বিদায় নয়, এমদাদ

শুরু থেকেই প্রথম আলোর মঙ্গলবারের ক্রোড়পত্র নকশা দেশি পোশাক এবং দেশি পোশাকের ডিজাইনার উদ্যোক্তাদের পরিচিতি, তাঁদের কাজ পাঠকদের কাছে তুলে ধরেছে। এ যাত্রাপথে নকশার সঙ্গে সম্পৃক্ততা তৈরি হয় এমদাদ হকের। সেই সম্পর্ক অটুট থেকেছে শেষ দিন পর্যন্ত। তাঁর অকালপ্রয়াণে আমরা জানাই গভীর শ্রদ্ধা। এমদাদ হককে নিয়ে লিখেছেন তাঁর আরেক উদ্যোক্তা বন্ধু।

ভিন্নধর্মী কাজের জন্য চিরজীবি হয়ে থাকবেন ডিজাইনার এমদাদ হকছবি: নকশা

বন্ধু, উদ্যোক্তা, বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ডিজাইনার এমদাদ হক তাড়াহুড়ো করে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। নানা গল্পে, তুমলু আড্ডায় সময় কেটেছে তাঁর উর্দু রোডের একান্নবর্তী পরিবারের স্বাপ্নিক আবাসে অথবা আমাদের সায়েন্স ল্যাবসংলগ্ন বাড়িতে। এই দীর্ঘ আলাপচারিতা আমাদের চিন্তার বিকাশে, পেশার বাঁক নির্ধারণে রেখেছেন বিশেষ ভূমিকা। ধীরে ধীরে আমরা পরিবারের অংশ হয়ে উঠেছিলাম। পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের জন্য এমদাদ অনভুূতিপ্রবণ ছিলেন।

কাছের মানষু দের কাছে তাঁর দিলখোলা হাসি, প্রাণবন্ত আড্ডা, রসবোধ, অমলিন স্মৃতি হয়ে থাকবে। এমদাদের জন্ম পুরান ঢাকায় সম্ভ্রান্ত, বনেদি ও সংস্কৃতি মনা পরিবারে। উদয়ন স্কুল , ঢাকা কলেজে পড়া শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিংয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ছাত্রাবস্থায় যুক্ত হন সাপ্তাহিক বিচিত্রার ঈদ ফ্যাশন প্রতিযোগিতা আয়োজনের সঙ্গে। সম্পাদক শাহাদত চৌধরুীর সাহচর্য লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় দেশি ফ্যাশন, নতুন উদ্যোগসহ নানা বিষয়ে তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়।

ক্রেতা-বিক্রেতাদের সংযুক্তি স্থাপনের মাধ্যমে দেশীয় পোশাকের বাজার সম্প্রসারণ, নতুন ও সম্ভাবনাময় উদ্যোগের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান, নবীন ডিজাইনারদের সামনে নিয়ে আসায় সাপ্তাহিক বিচিত্রা সেই সময় অসাধ্যসাধনই করেছে। পোশাকের নকশার প্রতি আগ্রহ পরিবার থেকে শুরু হলেও বিচিত্রায় কাজ করতে গিয়ে দেশি পোশাকের বিষয়ে বিস্তর জানাশোনা ও আগ্রহ তৈরি হয় এমদাদের। প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা শেষে ব্র্যাক টেক্সটাইলে কাজ করার সুবাদে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, বিশেষত উত্তরবঙ্গের শাহজাদপুর, বেলকুচি, উল্লাপাড়া এলাকায় এমদাদ প্রান্তিক বয়নশিল্পীদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করেন এবং সমৃদ্ধ হন। পরবর্তী সময়ে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ উদ্যোগে ডিজাইন বিভাগের প্রধান হিসেবে যুক্ত হন এবং গ্রামীণ উদ্যোগকে একটি উল্লেখযোগ্য অবস্থানে নিতে সমর্থ হন। শুভা্নুধ্যায়়ী, সহযোগী ও কাছের মানষুদের সঙ্গে নিয়ে ‘বাংলার মেলা’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এমদাদ হক নিজস্ব একটি ব্র্যান্ড তৈরির উদ্যোগ নেন। এমদাদের ডিজাইন পরিকল্পনা ও বিপণনের নতুন নতুন কৌশল, যক্তিসুংগত দামে আধনিুক পোশাকের উপস্থাপন বাংলার মেলাকে সুপরিচিত ব্র্যান্ডে পরিণত করে।

নকশার ফটোশুটে মডেলের মাথায় পাগড়ি বাঁধছেন এমদাদ হক
ছবি: নকশা

প্রাতিষ্ঠানিক কাজের পাশাপাশি এমদাদ বরাবর নিজের ভালো লাগার কাজ করে গেছেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল, ঢাকা আর ঢাকার বাইরের রুচিশীল সচ্ছল মানষেুরা বিশেষ পোশাকের ফরমাশ করবেন, এমদাদ সময় নিয়ে সেই পোশাক তৈরি করবেন। উর্দু রোডের বাসায় বসে বিশেষ ফরমায়েশি পোশাকের পসার হয়তো সেই মাত্রায় হয়নি, কিন্তু তাঁর নকশার গুণমগ্ধ একটি বিশেষ ক্রেতাগোষ্ঠী আছে। তাদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন ‘স্টুডিও এমদাদ’। তিনি বিয়েশাদিসহ বিভিন্ন উৎসব, অনুষ্ঠানের ফরমায়েশি পোশাক ও নিত্য অনুষঙ্গ দীর্ঘসময় ধরে ডিজাইন করেছেন। এমদাদের ডিজাইন করা বরের খানদানি পোশাক বাংলাদেশের ফ্যাশনে বিশেষ অবস্থান তৈরি করেছে, যা ইতিহাসের অংশ হয়েই থাকবে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র তারকাদের ফ্যাশন নিয়ে প্রথম যাঁরা কাজ করা শুরু করেন, ডিজাইনার এমদাদ তাঁদের অন্যতম। প্রায় দুই যুগ আগে তারকাদের চলচ্চিত্রের চরিত্র উপযোগী বিশেষ পোশাক ডিজাইন করে, সংবাদপত্রে, ম্যাগাজিনে উপস্থাপনের মাধ্যমে সবাইকে জানিয়ে সচেতন করার কাজটি তিনি করেছেন দক্ষ হাতে। এর ধারাবাহিকতায় আজ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে পেশাগত কস্টিউম ডিজাইনাররা নিয়মিত কাজ করছেন।

স্ত্রী দীপ্তি হকের সঙ্গে এমদাদ হক
ছবি: নকশা

এমদাদ বাংলাদেশের ফ্যাশন ডিজাইনারদের সংগঠন এফডিসিবির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন। সাংগঠনিকভাবে দেশীয় পোশাকশিল্পের বিকাশে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে প্রকল্পে যুক্ত থেকেছেন। তাঁর বিভিন্ন প্রকল্পে সম্পৃক্ত করেছেন দেশের তরুণ মেধাবীদের। নবীন ডিজাইনার, মডেল, উদ্যোক্তা, তরুণ সংবাদকর্মীসহ নানা সৃজনশীল মানুষ এমদাদ হকের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন, সহযোগিতা পেয়েছেন। বাংলাদেশের ফ্যাশনশিল্পের ইতিহাস লেখা হোক বা না হোক, এ দেশের সচেতন মানুষ এমদাদ হককে মনে রাখবেন তাঁর বহুমাত্রিক কাজের সফলতার কারণে।

লেখক: উদ্যোক্তা, কে ক্র্যাফট