আপনার একাডেমিক জীবন সম্পর্কে একটু শুনতে চাই।
নীলিমা ইসলাম: আমার যখন পাঁচ বছর বয়স, তখন বাংলাদেশ থেকে নিউইয়র্কে চলে আসি। এখানকার পাবলিক স্কুলগুলোতেই পড়েছি। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছি ইংরেজি সাহিত্যে। এরপর কিছুদিন সাহিত্যের বিভিন্ন কোর্স পড়িয়েছি। যেমন ‘দ্য পলিটিকস অব ল্যাঙ্গুয়েজ’, ‘ইন্ট্রোডাকশন টু ব্ল্যাক অ্যান্ড ল্যাটিনো লিটারেচার’। এখন পিএইচডি করছি তুলনামূলক সাহিত্যে। সাহিত্য কীভাবে আমাদের ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে দেয়, এখন সেটা নিয়ে কাজ করছি।
হুমায়ূন আহমেদ কীভাবে আপনাকে প্রভাবিত করেছেন?
নীলিমা ইসলাম: একজন শিল্পী ঠিক কখন থেকে আপনাকে প্রভাবিত করতে শুরু করেন, নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। বিশেষ করে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখকের ক্ষেত্রে। তাঁর সৃষ্টি বাংলাদেশের বহু পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। তবে পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, বড় প্রভাবটা পড়েছিল, যখন ফুসফুসের ক্যানসারে ভুগে আমার দাদা মারা গেলেন। দাদা বাংলাদেশি সংস্কৃতির সবটাই ভালোবাসতেন। সাহিত্য, চলচ্চিত্র, গান, ক্রিকেট, ইতিহাস, সব। যে সংস্কৃতির প্রতি দাদার এত ভালোবাসা, সেই সংস্কৃতির সঙ্গেই আমি আবার সংযোগ গড়তে চেয়েছিলাম মূলত তাঁর প্রতি সম্মান জানিয়ে। সমস্যা হলো, তখনো বাংলা ভালো পড়তে পারতাম না। শেখার ইচ্ছা সব সময়ই ছিল, কিন্তু নিউইয়র্কে যেসব স্কুলে পড়েছি, সেখানে বাংলা শেখার সুযোগ ছিল না। তাই নিজে নিজে শেখার সিদ্ধান্ত নিই। প্রথম যে লেখকদের বই হাতে তুলে নিয়েছিলাম, তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। এখনো মনে আছে, নিজে নিজে পড়েই তাঁর বই বুঝতে পারছি, এটা খুব অবাক করেছিল। তাঁর লেখা খুব যে সরল মনে হয়েছিল তা নয়, কিন্তু ভাষা এত স্পষ্ট, সহজাত আর আগ্রহজাগানিয়া যে আমার বুঝতে কষ্ট হয়নি। এখনো যখন প্রবাসে এমন কোনো বাংলাদেশি কিশোর-তরুণের সঙ্গে পরিচয় হয়, যারা বাংলাটা শিখতে চায়, তাদের হুমায়ূন আহমেদ পড়ার পরামর্শ দিই। একজন পাঠক ও গবেষক হিসেবে তাঁর কাজ যেভাবে আমাকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে, আমার মনে হয়, এটা অনেকের ক্ষেত্রেই হতে পারে।
থিসিসের বিষয় হিসেবে কেন হুমায়ূন আহমেদের ‘দেবী’ বেছে নিয়েছিলেন?
নীলিমা ইসলাম: মাস্টার্সে যখন দেবী নিয়ে থিসিসের সিদ্ধান্ত নিই, আগে থেকে কোনো সিদ্ধান্ত মাথায় নিয়ে কাজ শুরু করিনি। আমি শুধু উপন্যাসটাকে উপন্যাসটার মতো করে বুঝতে চেয়েছিলাম। আমি সব সময় বিশ্বাস করি, আগে থেকে কোনো থিওরি মাথায় গেঁথে রাখলে লেখাটা আদতে কী বোঝাতে চাইছে, সেটা উপলব্ধি করা কঠিন। তাই দেবীকে আমি কোনো নির্দিষ্ট কাঠামোয় বাধতে চাইনি। বরং চেয়েছি, উপন্যাসটাই আমাকে পথ দেখাক। প্রথমবার পড়ার সময়ই কোথাও কোথাও থমকে গিয়েছি, বারবার পড়েছি, বোঝার চেষ্টা করেছি কেন লেখাটা এত প্রবলভাবে আমাকে নাড়া দিচ্ছে। ওই মুহূর্তগুলোতেই আদতে গবেষণার শুরু।
উপন্যাসটা নিয়ে আমার বোঝাপড়া ক্রমাগত বদলেছে। পাঁচবার আমাকে থিসিসের খসড়া লিখতে হয়েছে। কারণ, প্রতিটি খসড়াতেই আমার দেবী-পাঠের ভিন্ন ভিন্ন স্তর প্রকাশিত হচ্ছিল, একটা নতুন কিছু আবিষ্কার করছিলাম। এখন পেছনে তাকালে মনে হয়, কোনো পূর্বকল্পিত আইডিয়া প্রমাণের জন্য নয়; বরং মন দিয়ে একটা সাহিত্য বোঝার মধ্য দিয়েই যে বিশ্লেষণটা ঠিকঠাক করা যায়, সেটা দেবীই আমাকে শিখিয়েছে।
আপনার থিসিসের সুপারভাইজার তো ভিনদেশি। তাঁকে কীভাবে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছেন? তাঁর পরামর্শ কী ছিল?
নীলিমা ইসলাম: আমার থিসিস অ্যাডভাইজার ছিলেন অধ্যাপক রবার্ট হিগনি। তিনি মূলত বিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ ও ইংরেজি সাহিত্যের একজন বিশেষজ্ঞ। বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে খুব বেশি জানতেন না। তাই উপন্যাস ও এর প্রেক্ষাপট বুঝতে তাঁকে আমার ওপরই ভরসা করতে হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদকে শুধু যে তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়েছি তা নয়; উপন্যাসটা নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিও যেভাবে ধীরে ধীরে বদলেছে, সেটা আমাকে মুগ্ধ করেছে। শুরুতে মনে হচ্ছিল, দেবী কেবল বাংলাদেশের সমাজ বা সংস্কৃতির প্রতিফলন। সেটা অবশ্যই আছে। তবে কেন যেন মনে হচ্ছিল, এই লেখার গভীরে আরও অনেক কিছু ঘটছে। লিখতে লিখতে একটা পর্যায়ে আমি হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে জ্যাক দেরিদার মতো চিন্তাবিদদের মেলানো শুরু করেছিলাম। সাহিত্যে জাদুবাস্তবতার মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করছিলাম। রবার্ট অবশ্য শুরুতে কিছুটা সতর্ক ছিলেন। কারণ, পশ্চিমা শিক্ষাঙ্গনে বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে এসব আলোচনা সাধারণত মেলানো হয় না। কিন্তু আমরা যখন একেকটা অধ্যায় নিয়ে একসঙ্গে কাজ করলাম, বুঝলাম, দেবীকে শুধু একটা দেশীয় বা স্থানীয় গণ্ডিতে নয়; বরং বিশ্বসাহিত্যের বড় উদাহরণগুলোর পাশে রেখে পড়া উচিত। যে লোকটা হুমায়ূন আহমেদকে চিনতেন না, দিন শেষে তাঁর চোখেমুখে যে মুগ্ধতা দেখেছি, সেটাই আমাকে সবচেয়ে আনন্দ দিয়েছে।
থিসিস করতে গিয়ে কি এমন কিছু আবিষ্কার করেছেন, যা পাঠক হিসেবে আগে ধরতে পারেননি?
নীলিমা ইসলাম: আমি যখন এই কাজটা শুরু করি, তখন মনের ভেতর প্রধানত একটা প্রশ্নই ছিল—রাজনৈতিক দিক থেকে হুমায়ূন আহমেদ এতটা নীরব (পলিটিক্যালি কোয়ায়েট) কেন? থিসিস শেষ করার পর বুঝলাম, শুরুতে যেটাকে নীরবতা বলে মনে হয়েছিল, সেটিই আদতে তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী সাহিত্যিক কৌশলগুলোর একটি। সরাসরি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য না দিয়ে দেবী এমন কিছু অর্থপূর্ণ শূন্যস্থান রেখে যায়, যা পাঠককে নিজের মতো করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। জাতীয়বাদ ও ইতিহাসনির্ভর স্মৃতি সম্পর্কে আমার ধারণাও বদলে দিয়েছিল এই থিসিস। আমি বুঝতে পেরেছি, একই ইতিহাসের অংশ হয়েও মানুষ একে ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। সাহিত্য এই পরস্পরবিরোধী স্মৃতিকে এমন একটা জায়গা দেয়, রাজনৈতিক বয়ান অনেক সময়ই যেটা পারে না। এটাই হয়তো আমার সবচেয়ে বড় শিক্ষা—সাহিত্যে নীরবতাকে সব সময় অনুপস্থিতি ভেবে ভুল করা উচিত নয়। কখনো কখনো যা বলা হয়নি, সেটাই সবচেয়ে বড় অর্থ বহন করে। কোনো রাজনৈতিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হুমায়ূন আহমেদের লেখনীর শক্তি নয়, পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগানোই তাঁর বড় শক্তি।
পরে কি হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে আর কোনো কাজ করেছেন?
নীলিমা ইসলাম: মাস্টার্সের থিসিসের পর হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে বিশেষভাবে আর কোনো একাডেমিক প্রজেক্ট করিনি। তবে দেবী পড়ার সময় যেসব প্রশ্ন সামনে এসেছিল, সেগুলো এখনো আমার গবেষণাকে প্রভাবিত করে।
হুমায়ূন আহমেদের কোন লেখা আপনার সবচেয়ে প্রিয়? আপনার কী মনে হয়, তাঁর লেখার বিশেষত্ব কী? কেন তিনি আলাদা?
নীলিমা ইসলাম: স্বাভাবিকভাবেই দেবী আমার সবচেয়ে প্রিয়। কারণ, এটার মধ্যে ডুবে থেকে আমি কয়েকটা বছর কাটিয়েছি। যতবারই উপন্যাসটার কাছে ফিরে যাই, নতুন কিছু চোখে পড়ে। আমার মতে, হুমায়ূন আহমেদ আলাদা; কারণ, তিনি অত্যন্ত সরলভাবে গভীর কথা বলতে জানেন। তাঁর ভাষা কঠিন নয়, অথচ চোস্ত। এ কারণেই ভিন্ন ভিন্ন পটভূমি থেকে উঠে আসা পাঠক নিজের মতো করে তাঁর লেখা উপভোগ করতে পারে। গল্প বলার ধরনটাও প্রশংসাযোগ্য। তাঁর লেখা ছোট একটা অনুচ্ছেদও পরিপূর্ণ গল্প মনে হয়। বাস্তবতা ও রহস্যময়তাকে তিনি অনায়াসে মেলাতে পারেন। তাঁর লেখায় অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃত বিষয়গুলোকেও বিস্ময়করভাবে বিশ্বাসযোগ্য লাগে। সহজ ও সাবলীল গদ্যের পাশাপাশি এ ভারসাম্যই অন্যতম কারণ, যার জন্য তাঁর কাজ আজও আমার মতো আরও অনেকের হৃদয়ে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে।