নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি: প্রদর্শনী থেকে শুরু করে সংগীতসন্ধ্যা

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাউথ একাডেমিক ভবনের (স্যাক) ৯ তলার স্থাপত্য বিভাগে পা রাখতেই চোখে পড়বে উঁচু ছাদের বিশাল ঘরটাতে চলছে প্রদর্শনী। ‘ফার্স্ট স্টেপ টুওয়ার্ড আর্কিটেকচার’ শিরোনামে এই প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে স্থাপত্য বিভাগে নাম লেখানো নবীনদের নানা রকম কাজ। মূলত নবীনদের উৎসাহ দিতেই নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগ এই আয়োজন করে। শিল্পকর্মগুলো নিয়ে দিনব্যাপী চলতে থাকে আলোচনা, মতবিনিময়।

নবীনদের বরণ করে নেওয়ার পরপরই এই প্রদর্শনী আয়োজন করে স্থাপত্য বিভাগ। এ ছাড়া বিখ্যাত স্থপতিদের কাজ নিয়ে সেমিনার কিংবা কর্মশালার আয়োজন করে ‘কথন’, স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থীদেরই সংগঠন। যেমন এর আগে ‘দ্য ল্যাংগুয়েজ অব ডেল্টা’ কিংবা ‘মাজহারুল ইসলাম রিভিজিটেড’ শিরোনামে তাঁরা প্রদর্শনী ও লেকচারের আয়োজন করেছেন।

default-image

এরপরই বলতে হয় ‘ধ্রুপদ’-এর কথা, স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের আরও একটি সংগঠন। বিভাগের গানের আসর আয়োজনের দায়িত্বে থাকে এই ক্লাব। সবাই মিলে নামিয়ে ফেলেন দারুণ এক সংগীতসন্ধ্যা।

প্রিলি, অ্যাসাইনমেন্ট জমা, জুরির ফাঁকে ফাঁকে বেশ কিছু ভ্রমণেরও আয়োজন করে স্থাপত্য বিভাগ। ভ্রমণের গন্তব্য কখনো স্থপতি লুই আই কানের তৈরি জাতীয় সংসদ ভবন, কখনো স্থপতি মেরিনা তাবাসসুমের তৈরি বায়তুর রউফ মসজিদ, কিংবা স্থপতি সাইফ উল হকের তৈরি আর্কেডিয়া স্টুডেন্ট প্রজেক্ট।

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগটি অন্য সব বিভাগের চেয়ে আলাদা। কেবল এই বিভাগের ছাদটাই দ্বিতল সমান উঁচু (ডবল হাইট স্পেস)। এটি স্থাপত্য বিভাগের প্রাণের জায়গা। এখানে হাসি, হইহল্লা, গান থেকে শুরু করে ব্যাডমিন্টন খেলাও হয় কখনো কখনো।

ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক: একেক ব্যাচ, একেক দায়িত্ব

নিজেদের ক্লাস, স্টুডিও, ল্যাব, সেশনালের বাইরেও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্থাপত্য বিভাগের প্রত্যেক ব্যাচের কাঁধেই থাকে আলাদা কিছু দায়িত্ব। নবীনদের, অর্থাৎ ব্যাচ ১.১ যারা, তাদের অবশ্য সরাসরি কোনো কাজ দেওয়া হয় না। কিন্তু প্রত্যেক আয়োজনে অংশগ্রহণ করতে হয় অবশ্যই।

এই যেমন ব্যাচ ১.২, অর্থাৎ প্রথম বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারে পড়ুয়াদের দায়িত্ব হলো মুভি ক্লাব পরিচালনা। সপ্তাহের একটা দিন বিভাগের জুরি স্পেসে চলচ্চিত্র দেখানো হয়। সেই সিনেমার টিকিট তৈরি, পোস্টার বানানো, সেই পোস্টার সারা ক্যাম্পাসে সাঁটানো, সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবস্থা করা—সব দায়িত্ব এই ব্যাচের।

default-image

এদিকে সেমিস্টারের শুরুতেই ব্যাচ ২.১–এর কর্মযজ্ঞ শুরু হয়ে যায়। নবীনবরণ ও প্রবীণবিদায়—দুটি গুরুদায়িত্ব এই ব্যাচের কাঁধে। দুটো আয়োজন একসঙ্গেই করেন ইউএপির এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা। অ্যালামনাইরাও উপস্থিত থাকেন। কাজের তো শেষ নেই। দাওয়াতপত্রের নকশা করা, সব ব্যাচের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাওয়াত দেওয়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মঞ্চ বানানো, নবীন-প্রবীণদের উপহার দেওয়া, কত কী! এই কাজে ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একটু এদিক-ওদিক হলেই ‘কমিটি ভুয়া’ বলে রব উঠে যায়।

ওদিকে ব্যাচ ২.২ ছুটতে থাকে অনুমতিপত্র নিয়ে। কারণ, প্রতি সেমিস্টারে তাঁরাই সংসদ ভবন ভ্রমণের আয়োজন করে। অনুমতিপত্র এল কি না, দিন ঠিক হলো কি না, পোস্টারের নকশা হলো কি না—সবকিছুই দেখার দায়িত্ব তাঁদের।

আর ব্যাচ ৩.১? আইপিএল, বিপিএলের মতো করেই এপিএল আয়োজন করেন তাঁরা। আর্কিটেকচার প্রিমিয়ার লিগ। দল গঠন, খেলার সূচি ঠিক করা, ভেন্যু নির্ধারণ থেকে ক্রিকেট ব্যাটটা ঠিকঠাক আছে কি না—সব নিশ্চিত করে তারা। ওদিকে খাবারদাবারের আয়োজনে থাকে ব্যাচ ৩.২।

এত এত কাজের মধ্যেও কিন্তু চলে প্রজেক্ট, ল্যাব, পরীক্ষা। প্রতি সেমিস্টারেই যে ডিজাইন প্রজেক্ট জুরিতে প্রশংসা কুড়ায়, সেগুলো নিয়ে হয় প্রদর্শনী। ‘ওপেন ডে’ নামের এই আয়োজনে শুধু যে প্রকল্প প্রদর্শন হয়, তা নয়, থাকে আয়োজক ব্যাচের ইনস্টলেশন, সেমিনার, আড্ডাসহ নানা কিছু। এই আয়োজনের মূল দায়িত্বে থাকে ব্যাচ ৪.১।

বিভাগের বিভিন্ন ভ্রমণ, ফটোওয়াক ইত্যাদি আয়োজন করে ব্যাচ ৪.২। ইউএপির স্থাপত্য বিভাগের আর্কিটেকচার স্টুডেন্টস ফটোগ্রাফি ক্লাব নামে একটি সংগঠনও আছে।

বিভাগের শিক্ষক এবং সিনিয়র শিক্ষার্থীরা ‘বৈঠক’ নামের একটি অনলাইন আড্ডারও আয়োজন করেন। ইন্টার্নি কোথায় করব, কোন কোন দেশে বৃত্তির সুযোগ আছে, কী করে পোর্টফোলিও বানাব—এমন নানা জটিল প্রশ্নের সহজ উত্তর মিলে যায় এই বৈঠকে। এভাবেই স্থাপত্যের কঠিন পড়ালেখার পাশাপাশি আনন্দ–উচ্ছ্বাসে কেটে যায় ইউএপির স্থাপত্যের শিক্ষার্থীদের দিন।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়: ক্যাম্পাসের গণ্ডি পেরিয়ে...

সিলেট শহরের পয়লা বৈশাখ মানেই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) ৩২০ একরের ক্যাম্পাস। যেখানে আলপনা উৎসব, পুতুলনাচ, পটচিত্র, গ্লাস পেইন্ট প্রদর্শনী, রিকশাযাত্রা, বাউলগান, মোরগলড়াই, সাপের খেলাসহ চলে নানা কর্মসূচি। আর এই পুরো আয়োজনের আয়োজক হলো শাবিপ্রবির স্থাপত্য বিভাগ। ‘স্থাপত্যের বৈশাখ’ যেন শাবিপ্রবির ক্যাম্পাস পেরিয়ে পুরো সিলেট শহরের উৎসব। ক্যাম্পাসের ‘ই’ ভবনের সামনে তৈরি করা মাসকট নিয়েই হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা।

default-image

স্থাপত্যের ৫ বর্ষে ৫টি ব্যাচ। ১০টি স্টুডিওর পরেও এখানে রয়েছে ‘স্টুডিও ইলেভেন’ নামের একটি ভিন্নধর্মী স্টুডিও। যেখানে অগ্রজদের থেকে জানা যায় নানা অজানা বিষয়। যেমন কোথায় কোন প্রকল্পটা ভালো হচ্ছে, বিদেশে পড়াশোনার জন্য বৃত্তি কী করে পাওয়া যায়, আবার কোনো স্থাপত্য প্রতিযোগিতায় নিজেদের কেউ পুরস্কার জিতে আনলে তা নিয়ে প্রেজেন্টেশনও থাকে। কিংবা নিছকই এক কাপ চায়ের আড্ডা আর সঙ্গে গিটারের টুং টাং—এসব স্টুডিও ইলেভেনের চেনা চিত্র।

প্রতিটি স্টুডিওর ডিজাইন প্রজেক্ট যাদের ভালো হয়, তাদের প্রজেক্ট নিয়ে এক্সিবিশন হয় ‘ডি-এক্সপো’তে। সেরা প্রজেক্টটিকে পুরস্কার দেওয়া ছাড়াও এই আয়োজনে থাকে বিখ্যাত স্থপতিদের বক্তব্য, সেমিনার ও কর্মশালা। মূলত শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতেই আয়োজন করা হয় এই উৎসব।

শুধু যে ডিজাইন, প্রকল্প, ক্লাস আর ল্যাব নিয়েই ব্যস্ততা, তা কিন্তু নয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য থাকে নানা ভ্রমণায়োজন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য ঘুরে দেখেন শিক্ষার্থীরা। কখনো আবার ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্থাপত্য বিভাগও ঘুরে দেখেন তাঁরা।

শাবিপ্রবির স্থাপত্য বিভাগ এবং ইউরোপের বার্মিংহাম সিটি স্কুল অব আর্কিটেকচারের যৌথ উদ্যোগে শুরু হয়েছে ‘ইন্টারন্যাশনাল কোলাবোরেশন স্টুডিও প্রজেক্ট’। যেখানে ‘কো-ল্যাবে’ অংশ নেয় বার্মিংহামের ১৭ ও শাবিপ্রবির ১৮ শিক্ষার্থী। প্রায় তিন মাস ধরে চলা স্টুডিওটি অনলাইন ও অফলাইন যৌথ মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ইতিমধ্যেই দুটি সফল স্টুডিও সম্পন্ন করেছে শাবিপ্রবি আর বার্মিংহাম। এ যেন বিশ্বের দুই প্রান্তের স্থাপত্যের শিক্ষার্থীদের মেলবন্ধন। যেখানে বাংলাদেশের হবিগঞ্জের একটি গ্রামের নানা সমস্যার সমাধানে যৌথভাবে তৈরি করা হয়েছে একটি মাস্টারপ্ল্যান।

এ ছাড়া যেকোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের ছায়া হয়ে থাকেন শিক্ষকেরা। নিয়মিত ক্লাস, স্টুডিওর বাইরেও উৎসাহ দিয়ে যান তাঁরা।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন