তরুণ ভোটাররা কী কী দেখে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, কী বলছেন তাঁরা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের নির্বাচনের ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখবেন তরুণ ভোটাররা। অনলাইনে, অফলাইনে নির্বাচন নিয়ে আড্ডা, তর্ক, আলোচনায় যেমন তরুণেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিচ্ছেন, তেমনি প্রার্থী হয়েও লড়ছেন বেশ কয়েকজন তরুণ রাজনীতিবিদ। আর যাঁরা প্রথমবার ভোট দেবেন, এবারের নির্বাচন নিয়ে তাঁদের মনেই–বা কী চলছে? বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন ফুয়াদ পাবলো ও মো. সাইফুল্লাহ
প্রথম ভোটের রোমাঞ্চ
ভোট নিয়ে প্রত্যেক তরুণের মধ্যেই রোমাঞ্চ। কেননা, যে নির্বাচন এত দিন ‘বড়দের বিষয়’ ছিল, এবার তাঁরা নিজেরাও সেটির অংশ। তা ছাড়া ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন। অভ্যুত্থানে যেহেতু তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণই ছিল বেশি, তাই এবারের নির্বাচনের দিকে নজর রাখছেন তাঁরা। প্রায় সবার বক্তব্যেই একটি শব্দ উঠে এল—দায়িত্ববোধ। ভোটকে তাঁরা শুধু নিজের মতপ্রকাশের সুযোগ নয়; বরং নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন। এ কারণেই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে ভেবেচিন্তে, সব দিক বিবেচনা করে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী অর্পা বড়ুয়া বলেন, ‘ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা আমার জন্য নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্যই কিছু শঙ্কা আছে, বিশেষ করে নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে। তবু এটি আমার জন্য এক রোমাঞ্চকর মুহূর্ত, একটি দায়িত্ববোধের সঙ্গে নিজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার সুযোগ। প্রথমবার ভোট দেওয়ার এই অনুভূতি অন্য যেকোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার চেয়ে আলাদা।’
তরুণেরা বলছেন, এখন পর্যন্ত ভোটের পরিবেশ তাঁদের কাছে ইতিবাচক। ফলাফল যা-ই হোক, এবারের নির্বাচন সুষ্ঠু ও হানাহানিমুক্ত হবে—এই আশাবাদ ব্যক্ত করলেন সবাই।
সিদ্ধান্তের হিসাবনিকাশ
যে ২০ তরুণের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি, তাঁদের মধ্যে ৮ জন জানালেন, কাকে ভোট দেবেন, সেই সিদ্ধান্ত তাঁরা নিয়ে ফেলেছেন। বাকি ১২ জন এখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছেন। নিজ এলাকার প্রার্থী ও দলগুলোর অবস্থান বোঝার চেষ্টা করছেন তাঁরা।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র মাহবুবুল হাসান যেমন জানান, কাকে ভোট দেবেন, এ নিয়ে তাঁর মধ্যে কোনো দ্বিধা নেই। রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার সঙ্গে মিলিয়েই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উসমান গনি, গাজীপুর অ্যাগ্রিকালচার ইউনিভার্সিটির মো. জাবির হোসেন, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মুয়াজ বিন জাহিদ, কিংবা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউবিটি) জাহিদ হোসেনের বক্তব্যও অনেকটা একই।
অন্যদিকে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের নুসরাত জাহান বলেন, ‘আমি এখনো পর্যবেক্ষণ করছি। কোনো তাড়াহুড়া বা অন্যের কথায় প্রভাবিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চাই না। সব তথ্য যাচাই করে, শেষ মুহূর্তে নিজের বিবেচনায় সঠিক প্রার্থী নির্বাচন করব।’
সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কে, কী বা কোন বিষয় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে, এ প্রসঙ্গেও আমরা জানতে চেয়েছিলাম। কয়েকজনের উত্তর শোনা যাক।
‘আমার সিদ্ধান্ত গ্রহণে সোশ্যাল মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রার্থীদের বক্তব্য, কর্মসূচি এবং তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে এটি আমাকে সাহায্য করেছে। তবে সবশেষে নিজের বিচারবুদ্ধি ও মূল্যবোধই অনুপ্রাণিত করছে।’ —মারিয়া রহমান, জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
‘বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আলোচনা সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে। আমরা নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলি, যুক্তি তুলে ধরি এবং ভিন্ন মতামত শুনি। এসব আলোচনার মাধ্যমেই অনেক বিষয় পরিষ্কার হয়।’ —নাদিয়া তাবাসসুম, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
‘সামাজিক মাধ্যম অবশ্যই বড় প্রভাব ফেলছে। বিভিন্ন দল বা প্রার্থী কী করছে, কী বলছে, সেগুলো সব সময় দেখছি। জুলাইয়ের সময় কার কী ভূমিকা ছিল, জুলাইয়ের পর কে কী করেছে, এসবও সোশ্যাল মিডিয়াতেই দেখেছি। আমি যেহেতু সাংবাদিকতার ছাত্রী, আমাদের ক্লাসরুমে নির্বাচন নিয়ে অনেক রকম আলাপ হয়। শিক্ষকদের কথাও আমার ওপর প্রভাব ফেলছে।’ —সুরাইয়া সাফিয়া, গণমাধ্যম, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
‘সিদ্ধান্ত গ্রহণে সবচেয়ে বড় প্রভাব আমার বাবার। তিনি আমাকে সব সময় সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে তৈরি করেছেন। তাঁর পরামর্শ আমাকে সঠিকভাবে ভাবার সুযোগ দেয়।’ —জান্নাতুল ফেরদৌস, গণিত বিভাগ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ফারদিনা সরকারসহ একাধিক শিক্ষার্থী বললেন, ২০২৪-এর জুলাই–পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন ভূমিকাই তাঁরা পর্যবেক্ষণ করেছেন গভীরভাবে। কে কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, কার হাতে দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপদ মনে হচ্ছে—এসবই আছে তরুণদের বিবেচনায়।
মার্কা, নাকি ব্যক্তি
প্রশ্ন ছিল—মার্কা, নাকি ব্যক্তি—কী দেখে ভোট দেবেন? অধিকাংশ শিক্ষার্থীই বললেন, ব্যক্তিই তাঁদের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র মাহমুদ বলছেন, ‘আমি ব্যক্তিকেই বেছে নেব। কারণ, অতীতে বারবার মার্কার ওপর ভরসা করে হতাশ হয়েছি। আমার বিশ্বাস, সঠিক ব্যক্তি সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারে। বাস্তব পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।’
নর্থ সাউথের সুরাইয়া সাফিয়াও অনেকটা একই সুরে কথা বললেন, ‘মার্কা দেখে ভোট দিলে অনেক যোগ্য প্রার্থী বাদ পড়ে যায়। আবার শুধু মার্কার জোরে অনেক অযোগ্য প্রার্থীও সংসদে চলে যায়। আমি চাই না এবার অন্তত এমনটা হোক।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাতিন নাওয়াল বলেন, ‘আমার কাছে একজন প্রার্থীর যোগ্যতা, সততা এবং কাজের রেকর্ড সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে মার্কারও গুরুত্ব আছে। কারণ, এটি রাজনৈতিক আদর্শ এবং দলের নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। শুধু ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়, তাই উভয় দিকই বিবেচনা করি।’
ভবিষ্যতের আশাবাদ
তরুণদের প্রত্যাশা—নির্বাচিত সরকার এলে দেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তবে আমরা যাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁদের অধিকাংশই বলছেন, দ্রুতই পরিবর্তন আসবে—এমনটা তাঁদের মনে হয় না। আর পরিবর্তন শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করে না, পরিবর্তন আনতে হলে সারা দেশের মানুষকেই উদ্যোগী হতে হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উসমান গনি বলেন, ‘এত ত্যাগের পরও যদি দৃশ্যমান পরিবর্তন না আসে, তাহলে শুধু একটি নির্বাচনের মাধ্যমে বড় পরিবর্তন হবে, এই আশা করা কঠিন। পরিবর্তনের কথা বলার কারণে হাদি ভাইয়ের মতো মানুষকে শহীদ হতে হয়, এমন বাস্তবতায় শুধু নির্বাচন যথেষ্ট নয়। যত দিন দেশের মানুষ পরিবর্তনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা না করবে, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ভেতর থেকে সংস্কার না করবে, তথাকথিত সিস্টেমগুলো না বদলাবে এবং সর্বোপরি বাঙালি জাতির মধ্যে মানবিকতা ও নৈতিকতার পরিবর্তন না আসবে, তত দিন প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়। অবকাঠামো বদলাতে পারে; কিন্তু সমাজ বদলাবে না।’
চট্টগ্রামের হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের শিক্ষার্থী মায়মুনা শারমিন বলেন, ‘রাতারাতি বড় ধরনের পরিবর্তন আশা করা ঠিক হবে না। তবে আমি বিশ্বাস করি, সৎ ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব নির্বাচিত হলে ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব। জনগণ যদি সচেতনভাবে এবং দায়িত্বের সঙ্গে ভোট দেয়, তাহলে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিবেশে পরিবর্তন আসবে। সময়ের সঙ্গে দেশ সত্যিকারের উন্নয়ন ও ইতিবাচক পরিবর্তনের সাক্ষী হতে পারবে।’