হারিয়ে যাবে কলোসিয়াম, স্ট্যাচু অব লিবার্টি!

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরের কোলে হাডসন নদীতে স্ট্যাচু অব লিবার্টি।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরের কোলে হাডসন নদীতে স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

প্রকৃতির দুর্মর শক্তি আর আবহাওয়া কী ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে প্রাচীন সভ্যতাগুলো সে কথা বহু আগেই লিখেছিল। প্রাচীন মিশরে প্রচণ্ড তাপ দাহের ভয়াল বিপর্যয়, প্রাচীন গ্রিসে প্রলয়ংকরী টাইফুনে সবকিছু গ্রাস করে নেওয়ার লোমহর্ষক বর্ণনা ইতিহাসেই লিপিবদ্ধ আছে। কিন্তু সভ্যতার এই আধুনিক যুগে এসেও কি কালের অতল গহ্বরে একদিন হারিয়ে যেতে পারে প্রাচীন মিশরের সিংহ মূর্তি, রোমের কলোসিয়াম বা মাত্র সোয়া শতাব্দী পেরোনো স্ট্যাচু অব লিবার্টি!

হাজার হাজার বছরের পরিক্রমায় প্রকৃতির করাল গ্রাসে যেমন তেমনি বর্বরতাতেই মানুষ তার অনেক কীর্তিই ধ্বংস করেছে। তবুও প্রাচীন মানুষদের কীর্তির অল্প কিছু স্মারক এখনও টিকে আছে। বিস্ময়কর সৌন্দর্য নিয়ে সেই সব অপরূপ স্থাপত্য ভাস্কর্য দুনিয়াজুড়েই পর্যটকদের তীর্থ। কিন্তু ধীরে ধীরে হলেও চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া এইসব মনুষ্য কীর্তিকে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করে দিচ্ছে। বিশ্বজুড়ে এমন কিছু সেরা স্থাপত্য-ভাস্কর্য জলবায়ুর অভিঘাত সয়ে কালের পরিক্রমায় টিকে থাকবে কি না তা নিয়ে লিখেছেন বৈশ্বিক আবহাওয়ার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ আবহাওয়াবিদ জিম এন্ড্রুস। দ্য হাফিংটন পোস্ট এ খবর দিয়েছে।

দ্য স্ট্যাচু অব লিবার্টি

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরের কোলে হাডসন নদীতে দাঁড়িয়ে থাকা স্ট্যাচু অব লিবার্টিকে আধুনিক বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়কর স্থাপত্য হিসেবে যেমন বিবেচনা করা হয় তেমনি তা সারা দুনিয়ার পর্যটকদেরও তীর্থ। মার্কিনদের সঙ্গে ফরাসিদের মৈত্রীর স্বীকৃতি দিতে ফ্রান্সের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া উপহার এটা। এ স্থাপত্যটি জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল ১৮৮৬ সালে।

ঝড়ঝঞ্ঝা আর বৃষ্টিতে পুরোটাই তামায় তৈরি করা এই বিশালাকৃতির মূর্তির উপরিভাগের ব্রোঞ্জের প্রলেপ শতবর্ষেই সবুজাভ হয়ে গেছে। আবহাওয়াবিদ এন্ড্রুস বলছেন, অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে তামায় কার্বন জমা হয়। স্বাভাবিক বৃষ্টির পানিও তামার সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে। এভাবে জল এবং ধাতুর রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এই সবুজাভ রঙের সৃষ্টি হয়েছে। আর বাতাস এই ক্ষয়ের গতিকে ত্বরান্বিত করে।

১৯৩৭ সালে প্রথমবারের মতো স্ট্যাচু অব লিবার্টির বড় ধরনের সংস্কার কাজ করা হয় আবহাওয়াজনিত ক্ষয় থেকে একে রক্ষা করার জন্য। এর ভেতরে পানি চুঁইয়ে পড়া এবং অন্যান্য ক্ষতি ঠেকানো হয়েছিল তখন। তবে কালের পরিক্রমায় এই ধাতব স্থাপত্যটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

রোম নগরে প্রায় দুই হাজার হাজার বছরের পুরনো কলোসিয়াম। ছবি: উইকিপিডিয়া।
রোম নগরে প্রায় দুই হাজার হাজার বছরের পুরনো কলোসিয়াম। ছবি: উইকিপিডিয়া।

দ্য কলোসিয়াম     
গ্ল্যাডিয়েটরদের যুদ্ধ আর রোমান সাম্রাজ্যে টিকে থাকার লড়াইয়ের প্রতীকে পরিণত হওয়া কলোসিয়ামের নিজের অস্তিত্ব নিয়েই শঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রোমে ৭০-৮০ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল এই বিশাল মঞ্চ আবহাওয়াজনিত সংকটে পড়তে পারে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদ জিম এন্ড্রুস।

তিনি জানিয়েছেন, ‘হিমশীতল ঠান্ডা আর তুষারপাত রোমে নিয়মিত ঘটনা। সেখানে তুষারপাত হয় এবং যদি দিনের বেলায় তা পাথরের গায়ে লেগে থাকে আর হিমাঙ্কের ওপরের তাপমাত্রায় তা গলে যেতে পারে। আর এভাবে পানি চুঁইয়ে পড়া অবস্থায় রাতে হিমশীতল বাতাস বসে যেতে থাকলে পাথরগুলো ফেটে যেতে থাকবে।’

পাশাপাশি প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো এই স্থাপত্যের ভেতরে ঢুকে পড়া পানিও চিন্তার বড় একটা কারণ বলে মনে করেন এই আবহাওয়াবিদ। তিনি জানান, এভাবে বরফ জমা আর তা গলে যাওয়ার চক্রে পড়তে পড়তে কলোসিয়ামের ক্ষয় বেড়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

প্রাচীন মিশরের গিজায় বিশালাকার সিংহ মূর্তি দ্য স্ফিংস।
প্রাচীন মিশরের গিজায় বিশালাকার সিংহ মূর্তি দ্য স্ফিংস।

দ্য স্ফিংস  
প্রাচীন মিশরীয় সাম্রাজ্যের ‘ওল্ড কিংডম’ বা ‘পুরোনো রাজ্যে’র আমলে নির্মিত বিশালাকার সিংহ মূর্তি দ্য স্ফিংস। ২৬৮৬ থেকে ২১৩৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে গিজায় বিস্ময়কর এই মূর্তিটি বানিয়েছিল মিশরীয়রা। পূর্বদিকে ঢালু গিজার এই মালভূমিতে বৃষ্টির পানি জমে জমে মূর্তিটির পশ্চিমপাশ দিয়ে একটা পানিপ্রবাহের জায়গা তৈরি হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এই পানি প্রবাহে চুনাপাথরের ক্ষয় ঘটছে। পাশাপাশি ভূতলের লবণাক্ত পানিও এই বিশাল পাথর মূর্তির জন্য ক্ষতিকর।

তবে, জলধারার এই ক্ষয়ই স্ফিংসের জন্য একমাত্র হুমকি নয়। আবহাওয়াবিদ এন্ড্রুস জানান, ‘বিশাল মরুভূমিতে প্রচণ্ড সব মরুঝড়ের কবলে পড়ে এটা। প্রবল বেগের বাতাসের সঙ্গে এর গায়ে এসে আছড়ে পড়ে বালি। আর ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র এই বালু কণার প্রচণ্ড গতিতে আছড়ে পড়াটা হাতে একটা ছেনি নিয়ে এর গায়ে আঘাত করার মতোই।’

যাই হোক, প্রাকৃতিক ক্ষয় এবং ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবকে ছাপিয়ে মানুষের এইসব কীর্তি এখনও টিকে আছে। এ তিনটি ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য যেসব স্থাপনার কথা এন্ড্রুস বলেছেন, তার মধ্যে রয়েছে গ্রিসের ‘এপিকিউরিয়ান অ্যাপোলোর মন্দির’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির ‘দ্য ইউলিসেস সেইন্ট গ্রান্ট মেমোরিয়াল’। এইসব স্থাপনাকে চিরকালের বলে ধরে নেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না বলে সতর্ক করেছেন এই আবহাওয়াবিদ।