডানে মোড় নিলেই বসার ঘর। ১০ কদম এই জায়গাটুকু পেরোতেও আপনার পাক্কা ১০ মিনিট লেগে যাবে। কারণ, দুই ধারে নানা রকম জিনিস, কোনোটা তানিয়ার নিজ হাতে গড়া, কোনোটা আবার কেনা। একটা সিঙ্গেল চেয়ারের পাশে রাখা টকটকে লাল খাতা–কলম আর লম্বা হাতলের ‘জীবিত’ টেলিফোন। পাশের আরেকটি কালো টেবিলের ওপর বাপ্পার মা ইলা মজুমদারের লেখা বই ও বাপ্পার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, মোমের আলোয় সাজানো। প্যাসেজের আরেক দিকের দেয়ালে মজুমদার পরিবারের সাদা–কালো অতীত। যেখানে আছেন বাপ্পা মজুমদারের মা–বাবা শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী বারীণ মজুমদার ও ইলা মজুমদার, একাত্তরে হারিয়ে যাওয়া বাপ্পার বোনসহ পরিবারের আরও অনেকের ছবি। দেয়াল ছিদ্র না করে টাঙানোর জন্য ছবির ফ্রেমগুলোয় নকশা করা এক টুকরা কালো কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে। সেই সঙ্গে কালো জামদানি মোড়া ফ্রেমে সেট করা আয়না। এসব দেখতে দেখতে তবেই আপনি ঢুকবেন বসার ঘরে।

default-image

এদিকটার সব জিনিসই সাদা–কালো। সোফা, চেয়ার বা ডিভানে ঐতিহ্যবাহী নকশা, দেখতে অনেকটা পুরোনো দিনের আসবাবের মতো। কুশন কভারে সাদা–কালো নকশায় আছে অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিনের ছবি। এই ঘরে আরও দুটি জিনিসের দিকে সহজেই চোখ পড়বে। তুষার সাদা গ্র্যান্ডপা ঘড়ি ও কাচের বাক্সে রাখা একটা পুরোনো তানপুরা। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সেসব দেখার ফাঁকেই মেয়ে অগ্নিমিত্রা মজুমদারকে কোলে নিয়ে বসার ঘরে এলেন অভিনেত্রী তানিয়া হোসাইন। তানপুরার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘এটা আমার শাশুড়ি মায়ের তানপুরা। এটার আরেকটি বিশেষত্ব হচ্ছে—আপনাদের দাদা (বাপ্পা মজুমদার) এই তানপুরাতেই প্রথম সা লাগিয়েছিলেন।’

বসার ঘরের জানালায় যে পর্দা, সেটাতেও তানিয়ার ভাবনার ছাপ আছে। সাদা–কালো জামদানি শাড়ি কেটে বানানো হয়েছে এই পর্দা। সোফার ফাঁকে ফাঁকে একাধিক টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে অ্যান্টিক ভাস্কর্যের ওপর। মার্বেলের সেন্টার টেবিলের ওপর বসানো কাঠের দাবার কোর্ট। যার ওপর রাজা, উজির সৈন্যসামন্ত নিয়ে অপেক্ষা করছে।

বসার ঘরে আরও একটি বিশেষ জিনিস আছে। সেটা পিয়ানো। বাইরে থেকে ফিরে সেই পিয়ানোর সিটে বসলেন বাপ্পা মজুমদার। জানতে চাইলাম আপনার কাছে বাসা মানে কী? বাপ্পার উত্তরটা ঝটপট, ‘যেখানে শান্তি মেলে।’

বসার ঘর ছেড়ে এবার আমরা দুজনকে সঙ্গে নিয়ে হোম ট্যুরে বের হলাম। খাবার ঘরটি অনেক খোলামেলা। লম্বাটে টেবিলের দুই পাশে বেঞ্চ দিয়ে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জগের বদলে টেবিলে পানি খাওয়ার জন্য রাখা হয়েছে কাচের চার কোনা বোতল। পাশে একটা ছোট্ট আলমারিতে সাজানো ক্রোকারিজ। খাবার টেবিলের পেছন দিকে একটা আলাদা জোন। এখানে একটা বেসিন, পাশে ছোট্ট আকারের অনেকগুলো রুমাল আকারের তোয়ালে গোল করে পেঁচিয়ে রাখা। বেসিনের পাশের জানালায় ব্যবহার করা হয়েছে বাঁশের চিক। সেটা আবার কাপড়ে পটচিত্রের নকশা করে জুড়ে দেওয়া। কয়েকটি গাছ আর দুটি উঁচু টেবিল ল্যাম্প দিয়ে এখানে করা হয়েছে কফি কর্নার, অতিথি এলে যে জায়গাটা হয়ে যায় বুফে কর্নার। তানিয়া হোসাইন বলেন, ‘মাঝেমধ্যে বন্ধুরা বেড়াতে আসে। অনেক অতিথি একসঙ্গে এলে খাবার টেবিলে খাবার রাখা কঠিন হয়ে যায়। তাই এই কফি কর্নারের ক্যাবিনেটের ওপর সব খাবার সাজিয়ে দিই তখন। যে যার ইচ্ছেমতো এখান থেকে খাবার তুলে নিয়ে টেবিল ছাড়াও বসার ঘরে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আড্ডা দিতে দিতে খেতে পারে।’

default-image

খাবার ঘরের এক পাশে একটি বেডরুম, সেটা মেয়ের জন্য সাজিয়েছেন। অন্য দিকে আছে মেয়ের জন্য একটি আলাদা জায়গা। এই অংশের নাম দিয়েছেন তাঁরা ভ্যান গঘ জোন। এই জায়গায় বড় একটি কার্পেটে আছে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের আমন্ড ব্লুজম। এ ছাড়া গঘের পাঁচটি বিখ্যাত চিত্রকর্ম দিয়ে তৈরি কুশন কভার সাজিয়ে রাখা একটি সোফার ওপর। দেয়ালে আঁকিয়ে নিয়েছেন গঘের আরও একটি ছবি। এখানে বসেই ছোট্ট অগ্নিমিত্রা বইপত্র আর রং নিয়ে আঁকিবুঁকি করে। ভ্যান গঘ জোনের সামনের অংশে রাখা একটি আলমারি, বইয়ে ঠাসা। পাশে একটি রকিং চেয়ার। দেখেই বই খুলে রকিং চেয়ারে বসতে মন চাইবে।

এদিক থেকে একটু এগিয়ে গেলেই পাশাপাশি দুটি প্রশস্ত বেডরুম। একটিতে থাকেন বাপ্পা–তানিয়া, আরেকটি ঘরে বাপ্পা মজুমদারের কাজের জায়গা। বন্ধুরা এলে এই ঘরেই আড্ডা দেন।

আধুনিকায়নের নামে যেখানে পুরোনোকে বিদায় জানানোর চল, এ বাড়ির বাসিন্দারা সেখানে হেঁটেছেন উল্টো দিকে। পুরোনো গন্ধটাকেই ধরে রেখেছেন বাড়িময়। অথচ কী সুন্দর মানিয়ে গেছে এই সময়েও। কলকাতার বিখ্যাত অন্দরসজ্জাবিদ বিবি রায় একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘অন্দরসজ্জার ক্ষেত্রে আপনার ক্রিয়েটিভিটি, রুচি আর ফাংশনালিটির প্রশ্ন আসে। এই তিনটি স্তম্ভ যদি আপনি একসূত্রে বেঁধে ফেলতে পারেন, দেখবেন অন্দরসাজ পটীয়সীর খেতাব নিজ থেকেই আপনার সঙ্গে জুড়ে যাবে।’

বাপ্পা–তানিয়া দুজনই সাদা আর কালো রং ভালোবাসেন। আর সেই ভালোবাসার রং যদি ছড়িয়ে থাকে সবখানে, সেই বাসা তো রঙিন হবেই।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন