বাচ্চাদের সিটবেল্ট বাঁধার নিয়মটা একটু অন্য রকম। আমার বিশেষ ধারণা ছিল না। কেবিন ক্রু সাহায্য করলেন। প্লেন আস্তে আস্তে এগোনো শুরু করল, ঘোষণা এল, এখনই ফ্লাই করবে। প্লেনের উইন্ডো ভিউ থেকে অনেকেই সেলফি তুলছে, আমারও মনে হলো ছেলের সঙ্গে স্মৃতি রাখার এই তো সময়। ফোন বের করার জন্য পকেটে হাত দিলাম। কিন্তু একি! পকেটে তো ফোন নেই! অন্য পকেটে হাত দিয়ে দেখি দুই পকেটই খালি। কেবল ফোন না, ফোন, মানিব্যাগ কিছুই নেই! বুঝতে পারলাম কী ভুল করে ফেলেছি! তাড়াহুড়োয় স্ক্যানার থেকে শুধু ব্যাগ নিয়ে আর জুতা পরে চলে এসেছি। আমার সমস্ত মনোযোগ ছিল ছেলের দৌড়াদৌড়ির দিকে। খেয়ালই করিনি যে ফোন আর মানিব্যাগ কিছুই পকেটে তুলিনি। কী করব বুঝতে পারছিলাম না! প্লেন ততক্ষণে উড়তে শুরু করে দিয়েছে!  

এক ঘণ্টা পার হয়ে যায়, বসে আছি। এর মধ্যে দেখলাম ছেলের আবার ডায়াপার চেঞ্জ করা দরকার। ও অনেক পানি খায় আর কিছুক্ষণ পর পর...বুঝতেই পারছেন। এদিকে পুরো লাউঞ্জ যাত্রীতে ভরপুর। কোথায় চেঞ্জ করব, বুঝে উঠতে পারছি না। চিন্তাভাবনা করে পেছনের সিটে গিয়ে এক মুরব্বিকে অনুরোধ করলাম সামনের সিটে বসার জন্য। মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম কথা না শুনলে ধমক দেব, মায়েদের মতো। বাচ্চা কোলে নিয়ে কোনো উপায় না পেলে একটা সময় এরা রেগে যায়। যা-ই হোক ধমক দেওয়া লাগেনি, বুঝিয়েই ওঠানো গিয়েছিল।

কেবিন ক্রুকে ডেকে বললাম। সে জানাল প্লেন এখন অলরেডি ট্রাফিকের আন্ডারে। ঢাকার এয়ারপোর্টে না নামা পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনোভাবেই কোনো সহায়তা করতে পারছেন না। এ জন্য তিনি আন্তরিকভাবে দুঃখিত! রাগ করে বসে থাকলাম। কিন্তু লাভ কী! উপায় তো নেই। অপেক্ষা করছি কখন ফ্লাইট ঢাকায় পৌঁছাবে। তারপর কারও কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে বাসায় কল দিয়ে বলতে হবে।

হঠাৎ কেবিন ক্রু এসে বললেন, ‘আপনার সঙ্গে কি আর কেউ আছে?’ আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে বললাম, ‘না।’ আমার ছেলের গালে আদর করে তিনি বললেন, ‘সামনের পাশাপাশি দুটো সিট খালি আছে, আপনি চাইলে বাবুকে নিয়ে ওখানে বসতে পারেন।’ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সামনের সিটে গিয়ে বসলাম। তাতে করে যেটা হলো, আশপাশের দু-একজন বয়স্ক ভদ্রলোক খুব বিরক্ত হলেন। আমি অতিরিক্ত একটা আসন নিয়ে বসছি, এটা খুব একটা ভালো লাগল না সম্ভবত। এক ভদ্রলোক পাশেরজনকে বলছেন, ‘একা এতটুকু বাচ্চা নিয়ে কীভাবে জার্নি করছে? এর মা কই?’ অন্য ভদ্রলোক উত্তর দিচ্ছেন, ‘এরা আধুনিক যুগের বাবা-মা। বাচ্চাকে নিয়ে আধুনিক বাবা একা চলাফেরা করবে, এটাই তো স্বাধীনতা!’ এই টিপ্পনী শুনে মনে হলো, আমাদের দেশের মেয়েরা রাস্তাঘাটে যে কথাগুলো শোনে, আমরা ছেলেরা তা শুনি না। এটার কারণ হিসেবে আমরা একবাক্যে গলা মেলাই—‘পুরুষতান্ত্রিক সমাজ’! কিন্তু ওই দিন আমার ভুল ভাঙল। পুরুষতান্ত্রিক কারণ তো আছেই। তবে এ ছাড়া অন্যতম কারণ আসলে কিছু কাজ। যে কাজগুলো আমাদের সমাজে শুধু মেয়েরাই করে। তাই ওই সব বিষয়ে কেবল মেয়েরাই কথা শোনে। বিশ্বাস করেন, ছেলেরা ওই কাজগুলো করলে তারাও কথা শুনত। তাহলে শুধু বউ-শাশুড়ির ঝগড়া হতো না। জামাই আর শ্বশুরের ঝগড়া নিয়েই জি-বাংলায় একাধিক মেগা সিরিয়াল হতো।

ফিডারে দুধ বানিয়ে ছেলেকে খাওয়ালাম, দুধের ফিডার শেষ করে পানির ফিডার নিল। এরপর ছেলের মনে হলো, প্লেনের ভেতর হেঁটে বেড়াতে হবে। আমার আঙুল ধরে সে সিট থেকে আমাকে তুলে নিয়ে এল। কী আর করা, বাধ্য হয়ে ছেলেকে নিয়ে প্লেনের মধ্যে ১০–১৫ মিনিট হেঁটে বেড়ালাম। সব যাত্রী অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে। ভাবটা এমন, ‘এমন ঘটনা তো আগে দেখিনি!’ দুধ খাওয়া শেষ করেই আমার ছেলের মনে হলো, ‘পটি’ করবে। সবকিছুর জন্য প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু এই কাজের জন্য না, বেশ অস্বস্তি লাগল। বুদ্ধি করে প্রথমে পারফিউম বের করলাম, চারপাশে হালকা করে একটু স্প্রে করলাম যেন কেউ টের না পায়। তারপর বাচ্চার ডায়াপার, ওয়েট টিস্যু এগুলো নিয়ে রেডি হয়ে, প্লেনের সিটে বসেই ক্লিন করে ফেললাম। সে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা! পলিথিনে মুড়িয়ে ডায়াপার এক পাশে রেখে দিলাম।

একসময় প্লেন চলে এল ঢাকা এয়ারপোর্টে। রেডি হয়ে নেমে পড়লাম। মোবাইলের বিষয়টা এয়ারপোর্ট অফিসকে জানাতে বললেন কেবিন ক্রু। ওদের অফিশিয়ালি জানালাম। আমাকে বলল, এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। পরের ফ্লাইটে নিয়ে আসবে। বাবুকে নিয়ে উখিয়া থেকে এতটা পথ আসার পর এয়ারপোর্টে এক ঘণ্টা বসে থাকার ধৈর্য ছিল না। তারপরও থাকলাম। হাতব্যাগে কিছু টাকা ছিল। লাউঞ্জের ভেতরের দোকান থেকে কিছু খাবার কিনলাম, ব্যাগে ছেলের খাবার ছিল, ওকে খাওয়ালাম।

একজন যাত্রীকে অনুরোধ করে আম্মাকে কল দিলাম, আমার স্ত্রীকে জানাতে বললাম। আমার স্ত্রীর বাবা বিমান বাংলাদেশে ছিলেন, এখন অবসরে। তিনি কক্সবাজার এয়ারপোর্ট সিকিউরিটিতে কল করে বলে দিলেন যে ফোন আর মানিব্যাগ কোনোভাবেই এটা যেন হাতছাড়া না হয়। এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি নাকি আমার মানিব্যাগ আর মোবাইল আনতে দেয়নি! এক ঘণ্টা এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করে শুনতে পেলাম এই কাহিনি। বুঝলাম প্রয়োজনের তুলনায় সিকিউরিটি বেশি হয়ে গেছে! উবার ডেকে বাসার উদ্দেশে রওনা হলাম। পরে কক্সবাজারে আমার এক কলিগ আমার ফোন আর মানিব্যাগ সংগ্রহ করে রেখেছিলেন। জিনিসগুলো অক্ষত অবস্থায় ফেরত পেয়েছিলাম। এই ছিল বাবা হিসেবে আমার সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার অভিজ্ঞতা।

লেখার উদ্দেশ্য, একটু ইচ্ছে আর আত্মবিশ্বাস থাকলে আমাদের দেশের বাবারাও মায়েদের সঙ্গে বাচ্চার দেখাশোনা করতে পারেন। এটা বাবা–মায়ের উভয়েরই সমান দায়িত্ব। ছেলেকে গোসল করানো, খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো, বাথরুম করানো—এই চারটাই মূল কাজ। এর বাইরে আপনি বাচ্চাকে সময় দেবেন। তার সঙ্গে খেলবেন। কথা বলা শেখাবেন। এই সময়গুলোতে যখন আপনার বাচ্চা আপনাকেও খুঁজবে, বাবা বাবা বলে ডাক পড়বে, এটাই তো পিতৃত্বের স্বাদ।  

আমি পিতৃত্বকালিন ছুটির পুরো সময়টা বাচ্চাকে নিয়ে ছিলাম। ওই ১০ দিন আমার ফোন কোথায় ছিল, বলতে পারব না। আমার স্ত্রী সন্তান জন্ম দেওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। যতটুকু সম্ভব, মায়ের মতো ছেলের যত্ন নেওয়ার চেষ্টা করেছি। এতে করে আমার কিছু বিশেষ উপলব্ধি হয়েছিল। সেবার আমি বুঝে গিয়েছিলাম, আমার স্ত্রীর কীভাবে ২৪ ঘণ্টা সময় বাসায় ‘শুয়ে-বসে’ কেটে যায়। ফোন দেবে বলে দুই ঘণ্টা পরও কেন ফোন ব্যাক করে না। একদিন বাচ্চাকে নিয়ে ঘরে থাকলেই এই উত্তরগুলো আপনার সামনে পরিষ্কার হয়ে যাবে। সমানভাবে বাচ্চার লালন–পালন করায় অংশগ্রহণ করাটা পারিবারিক ভারসাম্য বজার রাখার জন্য খুবই জরুরি।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন