রেখা আর কখনো গ্রামে ফিরে আসেনি
বাবার কাজের সূত্রে আমরা তখন নারায়ণগঞ্জে থাকি। নারায়ণগঞ্জে হাইস্কুলের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। গ্রীষ্মের ছুটিতে মায়ের সঙ্গে গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের বোয়ালমারী গেছি। আমাদের বনমালীপুর গ্রামটি খুব বড় না, জনসংখ্যাও কম। গ্রামে স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা, খেলার মাঠ, হাট—সবই আছে। আমাদের গ্রামের ওপর দিয়ে চলে গেছে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত রাজবাড়ী–ভাটিয়াপাড়া রেললাইন। গ্রামের সমবয়সীদের সঙ্গে বাগানে আম পেড়ে খাওয়া, ভাড়ায় সাইকেল চালানো, হাটে গিয়ে গরম জিলাপি বা কটকটি খাওয়া, মাঝেমধ্যে বায়োস্কোপ দেখা, কখনো পুকুরে বড়শি দিয়ে মাছ ধরা আর প্রতিদিন বিকেলে নিয়মিত ফুটবল খেলা আমার দৈনন্দিন কাজ। কয়েক সপ্তাহ পরই আবার ফিরে যেতে হবে শহরের বাধাধরা নিয়ন্ত্রিত জীবনে, তার আগে জীবনটাকে উপভোগের চেষ্টা।
দিনটা ছিল সম্ভবত ১৯৭৬ সালের ১০ মে। স্কুলের মাঠে প্রতিদিনের মতো বিকেলে সমবয়সীদের সঙ্গে ফুটবল খেলছি। খেলায় তখন চরম উত্তেজনা। আমাদের গ্রুপ অলরেডি দুই গোল খেয়ে বসে আছে। এর মধ্যে হাফটাইমের বাঁশি বাজালেন রেফারি। ১০ মিনিটের বিরতি পেয়ে কেউ টিউবওয়েলের ঠান্ডা পানি, কেউ কাঁচা আম বা লেবু কেটে খাচ্ছি। ঠিক এমন সময় ট্রেনের হুইসেলের শব্দ। ৫০০ গজ সামনেই রেললাইন। বিকেল পাঁচটার ট্রেন ভাটিয়াপাড়া থেকে রাজবাড়ী ফিরে যাচ্ছে। আমরা সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে ট্রেনের বগি গোনার চেষ্টা করছি। হঠাৎ লক্ষ করলাম, তীব্র বেগে ছুটে চলা ট্রেনটি মাঠ ছাড়িয়ে সামান্য দূরে গিয়ে থেমে গেল।
আমরা অবাক। খেলা ছেড়ে সবাই লাইনের দিকে ছুট দিলাম। সবার আগে আমি, আমার পেছনে জাহাঙ্গীর, আরেফিন, রাজা, এনায়েতসহ আরও অনেকে। থেমে থাকা ট্রেনটার দিকে তাকিয়ে দৌড়াচ্ছি। একপর্যায়ে দেখি ট্রেনের যাত্রীরা সবাই ইশারায় আমাকে কি যেন দেখাচ্ছে। হঠাৎ তীব্র গোঙানির শব্দ শুনে থেমে গেলাম। আমার দেখাদেখি অন্যরাও থেমে গেছে। দেখি গ্রামের বাঁশী বেহারার কিশোরী মেয়ে রেখা রেললাইনের ওপরে পড়ে আছে। এই ভয়ানক দৃশ্য দেখে আমরা চিৎকার দিয়ে উঠলাম। বাঁচার জন্য রেখা তখন আমাদের দিকে তাকিয়ে সাহায্য চাইছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন থেকে গার্ড, পুলিশ ও অন্যরা নেমে এসে তাকে ধরাধরি করে ট্রেনে তুলে নিল।
তখন প্রায় সন্ধ্যা।
রেললাইনের পাশে জড়ো হয়েছে গ্রামের সব মানুষ। তাঁরাই আমাকে মায়ের কাছে পৌঁছে দিলেন। আমাকে গোসল করিয়ে গরম দুধ খেতে দিলেন আম্মা। ভয়ে আমার জ্বর এসে গেল। রাতে বারবার ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠতাম। প্রায় সাত দিন পরে স্বাভাবিক হতে পেরেছিলাম।
পরে শুনেছি, বাবার বকুনি খেয়ে অভিমানে এই পথ বেছে নিয়েছিল রেখা। ট্রেনের অপেক্ষায় রেললাইনের পাশের ঝোপে সে লুকিয়ে ছিল। পরে সুযোগ বুঝে চলন্ত ট্রেনের মাঝামাঝি কোনো বগির নিচে মাখা ঢুকিয়ে দিয়েছিল। প্রায় দুই মাস রাজবাড়ী জেলার রেলওয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে রেখাকে গ্রামে ফেরত পাঠায় রেল কর্তৃপক্ষ। তবে সে আর কখনো স্বাভাবিক হতে পারেনি। উদ্ভ্রান্তের মতো চলাফেরা করত, অকারণে হাসত সারাক্ষণ। সম্ভবত অতীত স্মৃতি সব ভুলে গিয়েছিল। বছর দুয়েক পর কাজের সন্ধানে শহরে চলে যায় রেখা। এরপর নিরুদ্দেশ হয়ে যায়।
আর কখনো গ্রামে ফিরে আসেনি।