চাপ, দুশ্চিন্তা, হতাশা দূর করতে কাজে লাগান ‘লেট দেম থিওরি’
মেল রবিনস একজন মার্কিন লেখক। দ্য লেট দেম থিওরি নামে তাঁর একটি বিখ্যাত বই আছে। এই বই কিংবা থিওরি (তত্ত্ব) এতই জনপ্রিয়তা পেয়েছে যে পশ্চিমা বিশ্বে অনেকেই হাতে ট্যাটু করে লিখে রাখছেন—‘লেট দেম’। কী আছে এই তত্ত্বে? জয় শেঠি পডকাস্টে এই তত্ত্ব নিয়েই কথা বলেছেন মেল। পড়ুন তাঁর নির্বাচিত কথামালা।
আপনি হয়তো আমার লেট দেম থিওরি অনলাইনে দেখেছেন। যদি না দেখে থাকেন, বলি। এটা মূলত একটা মানসিক কৌশল। যা মুহূর্তের মধ্যে আপনাকে বুঝতে সাহায্য করবে, কোন জিনিস আপনার নিয়ন্ত্রণে আছে, আর কোনটা নেই। যা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আপনার নেই, আদতে তা নিয়ন্ত্রণে আসবেও না। কেবল চাপ, দুশ্চিন্তা আর হতাশা তৈরি করবে।
এসব ক্ষেত্রেই ব্যবহার করতে পারেন ‘লেট দেম থিওরি’।
‘লেট দেম থিওরি’ কী
ধরা যাক কোনো গ্রাহক আপনার সঙ্গে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করল, আপনি বড় কোনো ক্লায়েন্ট হারালেন, কোনো সুযোগ থেকে আপনাকে বাদ দেওয়া হলো, অথবা মিটিংয়ে আপনার আইডিয়া কেউ পাত্তাই দিল না। যেই মুহূর্তে নিজের ভেতরে চাপ অনুভব করবেন, মনে মনে শুধু বলবেন—লেট দেম (করতে দাও)।
বসের মেজাজ খারাপ—থাকুক। সহকর্মী সব কৃতিত্ব নিজেই নিতে চায়—নিক। গ্রাহক খারাপ আচরণ করছে—করুক।
শুনে মনে হতে পারে আপনি যেন দুর্বল হয়ে যাচ্ছেন। বা চুপচাপ সব মেনে নিচ্ছেন। আদতে বিষয়টা পুরো উল্টো। যখন নিজেকে মনে মনে বলছেন, ‘করতে দাও’, তখন আপনি স্বীকার করছেন—যা ঘটেছে, তা ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে। এখন একে আর নিজের মানসিক অশান্তির কারণ বানানোর কোনো মানে নেই।
ধরা যাক, বসের মেজাজ খারাপ দেখে আপনি নার্ভাস হয়ে গেলেন। এর মানে বসকে আপনি এমন ক্ষমতা দিয়ে দিলেন, যা তাঁর পাওয়ার কথা না। কারও রূঢ় আচরণে যদি খারাপ লাগে, আপনাকে অস্থির করে তোলে—তার মানে আপনি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছেন।
কিন্তু যদি মনে মনে বলেন, ‘করতে দাও’, তখন একটা মজার ব্যাপার ঘটে।
প্রথমত, আপনি মানসিকভাবে দূরে সরে যান। দ্বিতীয়ত, আপনি নিজের ভেতরে একধরনের উচ্চতর অবস্থান অনুভব করেন। এটা ‘লেট ইট গো’ (বাদ দাও) বলার মতো নয়। কেউ যদি বলে, ‘মেল, এটা অন্যায় হয়েছে ঠিক। কিন্তু থাক, বাদ দাও।’ তখন মনে হতো আমি হেরে গেলাম। যেন আমাকে পরাজয় মেনে নিতে বলা হচ্ছে। কিন্তু ‘লেট দেম’ বলার অনুভূতি আলাদা। তখন মনে হয়, ‘আমি বুঝতে পারছি বসের এখন মেজাজ ঠিক নেই। ঠিক আছে, আমি নাহয় তাঁকে একটু মেজাজ দেখাতে দিলাম।’ এভাবেই আমি পরিস্থিতির ওপরে উঠে যাই। সত্যি বলতে, একটু বিচারকসুলভ অনুভূতিও আসে। কারণ, আপনি মনে মনে বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি কী হচ্ছে। আমি এটা ঘটতে দিচ্ছি। কিন্তু আমার নিয়ন্ত্রণ ওর হাতে ছেড়ে দিচ্ছি না।’
এবার আমার পালা
‘লেট দেম’–এর পর একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ আছে। সেটা হলো—লেট মি (এবার আমি)।
কিছু মানুষ শান্ত হতে চায় না। তারা শুধু নিজেকে ঠিক প্রমাণ করতে চায়, রাগ ঝাড়তে চায়। আপনি যখন ওকে ওর মতো থাকতে দিলেন, তখনই একটা মানসিক সীমারেখা তৈরি করে ফেললেন। ‘তুমি রাগ করছ করো, কিন্তু তোমার রাগ আমাকে প্রভাবিত করবে না।’
এরপর মনে মনে বলুন, ‘এবার আমি।’ মনে রাখবেন, তিনটি জিনিস আপনার নিয়ন্ত্রণে আছে—
১. এখন আপনি কী ভাববেন।
২. আপনি কী করবেন বা করবেন না (অনেক সময় কিছু না করাই সবচেয়ে শক্তিশালী সিদ্ধান্ত)।
৩. নিজের আবেগ কীভাবে সামলাবেন।
এই তিনটি জিনিস সব সময় আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকে। যখন মনে মনে বলবেন, ‘এই পরিস্থিতিতে কী প্রতিক্রিয়া দেখাব, সেই দায়িত্ব আমি নিচ্ছি’, তখন মনে রাখবেন, রেসপন্সিবিলিটি (দায়িত্বজ্ঞান) শব্দের মানেই হলো ‘রেসপন্ড’ করার ‘অ্যাবিলিটি’ (সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা)। তাহলেই আপনি বুঝবেন—আমি কী ভাবব, সেটা আমি ঠিক করব। আমার আচরণ আমার নিয়ন্ত্রণে। আমার আবেগকে শান্তভাবে উঠতে-নামতে দেব, স্থির থাকব।
দুটি প্রশ্ন
১. আমরা কেন এমন জিনিস নিয়ে ব্যস্ত থাকি, যেগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই?
২. আমরা এত সহজে বিভ্রান্ত হয়ে যাই কেন?
দুটি বিষয় একটি আরেকটির সঙ্গে যুক্ত। মানুষের মস্তিষ্কের গঠনই এমন যে আমরা সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাই। কারণ, নিয়ন্ত্রণে থাকলে নিরাপদ বোধ হয়। আমি চাই আমার চিন্তা, সিদ্ধান্ত, পরিবেশ, ভবিষ্যৎ—সব আমার নিয়ন্ত্রণে থাকুক। আপনিও তা–ই চান।
কিন্তু সমস্যা হলো, যখন আপনার কোনো আচরণ আমাকে বিরক্ত বা উদ্বিগ্ন করে, তখন আমি নিরাপদ বোধ করি না। তখন আপনাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চাই, যাতে আমি ভালো বোধ করি। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়াটা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু আমি যখন আমার সীমা পেরিয়ে আরেকজনকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চাই, তখনই বাধে বিপত্তি। যেমন:
‘তোমার আরও স্বাস্থ্যসচেতন হওয়া উচিত।’
‘তুমি কেন আরও উদ্যমী হচ্ছ না?’
‘বস যদি মিটিংয়ে একটু কম কথা বলত!’
এই সবই আসলে এমন কিছু নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, যা নিয়ন্ত্রণযোগ্য নয়। আমরা এটা করি, কারণ আমাদের মস্তিষ্ক এমনভাবেই তৈরি।
কেন আমরা এত বিভ্রান্ত থাকি? কারণ, আপনি যদি চারপাশের মানুষ ও পরিস্থিতিকে আপনার শক্তি শুষে নিতে দেন, তাহলে তুচ্ছ ও অর্থহীন বিষয় খুব সহজেই আপনার মন দখল করে নেয়। ‘লেট দেম থিওরি’ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আমি বুঝেছি, এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এর মাধ্যমে আপনি আপনার সময় ও শক্তি ফিরে পান। আপনি বুঝতেই পারছেন না, অন্য মানুষের আচরণ বা তাঁর প্রতি আপনার অযাচিত প্রত্যাশার কারণে প্রতিদিন কত সময় ও শক্তি নষ্ট হচ্ছে।
কেন আপনার এত ক্লান্ত লাগে?
কেন সবকিছুতে চাপ অনুভত হয়?
কেন নিজের জন্য সময় নেই?
কারণ, আপনি অন্য মানুষের মতামত, আবেগ, অপরিণত আচরণ—এসবকে নিজের ওপরে স্থান দিচ্ছেন। অথচ দুঃখের বিষয় হলো, অন্য মানুষই হওয়ার কথা আপনার সুখ, সংযোগ আর অনুপ্রেরণার বড় উৎস।
যা আপনার নিয়ন্ত্রণে আছে, সেদিকে মন দিন। যে যেমন আছে, তাকে তার মতো থাকতে দিন। সবাই আপনার প্রত্যাশামতো কাজ করবে, এই চাপ নেবেন না। আপনির বরং নিজের প্রতিক্রিয়ার দায়িত্বটুকুই নিজের হাতে নিন। ধীরে ধীরে পরিবর্তনটা টের পাবেন।
ইংরেজি থেকে অনূদিত