মালয়েশিয়া থেকে স্বর্ণপদক এনেছেন ইস্ট ওয়েস্টের দুই শিক্ষার্থী

মো. আমিনুল্লাহ ও রায়হানা ইসলাম

গত এক দশকেই বাংলাদেশে হাজারের বেশি কারখানায় আগুন লেগেছে—খবরটা চমকে দিয়েছিল রায়হানা ইসলামকে। গবেষণা করতে নেমে আরও জেনেছেন, আগুন লাগার পর বেশির ভাগ সময় জায়গামতো পৌঁছানোই উদ্ধারকর্মীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তাই রায়হানা ভাবছিলেন, রোবটের সহায়তা নিলে কি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে আনা যায়?

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সহপাঠী মো. আমিনুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে শুরু হয় প্রশ্নের উত্তর খোঁজার কাজ। দুজন মিলে তৈরি করেন ফায়ারগার্ড ওয়ান পয়েন্ট জিরো। এটি এমন একটি স্বয়ংক্রিয় রোবট, যা আগুন, ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাস শনাক্ত করতে পারে; ৭০ মিটার দূর পর্যন্ত পানি ছুড়তে পারে; ব্যবহার করতে পারে কার্বন ডাই-অক্সাইড কিংবা শব্দতরঙ্গ। উচ্চ তাপমাত্রায়ও কাজ করতে সক্ষম এই রোবট।

আরও পড়ুন

নিজেদের তৈরি রোবট নিয়ে অষ্টম ওয়ার্ল্ড ইনভেনশন কম্পিটিশন অ্যান্ড এক্সিবিশনে অংশ নিয়েছেন রায়হানারা। মালয়েশিয়ার সেগি ইউনিভার্সিটিতে ১৯ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় এই প্রতিযোগিতা। সেখানে আইটি অ্যান্ড রোবোটিকস বিভাগে স্বর্ণপদক জিতে নিয়েছে ইস্ট ওয়েস্টের শিক্ষার্থীদের এই দল।

একই সমস্যার দিকে তাকিয়ে দুজন

রোবোটিকস ও অটোমেশনের নতুন নতুন উদ্ভাবন সব সময় টানত রায়হানাকে। আমিনুল্লাহ ছোটবেলা থেকেই রোবোটিকসের সঙ্গে যুক্ত, ঢাকা সিটি কলেজ সায়েন্স ক্লাবের সাবেক সভাপতি তিনি। দুজনেরই লক্ষ্য ছিল, অটোমেশন দিয়ে বাস্তব কোনো বড় সমস্যার সমাধান করা। সেই লক্ষ্য থেকেই গড়ে তোলেন ইনফারনোটিকস নামে একটি স্টার্টআপ, যুক্ত হন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির রোবোটিকস ক্লাবে। সিএসই বিভাগের ডিন অধ্যাপক আহমেদ ওয়াসিফ রেজাও তাঁদের নতুন কিছু তৈরির অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন।

সেন্সর যখন বলছিল ‘না’

থার্মাল ইমেজিং, গ্যাস সেন্সিং আর স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যবস্থা—তিনটিকে একসঙ্গে মেলানোই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কখনো সেন্সর ঠিকমতো ডেটা দিচ্ছিল না, কখনো ভুল তথ্য আসছিল, কখনো প্রত্যাশামতো কাজ করছিল না। কাজটা কঠিন হলেও তাঁরা হাল ছাড়েননি। ক্লাস, পরীক্ষা আর অ্যাসাইনমেন্টের চাপের মধ্যেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা ল্যাবে সময় কাটিয়েছেন। রায়হানার আগ্রহ অটোমেশনে, আর আমিনুল্লাহর দক্ষতা হার্ডওয়্যার ও ইলেকট্রনিকসে। দুজনের এই দক্ষতার সমন্বয়েই ধীরে ধীরে ফায়ারগার্ড ওয়ান পয়েন্ট জিরো তৈরি হয়েছে।

ফায়ারগার্ড ওয়ান পয়েন্ট জিরো

প্রথম পরীক্ষা, প্রথম স্বীকৃতি

রোবটটিকে প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরীক্ষার প্রথম বড় সুযোগ আসে জাতীয় পর্যায়ে। ৯ মে সাত শর বেশি প্রতিযোগীর মধ্যে ফায়ারগার্ড ওয়ান পয়েন্ট জিরো জেতে স্বর্ণপদক ও সেরা প্রকল্পের স্বীকৃতি। রায়হানা বলেন, ‘এই স্বীকৃতি আমাদের দুজনের সমান পরিশ্রমের প্রতিফলন।’ কিন্তু জয়ের পরও কাজ থামেনি। মালয়েশিয়ায় যাওয়ার আগে ওয়াটার মনিটরের প্রেশার কন্ট্রোল উন্নত করতে হয়েছে। সেন্সরগুলো আরও নিখুঁত করে তারপর পরের ধাপের প্রস্তুতি নিয়েছেন তাঁরা।

আরও পড়ুন

২২৫ প্রকল্পের ভিড়ে

মালয়েশিয়ার সেগি ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের ২২৫টি উদ্ভাবন দেখে অভিভূত হয়েছেন রায়হানা। সারা বিশ্বের শিক্ষার্থীরা অটোমেশন নিয়ে কত ধরনের সমস্যার দিকে তাকাচ্ছেন, সেটা কাছ থেকে দেখে নতুন করে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। বিশেষভাবে নজর কেড়েছে ‘স্মার্ট সিপিআর-ড্রোন ফর ইএমএস’ প্রকল্পটি। এই প্রকল্প দেখে রায়হানারা ধারণা পেয়েছেন, কীভাবে অটোমেশন সরাসরি মানুষের জীবন বাঁচাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

নিজেদের বুথে দর্শনার্থীদের সামনে রোবটের শব্দতরঙ্গ-সুবিধার লাইভ ডেমো দেখাতে হয়েছে। নানা প্রশ্নেরও উত্তর দিয়েছেন দুই তরুণ উদ্ভাবক। কিন্তু আসল পরীক্ষা তখনো বাকি। বিচারকেরা প্রশ্ন করেছেন, স্বয়ংক্রিয়ভাবে রোবট লক্ষ্য ঠিক করবে কীভাবে, কীভাবে উচ্চ তাপমাত্রায়ও কাজ করবে? আমিনুল্লাহ বলছিলেন, ‘আমরা দুজন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই এসব কারিগরি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি।’

শেষে ফল ঘোষণার মুহূর্তটা ছিল অবিস্মরণীয়। স্বর্ণপদক নিতে মঞ্চে ওঠার সময় দুজনই লাল-সবুজ পতাকাটা সঙ্গে নিতে ভোলেননি।

লক্ষ্য: শূন্য মৃত্যু

স্বর্ণপদক পেয়েও থামতে চান না রায়হানা-আমিনুল্লাহ। পরবর্তী সংস্করণে রোবটের এআই আরও উন্নত করতে চান, যেন চরম প্রতিকূল পরিবেশে রেডিও সিগন্যাল ছাড়াই এটি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানা, কেমিক্যাল প্ল্যান্ট ও পাওয়ার স্টেশনে এই রোবট কীভাবে সত্যিকারের কাজে নামানো যায়, সেটা নিয়েও ভাবছেন তাঁরা। ইনফারনোটিকসের মাধ্যমে এই ‘সেফটি রোবট’ বাজারে আনার স্বপ্নও দেখছেন ইস্ট ওয়েস্টের দুই শিক্ষার্থী। তাঁদের স্বপ্ন, একদিন দেশের কোনো কারখানায় আগুন লাগলে মানুষের আগেই ছুটে যাবে ফায়ারগার্ড ওয়ান পয়েন্ট জিরো। শিল্পকারখানায় অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর হার শূন্যে নামিয়ে আনতে চান তাঁরা।