নেপালি তরুণী ঋতু তামাংকে আজও ভুলতে পারিনি

বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে লেখা আহ্বান করেছিল প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ভালোবাসার টক–ঝাল–মিষ্টি গল্প লিখে পাঠিয়েছেন পাঠক। কেউ লিখেছেন দুরন্ত প্রেমের গল্প, কেউবা শুনিয়েছেন দূর থেকে ভালোবেসে যাওয়ার অনুভূতি। তেমনই একটি লেখা পড়ুন এখানে।

ছবি: এআই/প্রথম আলো

রাত সবে ৯টা, অথচ মনে হচ্ছে গভীর রাত। সন্ধ্যায় বেরিয়েছিলাম দুর্গম হিমালয়ের ছোট্ট এই গ্রামের মেঠোপথে। বৃষ্টি বাড়তেই মঠের পাশে একটা ছাউনিতলায় দাঁড়াই। পাশ দিয়েই বয়ে চলছে ভোটেকোশি। খরস্রোতা নদীটির বুকে আছড়ে পড়া বৃষ্টির ফোঁটার শব্দে অদ্ভুত একটা মায়া আছে। প্রকৃতির শব্দ শোনার সেই মুহূর্তেই মোবাইলটা বাজল, স্ক্রিনে ভেসে উঠল ‘ঋতু কলিং’।

ঋতু তামাং কাঠমান্ডুর এক কলেজের পড়াশোনা করছে। ছুটিতে বাড়ি এসেছে। আমি বাংলাদেশ থেকে নেপালে অ্যাডভেঞ্চারে এসে দুই দিন ধরে তাদের বাড়িতেই অতিথি হয়ে আছি। এই দুই দিন এই পাহাড়ি গ্রামে সেই আমার একমাত্র গল্পের সঙ্গী।

ফোনটা রিসিভ করি, ‘হ্যালো, ঋতু।’

: কোথায় আছ? ডিনার করবে না? মা আসতে বলছে।

আমি বলি, ‘মনাস্ট্রির পাশে আছি, বৃষ্টি একটু কমলেই আসছি।’

অন্ধকার, জনমানবহীন পিচ্ছিল পথ। পাহাড়ে রাতের পথ একা হাঁটা সহজ নয়। মোবাইলের টর্চের আলোয় পথ খুঁজে খুঁজে কাকভেজা হয়ে কোনোমতে ঋতুদের রান্নাঘরে পৌঁছালাম। বসে বসে উলের সোয়েটার বুনছেন ঋতুর মা। পাশে রাখা স্বচ্ছ কাচের গ্লাসে ধোঁয়া–ওঠা তিব্বতি পানীয় ‘ছ্যাঙ’। কাজের ফাঁকে একটু একটু করে পান করছেন। আমাকে দেখে আন্টির মুখে স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল। ঋতু পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এল, ওর চোখের মণি দুটি লণ্ঠনের আলোয় চিকচিক করছে। খাবার বেড়ে দিল ঋতু। রাই শাক, ধোঁয়া–ওঠা সুকুটি আর ডাল। সঙ্গে ঘন টক দই। খেতে খেতে বললাম, ‘অসাধারণ রান্না হয়েছে!’

: ধন্যবাদটা মাকে দাও, আমি শুধু পরিবেশন করেছি। অত ভালো রান্না আমি করতে পারি না।

ঋতুর কণ্ঠে এক চিলতে অভিমান নাকি অন্য কিছু? আমি হয়তো বুঝতে পারিনি, নয়তো বোঝার চেষ্টা করিনি।

বললাম, ‘ঋতু, কাল সকালে কাঠমান্ডু ফিরছি।’

ওর হাত থেকে জলের গ্লাসটা নামানোর শব্দ হলো। কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা। তারপর বলল, ‘সত্যি?’

: হুম।

‘আরও কয়েকটা দিন থেকে যাও,’ খুব ধীরে বলেছিল ও।

আমি হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু সেই হাসির ভেতরে কোথাও যেন এক অদ্ভুত শূন্যতা ও সংকোচ ছিল।

কয়েক মুহূর্ত অন্যমনস্ক হয়ে কিছু একটা ভেবে সে বলল, ‘কখন যাবে?’

: আটটা কি নয়টার বাসে।

: আমিও যাব তোমার সঙ্গে।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তোমার না ছুটি চলছে, তাহলে কেন যাবে?’

সে শুধু ছোট করে বলল, ‘এমনি।’

রাতে ডায়েরি লিখতে লিখতে মনে হচ্ছিল, কিছু কিছু মানুষ আমাদের জীবনে খুব অল্প সময়ের জন্য আসে, কিন্তু স্মৃতিতে সেই সময়টুকুই অদ্ভুতভাবে দীর্ঘ হয়ে থাকে। আর আমি এক ভবঘুরে পরিব্রাজক। আমাকে তো আর মায়ায় আটকানো যাবে না, যেতে হবে বহুদূর। ঠিক তখনই আবার ঋতুর কল, ‘মাকে বলেছি, সকালে তোমার সঙ্গে কাঠমান্ডু যাচ্ছি।’

বুঝতে পারছিলাম না কী বলব। শুধু বলেছিলাম, ‘আচ্ছা, সকালে দেখা হবে।’

পরদিন সকালে গিয়ে দেখি সব পাল্টে গেছে। ঋতুর মুখটা যেন মেঘলা আকাশ। চা এগিয়ে দিয়ে মাথা নিচু করে জানাল, দাদার গাড়িতে তাকে যেতে হচ্ছে।

নির্লজ্জের মতো দাঁত বের করে বললাম, ‘সে তো ভালোই হলো, আরাম করে যেতে পারবে।’

আমার কথায় মনে হলো আরও বেশি বিরক্ত হলো। কিছু না বলেই ভেতরে চলে গেল। সেদিন প্রথমবার মনে হয়েছিল, মানুষের মন কখনো কখনো নিজের কাছেও সত্যি কথা লুকিয়ে রাখে ভীষণ অভিমানে।

আমি ৯টার বাসে উঠলাম। জানলার পাশে বসে পাহাড়ের বাঁক আর কুয়াশা দেখছিলাম। বাসের ঝাঁকুনিতে হৃদয়ের কোথাও একটা শূন্যতা টের পাচ্ছিলাম, বোধ হয় ঋতুর সঙ্গে আর কখনো দেখা হবে না। লোকাল বাস ধীরে ধীরে পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে এগোচ্ছিল। জানালার বাইরে নদী, মেঘ, পাহাড় পেছনে দৌড়ে যাচ্ছিল, আর মনে হচ্ছিল মহামূল্যবান কিছু একটা পেছনে ফেলে যাচ্ছি।