লেখার গুণই তাঁকে নারী-পুরুষের ঊর্ধ্বে তুলে ধরে
শাহনাজ মুন্নী। একাধারে সাংবাদিক, কবি ও কথাসাহিত্যিক। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে লেখালেখি করে চলেছেন। কবিতা, গল্প, উপন্যাসের পাশাপাশি লিখেছেন সংবাদ ও গবেষণা প্রতিবেদন। সম্প্রতি পেয়েছেন ‘অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার’।
দেওয়ার মতো অনেক পরিচয় থাকলেও সব ছাপিয়ে লেখক শাহনাজ মুন্নী পরিচয়টাই বড় হয়ে উঠল কীভাবে?
লেখাটা আমার জীবনে অন্তঃসলিলার মতো বয়ে গেছে। কষ্ট পেলাম, দুই লাইন লিখলাম; মন ভালো হলো, তখনো দুই লাইন লিখলাম। এক দিন না লিখলে মনে হয় কী যেন কী করিনি। মনে হয় এই আনন্দ পাওয়ার জন্যই সব যন্ত্রণা বাদ দিয়ে লেখক হয়েছি, লিখছি বা লিখে যাচ্ছি। লেখক আমার কিন্তু কোনো আলাদা টেবিল ছিল না, একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত কম্পিউটার ছিল না। অথচ ছোটবেলা থেকেই আমি লিখতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে প্রকাশ শুরু হয়। আমাদের বাড়িতে সবাই খুব পড়তেন। আর তো কোনো বিনোদন ছিল না সে সময়। আব্বা, আম্মা, মামা, খালা, ভাইবোন—সবাই ছিলেন পড়ুয়া। তবে কেউ লিখতেন না। আব্বা কবিতা লিখতেন, তবে তাঁর কোনো বই হয়নি। তাঁর কর্মস্থলের ম্যাগাজিনে কবিতা ছাপা হতো বছরে এক–দুবার। আমরা আব্বার নাম দেখতাম মোফাজ্জল হোসেন।
অভিযোগ আছে, নারী লেখকেরা যাপিত জীবনের বাইরে লিখতে পারেন না
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কেউই যাপিত জীবনের বাইরে যেতে পারেন না। তবে এই জীবনের বাইরের বিষয় নিয়েও কিন্তু আমার প্রচুর লেখা আছে, গবেষণাগ্রন্থ আছে, প্রতিবেদন আছে। তবে এটা ঠিক যে যাপিত জীবনের বাইরের বিষয় নিয়ে লিখতে গেলে যে থিতি দরকার, যে গবেষণা করতে হয়, তথ্য-উপাত্ত সংযোজন করতে যে সময় লাগে, নিরবচ্ছিন্ন লেগে থাকা, সেটি আমার নেই। আমি বরাবরই মাল্টিটাস্কার। একসঙ্গে অনেক কাজ করেছি। আজকে থেকে না, ২০–৩০ বছর ধরে করে আসছি। পেশাজীবন, সংসার, লেখালেখি—সব মিলিয়ে সেভাবে বসা হয়নি। কাজের ফাঁকে ফাঁকে লিখেছি। আয়োজন করে লেখা হয়নি।
পরিকল্পনা আছে। রাষ্ট্রীয় জীবনে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনা কাছ থেকে দেখেছি। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে ’৯০–এর গণ–আন্দোলন দেখেছি, পেশাগত জীবনে ওয়ান-ইলেভেনের প্রত্যক্ষদর্শী, জঙ্গি হামলা, ক্ষমতার পটপরিবর্তনসহ কত কিছু দেখেছি—এসব নিয়ে লেখার ইচ্ছা আছে। তবে এ সময়ের ব্যস্ততায় সেটি হয়তো হয়ে উঠবে না। তবে নারীরা পারে না বা করে না, তা নয়। এটা সম্ভব। তবে একটা কমফোর্ট জোন থাকে না? যে এটা লিখে আমি স্বস্তি পাই, সেই কমফোর্ট জোনগুলো আমার যাপিত জীবন। এর বাইরে অবশ্যই লিখতে পারি এবং লিখব।
নারী লেখক, নারী সাংবাদিক, নারী উদ্যোক্তা—কোনোভাবে কি নারীত্বকে বাদ দিয়ে চলা যায় না?
আমি আমার নারীসত্তা বাদ দিয়ে কোথায় যাব? আমার জৈবিক, সামাজিক সব পরিচয়ই নারী। আর এই নারীত্ব কোনো তুচ্ছ জিনিস নয়। জীবনের প্রতি পদে পদে আমার এই পরিচয়কে উপভোগ করেছি। তরুণ বয়সে মাঝে মাঝে মনে হয়েছে, এই যে আমাকে সন্ধ্যা হলেই বাসায় ফিরতে হয়, বন্ধুদের সঙ্গে গভীর রাতে আড্ডা দিতে পারি না, ছেলে হলে এসব হতো না। সেটা আমি তখন সাময়িক মিস করেছি। কিন্তু যতই আমি পরিণত হয়েছি, ততই আমার মনে হয়েছে, নারীত্বকে আমি ধারণ করেছি। আমি যে নারী, এটা আমার সৌভাগ্য। নারী দৃষ্টিকোণ থেকে আমি যা অবজার্ভ করতে পারি, সূক্ষ্ম অনেক কিছুই আমার নজর এড়ায় না, এটা অনেক পুরুষ পারবে না নিশ্চিত। সাহিত্যে নারীদের এ সময় ভালো করার কারণও এই সূক্ষ্ম সত্তা। নারীজীবনকে আমি কখনোই অস্বীকার করতে চাই না, বরং সেলিব্রেট করতে চাই। তবে যদি নারী লেখক (শব্দটা দিয়ে) তুচ্ছতাচ্ছিল্য বা অবজ্ঞা করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে আমি চাই শুধু লেখক শব্দটা থাকুক। কিন্তু মর্যাদার স্থানেই আমি নারীত্বকে রাখতে চাই।
৩০ বছরের লেখকজীবনে এই প্রথম পুরস্কার। আপনি পুরস্কার এড়িয়ে গেছেন, নাকি পুরস্কার আপনাকে এড়িয়ে গেছে?
আমরা যখন তরুণ ছিলাম, তখন পুরস্কারের ছড়াছড়ি ছিল না। এখন অনেক পুরস্কার হয়েছে, সেখানে বয়সভিত্তিক একটা ব্যাপার আছে। আর আমি বরাবরই এসব আয়োজন থেকে দূরে থাকতেই পছন্দ করি। অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার কর্তৃপক্ষ নিজে থেকে জানিয়েছে পুরস্কারের কথা। আগে কেউ কখনো বলেনি, আমিও চাইনি। আমার ফোকাস শুধুই কাজের দিকে। আমি মনপ্রাণ দিয়ে শুধু কাজ করে যেতে চাই। এর চেয়ে অচেনা মানুষ ফোন করে যখন লেখার কথা বলে ভালো লাগা জানায়, আমার জন্য সেটা অনেক বড় পুরস্কার।