আবার সুযোগ পেলে কোন বিষয়ে পড়তাম

আবারও যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান, কোন বিষয় বেছে নেবেন? করপোরেট জগতের কর্তাব্যক্তি, কৃতী শিক্ষক, নানা ক্ষেত্রে সফল পেশাজীবীদের কাছে প্রশ্ন করেছিলাম আমরা। তাঁদের উত্তর থেকেই হয়তো এখনকার ছেলেমেয়েরা বিষয় বাছাইয়ের ধারণা পাবেন।

শুধু চাকরির জন্য নিজেকে তৈরি করলে হবে না

ফাহিম মাশরুর, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বিডি জবস
ছবি: সংগৃহীত

ফাহিম মাশরুর, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বিডি জবস

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়েছি। স্নাতক-স্নাতকোত্তর দুটোই অর্থনীতিতে। এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার সময় আমি অর্থনীতিকেই এগিয়ে রাখব। অর্থনীতি পড়েছিলাম নিজের আগ্রহেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষে উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ শুরুর পরিকল্পনা করি, সেই পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটে ভর্তি হই। করপোরেট চাকরি পেতে একটা এমবিএ ডিগ্রি দরকার—এমন চিন্তা নিয়ে আমি ভর্তি হইনি। উদ্দেশ্য ছিল, ব্যবসা-দুনিয়া সম্পর্কে আরও জানা।

একসময় বিবিএ-এমবিএর প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ছিল বেশি। এখন সময় ও ক্যারিয়ার-দুনিয়ার চাহিদা অন্য রকম। বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে তথ্যপ্রযুক্তি বা প্রকৌশলসংক্রান্ত বিষয়ে সুযোগ অনেক বেশি। ভবিষ্যতে নানা ক্ষেত্রে আমাদের বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও কারিগরি পেশাজীবী প্রয়োজন হবে। এখন যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন, তাঁদের আমি এ বিষয় মাথায় রাখার পরামর্শ দেব। ভবিষ্যতে শুধু চাকরির জন্য নিজেকে তৈরি করলে হবে না, পরিবর্তিত পরিস্থিতির জন্যও প্রস্তুত হতে হবে। পড়াশোনা শেষে যাঁরা উদ্যোক্তা হতে চান, তাঁদেরও তৈরি থাকতে হবে। নতুন বাজার, নতুন পণ্য-সেবা তৈরির মাধ্যমে সৃজনশীল কাজের সুযোগ সব সময়ই থাকে। আর যাঁরা ব্যবহারিক বিষয়ে পড়ার সুযোগ পাবেন না, তাঁরা বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ নিতে পারেন।

বাংলা, ইতিহাস, এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ

খালেদ মাহমুদ, সহযোগী অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট (আইবিএ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ছবি: সংগৃহীত

খালেদ মাহমুদ, সহযোগী অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট (আইবিএ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশলে ব্যাচেলর ডিগ্রি নেওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে এমবিএ করেছিলাম। পরে যুক্তরাষ্ট্রের বেন্টলি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও ফিন্যান্সে এমবিএ ডিগ্রি নিয়েছি। কম্পিউটারবিজ্ঞানে পড়ার কারণে প্রযুক্তিগত বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা ছিল। আবার ব্যবসায় প্রশাসনসংক্রান্ত বিষয়ে মাস্টার ডিগ্রির কারণে ব্যবসা-দুনিয়া সম্পর্কে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পেয়েছি। আবারও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেলে কম্পিউটারবিজ্ঞানের মতো ব্যবহারিক বিষয়ই নির্বাচন করব।

তরুণ শিক্ষার্থীদের আমি সব সময় ব্যবহারিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের পরামর্শ দিই। বিশ্ববিদ্যালয়জীবন আনন্দের। আমাদের শিক্ষার্থীরা দেখা যায় বিষয়ের চেয়ে কে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন, সেদিকে নজর দেয় বেশি। আমি বলব, ভবিষ্যতের ক্যারিয়ারের জন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সনদ অর্জন করছেন, তার তাৎপর্য অনেক কম। কে কোন বিষয়ে পড়ে কতটা কার্যকরভাবে নিজেকে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারল, সেটাই বরং গুরুত্বপূর্ণ।

এখন প্রযুক্তিগত দক্ষতা সবার জন্যই জরুরি। যে হিসাববিজ্ঞান বা বিপণন পড়ছেন, তাঁর জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ইতিহাস বা বাংলায় পড়লেও প্রযুক্তিগত দক্ষতা থাকতেই হবে। আমাদের রাজনীতিবিদ যেমন দরকার, তেমনি চিত্রকর, ইতিহাসবিদ, নৃতত্ত্ববিদেরও প্রয়োজন। এসব বিষয়ও গুরুত্ব দিয়ে পড়তে হবে।

জীবনসংশ্লিষ্ট দক্ষতা অর্জনে জোর দিতে হবে

আখতারউদ্দিন মাহমুদ, প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা, ব্র্যাক ব্যাংক
ছবি: সংগৃহীত

আখতারউদ্দিন মাহমুদ, প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা, ব্র্যাক ব্যাংক

হিসাববিজ্ঞান, ফিন্যান্সের মতো বিষয়ে না পড়েও আপনি ব্যাংকিং খাতে পেশা গড়তে পারেন। মূল কথা হলো, শিক্ষার্থী হিসেবে জীবনসংশ্লিষ্ট দক্ষতাগুলো অর্জন করতে হবে। নেতৃত্ব দেওয়ার দক্ষতা, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, আবেগকেন্দ্রিক বুদ্ধিমত্তার মতো বিষয়গুলো এখন গুরুত্বপূর্ণ।

আমি উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি শেষে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে ক্যাডেট কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করি। সেখানে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ পেয়েছি। সামরিক বাহিনীর সদস্য হিসেবে নানা ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করেছি। পরে দেশি-বিদেশি করপোরেট প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন বিভাগে কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এখন আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেলে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাই বেছে নেব।

আমরা ব্র্যাক ব্যাংকে তরুণ নির্বাহীদের জন্য একটি কর্মসূচি চালু করেছি। তরুণ কর্মীদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দক্ষতা গড়ে তোলা এবং বিভিন্ন কৌশল শেখা ও প্রয়োগের আগ্রহ জাগানোর দিকে আমরা নজর দিচ্ছি। আমার বক্তব্য হলো, সিজিপিএ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মানবিক মূল্যবোধও জরুরি। সহশিক্ষামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম যেমন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ক্লাবে যুক্ত থাকা, এসবে জোর দিতে হবে। তরুণদের আমি বলব, বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বিষয়েই পড়ার সুযোগ পান না কেন, নিজের প্রয়োজনে জীবনবোধ-সংশ্লিষ্ট দক্ষতা অর্জনে আরও মনোযোগী হতে হবে।

বিষয় নির্বাচনের আগে জানতে হবে ‘কী হচ্ছে’

নাদিম চৌধুরী, সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)
ছবি: সংগৃহীত

নাদিম চৌধুরী, সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)

প্রযুক্তির দুনিয়া যেমন দ্রুত বদলাচ্ছে, শিগগিরই নানা যন্ত্র বা প্রযুক্তিনির্ভর টুল মানুষের কর্মক্ষেত্র কমিয়ে দেবে। অন্যদিকে উদ্ভাবনের সুযোগও বাড়বে। সেমিকন্ডাক্টর, চিপ তৈরি থেকে শুরু করে গবেষণাসংশ্লিষ্ট কাজে মানুষ আরও বেশি যুক্ত হবে। যে বিষয় বা যে বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়ুন না কেন; প্রোগ্রামিং, কোডিং থেকে শুরু করে প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নিতেই হবে।

ব্যাচেলরে পড়ার সময় আমার সামনে সেই আমলে খুব বেশি জানার সুযোগ ছিল না। সিনিয়রদের দেখে বুয়েটে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশলে (ইইই) ভর্তি হই। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে পিএইচডির জন্য নির্বাচিত হয়েছি। গত ১৫ বছর প্রকৌশলবিদ্যা-সংশ্লিষ্ট নানা বিষয় সম্পর্কে শিখেছি, জেনেছি। আবারও সুযোগ পেলে জেনে-বুঝে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশলেই পড়ব। এখনকার তরুণদের বলতে চাই, হুজুগে সবার কথা শুনে, কিংবা পরিবার চায়, এমন কোনো বিষয় পড়া যাবে না। যে বিষয়ে পড়বেন, সেই দুনিয়ায় কী হচ্ছে, কী সম্ভাবনা-সংকট—সব বিষয়েই ধারণা রাখতে হবে। ইন্টারনেট থেকে তথ্য নিতে পারো। যাঁরা উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় আছেন, তাঁদের পরামর্শ নিতে পারেন।

গবেষণায় যুক্ত হতে হবে আরও বেশি। যাঁরা বিজ্ঞান, প্রকৌশল বা চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়তে আগ্রহী, তাঁদের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই কাজ শিখতে হয়। আবার যাঁরা মানবিক, আইন, ব্যবসায় শিক্ষা ও সামাজিক অনুষদে পড়বেন, তাঁদেরও গবেষণানির্ভর নানা কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ আছে।

চ্যালেঞ্জিং কোনো বিষয় বেছে নাও

আবদুল্লাহ আল মামুন, মেশিন লার্নিং প্রকৌশলী, মেটা
ছবি: সংগৃহীত

আবদুল্লাহ আল মামুন, মেশিন লার্নিং প্রকৌশলী, মেটা

এক বিষয়ে পড়ে পরে কিন্তু অন্য বিষয়েও উচ্চশিক্ষা বা পিএইচডি করার মতো সুযোগ আছে। তবে যাঁরা দীর্ঘ মেয়াদে পরিকল্পনা করতে চান, তাঁদের বলব, প্রযুক্তি বা প্রকৌশলসংক্রান্ত বিষয়কে প্রথমে গুরুত্ব দিতে। শিক্ষার্থীদের সামনে বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গবেষণা থেকে শুরু করে মাস্টার্স করার মতো সুযোগ এখন বেড়েছে। যাঁরা এ বছর ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেবেন, তাঁদের জন্য আমার পরামর্শ—চ্যালেঞ্জিং কোনো বিষয় বেছে নাও, যেখানে নতুন কিছু শেখার আগ্রহ তৈরি হবে। স্কুল-কলেজে আমরা যা পড়ি, যেভাবে পড়ি, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তা বদলে যায়। নিজের আগ্রহকে গুরুত্ব দিয়ে দক্ষতা অর্জনে মনোযোগী হতে হবে।

মাধ্যমিকে পড়ার সময় আমার ইচ্ছা ছিল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব, কিন্তু পরে ভর্তি হই পলিটেকনিকে। ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হিসেবে আমি পরে ডুয়েটের কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশলে ভর্তি হই। আমি এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেলে অবশ্যই কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশলেই পড়ব। যদি দ্বিতীয় কোনো বিষয়ে পড়তে চাই, তা হবে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রে এসে একটা বিষয় খেয়াল করেছি, প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ব্যাংক—সব জায়গায় বিবিএ-এমবিএপড়ুয়াদের অনেক সুযোগ। ব্যবস্থাপক হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে অবশ্যই বিবিএ-এমবিএ পড়াকে গুরুত্ব দেব।

পপুলার বিষয় না, বুঝেশুনে বিষয় পছন্দ করতে হবে

মুনজেরিন শহীদ, প্রধান প্রশিক্ষক, টেন মিনিট স্কুল
ছবি: সংগৃহীত

মুনজেরিন শহীদ, প্রধান প্রশিক্ষক, টেন মিনিট স্কুল

আমি প্রথমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ক ইউনিটে পরিবেশবিজ্ঞানে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলাম। ক্লাস শুরুর ছয় মাসের মাথায় গিয়ে বুঝলাম এ বিষয়ে স্নাতক করা আমার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত হবে না। তখন দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করি। দ্বিতীয়বার যখন ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি, তখন শুরুর দিকে ‘পপুলার বিষয়’ যেমন অর্থনীতি, উন্নয়ন অধ্যয়নের মতো বিষয়গুলোকে পছন্দের তালিকায় রেখেছিলাম। আমি আসলে অন্যরা যা করছে, তা দেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। পরে ইংরেজি বিষয়ে পড়ার সুযোগ পাই। আমার কাছে মনে হয়, আমি যদি এ বছরের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতাম, আবারও ইংরেজিই বেছে নিতাম। এ বিষয়ে পড়ার ভবিষ্যৎ, গবেষণা বা বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্পর্কে যেহেতু জানি, তাই ইংরেজিই আমার পছন্দ।

আমি সবাইকে বলি, যে বিষয়েই পড়ার সুযোগ আসুক না কেন, নিজের আগ্রহ ও দক্ষতা অর্জনের বিষয়টিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বেসরকারি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা কোন পর্যায়ের, শিক্ষকেরা কেমন পড়ান, সেসব বিষয়ে খোঁজখবর নিতে হবে। ভবিষ্যতে বিদেশে পড়াশোনা কিংবা পেশার সুযোগ সম্পর্কে জেনেবুঝে বিষয় ও বিশ্ববিদ্যালয় পছন্দ করতে পরামর্শ দেব।