কুমিল্লার একটি গ্রামের সাধারণ ছেলে থেকে যেভাবে উদ্যোক্তা হয়ে উঠলেন চন্দ্র মানিক

গয়না ও গৃহসজ্জাসামগ্রীর মাধ্যমে আবহমান বাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে নতুন করে তুলে ধরছে ‘আদিম’। বৈশাখী মেলা, হস্তশিল্প মেলা, বিভিন্ন প্রদর্শনীতে সাড়া জাগিয়েছে প্ল্যাটফর্মটির পণ্য। ‘আদিম’–এর উদ্যোক্তা কুমিল্লার একটি গ্রামের সাধারণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পরিবার থেকে উঠে আসা চন্দ্র মানিক। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন অনন্যা গোস্বামী

দেশীয় প্রকৃতিজাত উপকরণগুলো দিয়ে তৈরি পণ্য যেন মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছায়, এই ভাবনা থেকেই আদিমের যাত্রা
ছবি: সুমন ইউসুফ
প্রথম আলো:

নাম কেন ‘আদিম’?

মাটি থেকে শুরু করে এ অঞ্চলে আমাদের বিকাশের যেসব উপকরণ ছিল, সেগুলোকেই আদিম নতুন আঙ্গিকে সামনে নিয়ে আসতে চায়। আমাদের এই ভূখণ্ডে যা কিছু সহজলভ্য ও রোজকার, যেমন ফলের বীজ ও খোসা, তুলার তন্তু, কাঠের গুঁড়া ও টুকরা, মাটি ইত্যাদি ঘিরে আমাদের যে ভাবনা, দর্শন ও স্মৃতিকাতরতা, সেগুলোকেই আধুনিক সময়ের উপযোগী করে উপস্থাপনের একটা প্ল্যাটফর্ম হলো আদিম। শিকড়ের কাছে ফিরতে চাওয়ার তাড়না থেকেই এই নাম।

প্রথম আলো:

আদিম কোন কোন উপাদান ব্যবহার করে?

আদিমে আমরা গাছ থেকে পাওয়া উপাদান, যেমন শুকনা ফুল, ফলের বীজ, খোসা, তালপাতা, বিভিন্ন ঘরোয়া জিনিস, মাটির টেপা পুতুল ও গয়না, কাপড়ের পুতুল, সুতা দিয়ে তৈরি গয়নাসহ ঘর সাজানোর বিভিন্ন জিনিস, ফেলে দেওয়া নানাবিধ বস্তু, বিভিন্ন দেশীয় ধাতু ও ধাতব উপকরণকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে থাকি।

মাটি, সুতা, ফেলে দেওয়া অকাজের জিনিস কুড়িয়ে আনি। সেসব জুড়ে, সাজিয়ে, গুছিয়ে কখনো গয়না হয়, কখনো কোনো আর্টপিসও হয়। আসলে আমরা কিছুই করি না। উপকরণগুলোই মিলেমিশে একেক সময় একেকটা রূপ ধারণ করে। আমরা চাই, আমাদের দেশীয় প্রকৃতিজাত উপকরণগুলো যতটা সম্ভব মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাক, সবার ভেতর ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জীবনযাপনের অংশ হয়ে উঠুক। যেহেতু মানুষ খুব দ্রুত এবং সব সময় গয়না ধারণ করে, সেই সুবাদেই আসলে আমাদের গয়নাকে বেছে নেওয়া। গয়নার পাশাপাশি আমরা বিভিন্ন আর্টপিস আর হোম ডেকোর নিয়েও কাজ করছি। মাটি আর কাপড়ের তৈরি পুতুল আমাদের অন্যতম গৃহসজ্জাসামগ্রী।

প্রথম আলো:

এসব পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করেন কী করে?

বিশেষ ধরনের আর্টপিসগুলো নির্মাণ করতে যে পরিমাণ কাঁচামাল, নির্মাণদক্ষতা, সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়, সেগুলোর মূল্যও সেভাবে নির্ধারিত হয়।

প্রথম আলো:

কবে থেকে কাজ শুরু করলেন?

২০২৩ সাল থেকে মূলত। প্রথমে বিসিক থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। এই কাজ নিয়েই সামনে এগোতে চেয়েছিলাম। প্রথম দুই বছর একা একা চুপচাপ কাজ করে তেমন সাড়া বা প্রচার না পেয়ে পরে নিজেই প্রচারের উদ্যোগ নিই। ফেসবুকের পেজের জন্য ছবি তোলা, ভিডিও করা, এডিট করা, পোস্ট করা, পেজ চালানো, মেসেজের উত্তর দেওয়া—মানে পুরো যোগাযোগটা আমি নিজেই করি।

আদিমের গয়না
ছবি: সুমন ইউসুফ
প্রথম আলো:

একটা সময় মাটি, সুতা আর কাপড়ের গয়না, পুতুলের যথেষ্ট চল ছিল, কদর ছিল। এই কাজকে আবার নতুন করে সামনে নিয়ে আসতে হচ্ছে কেন?

আগের সময়ের চেয়ে বর্তমানের সময়টা ভিন্ন। ওই সময় মাটির জিনিসের যে আধিপত্য ছিল, সেখান থেকে বিদেশি ধাতু, বিদেশি রত্ন, কাচ, চাঁচ আর সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিকের আগ্রাসন হয়েছে। এসব নিয়ে কাজ করা সহজ। পরিশ্রম কম, বিনিয়োগ কম, সময়ও কম লাগে। যেখানে মাটির কাজে অনেক খাটনি, সময়ও বেশি লাগে। অনেকেই তাঁতীবাজার বা সাভার থেকে সস্তায় ধাতব পণ্য কিনে স্থানীয় বড় বড় মার্কেটে বিক্রি করেন। অন্যদিকে মাটি, সুতা, কাপড়ের শ্রমিক বা শিল্পীদের কাঁচামাল সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে পণ্য নির্মাণসহ বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো যুদ্ধটা করতে হয়, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও শ্রমসাধ্য। এখন আমার মতো যাঁরা চাচ্ছেন, আমাদের সেই অতীত ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে, তাঁদের নতুন করে নতুন যুগের মানুষের রুচি, চাওয়া অনুযায়ী মাটিকে নতুন রূপে, নতুন ধরনে সামনে নিয়ে আসতে হচ্ছে।

প্রথম আলো:

এই ভিন্ন ধরনের নকশা, ফলের বীজের মতো উপকরণ ব্যবহার করার বুদ্ধি...এসবের অনুপ্রেরণা আসে কোথা থেকে?

বেশ কিছু দেশ, জনপদ, লোকালয় ঘুরে এসব ভাবনার সৃষ্টি। গয়নার ব্যাপারে মূল প্রেরণাটা আসে ব্রাজিলের আমাজন ইত্যাদি এলাকার স্থানীয় গয়না থেকে। ওসব জায়গায় ধাতু, প্লাস্টিকসহ কৃত্রিম উপকরণের কোনো ব্যবহার নেই। সবকিছুই তারা প্রকৃতি থেকে আহরণ করে। কুয়েতে আমি সেসব দেখেছি। পরে শান্তিনিকেতনে গিয়ে বোলপুরের স্থানীয় শিল্পকর্ম দেখেছি, যেগুলো ওই জায়গা ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যায় না। গাছের ফুল, ফল, খোসা, বীজ, বাকল ইত্যাদি ব্যবহার করার ভাবনাটা সেখান থেকেই এসেছে। আমাদের দেশেও পাহাড়ি ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে দেখি, শিখি, বানানোর চেষ্টা করি। আমি শুরু করেছিলাম পিচ ফলের বীজ দিয়ে। পরে বঁইচির বীজ, কলকি ফুলের বীজ, রঞ্জনা ইত্যাদি দিয়ে কাজ শুরু করি।

বঁইচি কিন্তু এখন বিলুপ্তপ্রায়। পাওয়াই যায় না। এমন একটা দুর্লভ জিনিস জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করে গয়নায় রূপ দিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। এমনও হয়েছে যে ঢাকায় কেউ আমার কাছ থেকে বঁইচির বীজ নিয়ে ছাদবাগানে গাছ লাগিয়ে দেন। এসব ঘটনাই আদিমের অনুপ্রেরণার উৎস।

আদিমের জনপ্রিয় পণ্য কাপড়ের পুতুল
ছবি: সুমন ইউসুফ
প্রথম আলো:

আপনাদের পণ্যের বিশেষত্ব কী?

এগুলো সম্পূর্ণ হাতের কাজ, প্রতিটি কাজই অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। কাজেই একটি পণ্যের পুনরাবৃত্তি আমরা করতে চাই না। কোনো গয়নার একটা সেটই হয়তো আমরা বানিয়েছি। কেউ সেটা কিনল, ব্যবহার করল, কাউকে দেখাল বা অন্যরা দেখল। তখন আরেকজনও সেই একই গয়না দাবি করে বসেন। আমাদের জানান, আবদার করেন। কখনো কখনো অগ্রিম মূল্য পরিশোধ করে দেন। এমনও হয়েছে যে একটা গয়নার জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করেছেন কেউ কেউ।

প্রথম আলো:

ফরমাশ দেওয়ার মাধ্যম কী?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ফেসবুকে যে পেজ আছে, সেটাতেই মানুষ যোগাযোগ করেন। কেউ কেউ সামনাসামনি দেখা হলে বলেন। ফোনও আসে প্রচুর।

পুতুলগুলো দেখলে অনেকেরই শৈশবের কথা মনে পড়ে যায়
ছবি: সুমন ইউসুফ
প্রথম আলো:

আদিমের এই জনপ্রিয়তার কারণ কী?

প্রতিটি জিনিসকে শিল্পকর্ম হিসেবেই তৈরি করি। প্রতিটি গয়না, পুতুল, শোপিসের পেছনে কিছু গল্প থাকে, হারিয়ে যাওয়া সময়ের স্মৃতি থাকে, আমাদের মা-ঠাকুরমা, বাবা-কাকাদের জীবনযাপনের নিদর্শন থাকে, আমাদের শৈশবের গল্প থাকে। যেমন নকশিকাঁথা সেলাইরত স্ত্রী, মাথাল দেওয়া কৃষক, সন্তান কোলে নিয়ে মা, কলস কাঁখে গৃহবধূ, মাছ ধরা জেলে, তাঁতবোনা তাঁতি, চাকা ঘূর্ণনরত কুমার ইত্যাদি অনেক রকম ফিগার। এগুলো যখন মাটি, সুতার মতো মৌলিক উপাদানে তৈরি হয়, তখন গল্পগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। এগুলো শুধু পুতুল নয়, এগুলো আমাদের অতীতের দিকে টানে, শিকড়ের কাছে নিয়ে যায়।

পুতুলগুলো দেখে শৈশবের কথা মনে পড়ে যায়। গ্রামের কথা মনে পড়ে। বেড়ে ওঠার স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মানুষ হয়তো এসব দৃশ্যকে আপন করে নিতে চায়। ছোট্ট একটুকরা শৈশবকে নিজের ঘরে নিয়ে রাখতে চায়। এ জন্যই হয়তো আদিমকে মানুষ এত পছন্দ করে। আর আমরাও চাই, গল্পগুলো ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ুক। এখনকার শিশুরা তাদের পূর্বপুরুষ, আমাদের ভূখণ্ড ও জলবায়ুকে খুব কাছ থেকে দেখুক, জানুক।

প্রথম আলো:

আদিমের পণ্যের দাম কিন্তু অনেক বেশি।

আমরা দুই ক্যাটাগরিতে কাজ করি। রেগুলার হোম ডেকোর আর ইউনিক আর্টপিস। রেগুলার জিনিসগুলোর দাম কিন্তু বেশি না। কমবেশি ৫০০ টাকা থেকে শুরু। কিন্তু বিশেষ ধরনের আর্টপিসগুলোর দাম বেশি আর সেটা হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ, এসব কাজ চাইলেই বা চেষ্টা করলেও করা যায় না। এগুলো কঠিন। যেহেতু আমাদের সব উপকরণই প্রকৃতি থেকে আহরণ করতে হয় এবং সেটা সংগ্রহই। কুড়িয়ে নেওয়া। কোনো কিছুই গাছ থেকে ছিঁড়ে আনা হয় না। কোনো দুর্লভ গাছের বাকল বা বীজ বা নির্দিষ্ট কোনো এলাকা থেকে সংগ্রহ করে আনা দুর্লভ মাটি তো সব সময় সহজলভ্য নয়। কাজেই সেগুলো দিয়ে তৈরি করা গয়না বা শিল্পকর্ম খুবই বিশেষ হয়। সেটা হয়তো মাত্র একটা বা একবারই বানানো গেল।

পুনরাবৃত্তি হলো না। কেউ চাইলেও দশটা দিতে পারব না। হয়তো অনেক কষ্ট করে আর মাত্র একটা বানানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। যেহেতু আমাদের কোনো ছাঁচ নেই। কোনো মেশিন নেই। সবকিছু নিজের হাতে করতে হয়। মাটির জিনিস যদিও– বা ছাঁচ বা ফ্রেমের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু তুলা, তন্তু, বীজ, খোসা ইত্যাদি জিনিসের ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব নয়। এসব ক্ষেত্রে দাম ওইভাবে সমন্বয় করতে হয়। না হলে আমাদের সময়, শ্রম, মেধার কোনো মূল্যই থাকে না। আদিমের সবচেয়ে দামি পণ্য চরকাবুড়ি। কাঠ, কাপড়, সুতা ইত্যাদি দিয়ে তৈরি। দাম ১৫ হাজার টাকা। আরও আছে বায়োস্কোপ, দাম ১০ হাজার।

প্রথম আলো:

প্রকৃতি থেকে সরাসরি সংগ্রহ করা কাঁচামালের ক্ষেত্রে এই যুক্তি খাটে। কিন্তু সুতা বা কাপড় দিয়ে তৈরি পুতুল, শোপিসের মূল্য কি কমিয়ে রাখা যায় না?

আদিমের প্রতিটি পণ্যই ভিন্ন কিছু করার চেষ্টা থাকে
ছবি: সুমন ইউসুফ

কাপড় বা সুতার কাজেও তো কোনো ছাঁচ থাকে না। আমাদের প্রতিটি আইটেম আলাদা। সবই একদম হাতে, আঙুলে বানানো হয়। প্রতিটি পুতুলের কাপড়, পরিধেয় পোশাক, গয়না—এগুলোও হাতে বানাই। এসব পুতুলকে যে পোশাক পরানো হয়, যেমন শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা–এগুলো কিন্তু অন্য কাপড় ছিঁড়ে তার খণ্ডাংশ দিয়ে বানানো হয় না।

গ্রামীণ নারী চরিত্রের পুতুলের শাড়িটা তাঁতে বানানো। ছোট ছোট শাড়ি আমরা তাঁতির কাছ থেকে বানিয়ে নিই। বড় তাঁতে ছোট্ট শাড়ি বানানো খুব কষ্ট। আর সব কাজ যেহেতু আমি নিজেই করি, তাই একটা জিনিস বানাতে অনেক সময় লাগে। একই আইটেম একসঙ্গে অনেকগুলো বানাতে পারি না। তেমনটা করতে পারলে হয়তো দামটা আরও কমিয়ে ফেলা যেত। আমি চেষ্টাও করছি। কাজটা আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে যাবে, এমন প্রত্যাশা আমার আছে।