দুর্ঘটনায় দৃষ্টিশক্তি হারানো শাফি এখন চাকরি করেন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে, তাঁকে দেখা যায় স্ট্যান্ড-আপ কমেডির মঞ্চেও
দুর্ঘটনায় দুচোখের আলো হারিয়েছেন শাফায়াত-ই-রাব্বি ওয়াজেদ। তবে থেমে থাকেননি। একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরির পাশাপাশি এখন তাঁকে দেখা যায় স্ট্যান্ড-আপ কমেডির মঞ্চেও। কৌতুকের মধ্য দিয়ে মানুষকে হাসানো শাফির গল্প শোনাচ্ছেন জাওয়াদুল আলম
মোহাম্মদপুরে শাফির বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম। কিছুক্ষণ পর সাদা ছড়ি হাতে এক তরুণকে একা হেঁটে আসতে দেখলাম। চোখে কালো চশমা। পকেট থেকে মুঠোফোন বের করলেন। হয়তো আমাকে ফোন করতে চাচ্ছিলেন। তার আগেই নিজের পরিচয় দিলাম।
এই সেই শাফি, যাঁকে ফেসবুকে কালো চশমা পরে স্ট্যান্ডআপ কমেডি করতে দেখেছিলাম। নিজেকে ‘অন্ধ’ দাবি করে মঞ্চে কৌতুক করছিলেন। প্রথমে ভেবেছিলাম, কৌতুকের অংশ হিসেবেই হয়তো এমনটা করছেন। কিন্তু একের পর এক ভিডিও দেখেও নিশ্চিত হতে পারিনি। সত্যিই কি তিনি দৃষ্টিহীন? হলে কীভাবে চাকরি করেন? কীভাবে একা চলাফেরা করেন?
সেই কৌতূহল থেকেই যোগাযোগ। জানা গেল, শাফির পুরো নাম শাফায়াত-ই-রাব্বি ওয়াজেদ। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে এক সড়ক দুর্ঘটনায় দুই চোখে গুরুতর আঘাত পান তিনি। প্রায় ১২ দিন চিকিৎসার পর জানতে পারেন, আর কখনোই দেখতে পাবেন না।
তবে দৃষ্টিশক্তি হারালেও থেমে যায়নি তাঁর জীবন। বরং নতুন বাস্তবতায় নিজেকে মানিয়ে নিয়ে আবার শুরু করেছেন। এখন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভার বাংলাদেশে অপারেশনস এক্সিকিউটিভ হিসেবে কাজ করেন। অফিস করেন নিয়মিত। একাই যাতায়াত করেন। স্মার্টফোন ও কম্পিউটার ব্যবহার করেন। আর অবসরে মঞ্চে উঠে মানুষকে হাসান।
আবার শুরু
বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে সকালে খেতে বের হয়েছিলেন শাফি। মালিবাগ রেলক্রসিংয়ের কাছে হঠাৎ গাড়ির চাকা পাংচার হয়। ধাক্কা লাগে ফ্লাইওভারের পিলারে। স্টিয়ারিংয়ে মাথা লেগে মারত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হন শাফি। অন্য এক বন্ধুও আহত হন। তবে পেছনে বসা বন্ধুরা বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পান। দুর্ঘটনার পর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে মিলিয়ে তিন সপ্তাহের বেশি ভর্তি ছিলেন শাফি। দুর্ঘটনার পরের প্রায় দেড় মাসের কোনো স্মৃতি নেই তাঁর। হাসপাতালে থাকা এবং বাড়ি ফেরার পরের প্রথম কয়েক দিনের কথা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেই শুনেছেন।
বাড়িতে ফেরার পর যখন ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করলেন কী হয়েছে, তখন জীবন তাঁর কাছে অন্য রকম হয়ে গেল। স্বাভাবিকভাবেই বিষণ্ন ছিলেন। কিন্তু নিজের ওপর নির্ভর করার অভ্যাসটা ছাড়তে চাননি।
শাফি বলেন, ‘দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছি বলে আমি কারও জন্য বোঝা হতে চাইনি। তখন পরিকল্পনা ছিল, ডিজিটাল মার্কেটিং অথবা কনটেন্ট রাইটিংয়ের কাজ করব। যদি সেটা সম্ভব না হয়, তাহলে কল সেন্টারে চাকরি করব। তবুও ঘরে বসে থাকব না।’
দুর্ঘটনার সময় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির চূড়ান্ত বর্ষের ছাত্র ছিলেন শাফি। শুধু ইন্টার্নশিপ বাকি ছিল। বড় ভাই হাসনাতের সহযোগিতায় বাড়িতে বসে আবার শুরু করলেন মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ ব্যবহার শেখা। টাইপিং, ইন্টারনেট ব্রাউজিং—এক এক করে আয়ত্ত করতে লাগলেন।
এরপর বাড়িতে বসেই অনলাইনে ইন্টার্নশিপ করেন। ওই সময়ে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ইংরেজির প্রভাষক সুমাইয়া তাসনিম হক তাঁকে বিভিন্নভাবে উৎসাহ দেন। শাফি জানান, সুমাইয়া তাসনিমও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা জয় করে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।
ইন্টার্নশিপ শেষ করার পর শাফি বুঝলেন, শুধু কম্পিউটার চালাতে পারলেই হবে না। একা চলাফেরাও শিখতে হবে। মোহাম্মদপুরের ভিজ্যুয়ালি ইম্পেয়ার্ড পিপলস সোসাইটিতে (ভিপস) ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নিলেন। শিখলেন কম্পিউটার ব্যবহার, সাদা ছড়ি দিয়ে চলাফেরার কৌশলসহ প্রয়োজনীয় নানা বিষয়।
স্মার্টফোন ও কম্পিউটারে শাফি ব্যবহার করেন স্ক্রিন রিডিং সফটওয়্যার। স্ক্রিনে যা লেখা থাকে, সফটওয়্যার তা পড়ে শোনায়। এভাবেই মুঠোফোন ব্যবহার, ইন্টারনেট ব্রাউজিং, টাইপিং, মাইক্রোসফট অফিস—সবই করেন তিনি।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ইউনিলিভার বাংলাদেশে ইন্টার্নশিপের সুযোগ পান শাফি। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ও অনগ্রসর তরুণ-তরুণীদের জন্য বিশেষ এই ইন্টার্নশিপ ছিল হাইব্রিড। চার মাস পর আসে পূর্ণকালীন চাকরির প্রস্তাব।
কিন্তু নতুন চাকরির সঙ্গে নতুন চিন্তাও এল—প্রতিদিন অফিসে যাবেন কীভাবে?
পরিবারের সবাই কিছুটা চিন্তিত ছিলেন। শাফি অবশ্য নিজের মতো করে সমাধান বের করে ফেললেন। রাইড শেয়ারিং বাইকে প্রতিদিন অফিস যাতায়াত শুরু করলেন।
মঞ্চে উঠে
বরাবরই মানুষকে হাসাতে পছন্দ করেন শাফি। বিশেষ করে নিজেকে নিয়েই কৌতুক করতে তাঁর ভালো লাগে। কিন্তু দুর্ঘটনার আগে মঞ্চে উঠে স্ট্যান্ডআপ কমেডি করার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না।
এর মধ্যে ভারতের রিয়েলিটি শো ‘ইন্ডিয়াজ গট লেটেন্ট’-এর দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী প্রতিযোগী ভাব্য শাহের স্ট্যান্ডআপ কমেডি তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। বন্ধুদের উৎসাহও ছিল। শেষ পর্যন্ত স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান দুই বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করে গুলশানের নাভিদ’স কমেডি ক্লাবের দুটি ওপেন সেশনে অংশ নেন।
প্রথম দুই অনুষ্ঠানেই ভালো সাড়া পান। কয়েক দিনের মধ্যেই ক্লাবের নিয়মিত কমেডিয়ানদের সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁকেও আমন্ত্রণ জানানো শুরু হয়।
এর মধ্যে ২০২৫ সালের ৮ মে দিনটি শাফির মনে বিশেষভাবে জায়গা করে নিয়েছে।
‘প্রায় ৭০ জন মানুষ টিকিট কেটে আমার অনুষ্ঠান দেখতে এসেছিলেন। এটা আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া। অনুষ্ঠান শেষে অনেকেই আমার প্রশংসা করলেন। অনেকে আবার আমার সঙ্গে ছবি তুললেন,’ বলছিলেন শাফি।
এখন পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট ও কমেডি ক্লাবে ১৭টি শো করেছেন তিনি।
নিয়মিত অফিসে যাতায়াতের অভিজ্ঞতা তাঁর স্ট্যান্ডআপ কমেডিরও বিষয় হয়ে উঠেছে। রাস্তায় চলতে গিয়ে মানুষের নানা প্রশ্ন, অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি—সবকিছুর মধ্যেই খুঁজে নেন হাসির উপাদান।
‘শাফি আনসিন’
মঞ্চের কৌতুকগুলো শুধু মঞ্চে সীমাবদ্ধ না রাখার কথাও ভাবলেন শাফি। মনে হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও দিলে আরও মানুষের কাছে পৌঁছানো যাবে। সেই ভাবনা থেকেই গত বছরের আগস্টে ‘শাফি আনসিন’ নামে ফেসবুক পেজে নিয়মিত ভিডিও প্রকাশ শুরু করেন।
ভিডিও সম্পাদনা ও আপলোডের কাজে বন্ধু ও কমেডিয়ান তাশদীদ তাঁকে সহযোগিতা করেন। তবে পেজের কাজের সবটাই অন্যের ওপর নির্ভর করে করেন না শাফি। নিজেই ভিডিও আপলোড করেন। কমেন্ট ও মেসেজের উত্তরও দেন।
পেজের অনুসারীর সংখ্যা এখনো খুব বেশি নয়। তবে কয়েকটি কমেডি ভিডিওর ভিউ ইতিমধ্যে দুই লাখ ছাড়িয়েছে।
ফেসবুকে তাঁর ভিডিও দেখে কেউ হয়তো প্রথমে তাঁর কথাগুলোকে শুধু কৌতুক হিসেবেই নেন। কিন্তু সেই কৌতুকের ভেতরেই আছে প্রতিদিনের জীবনের গল্প—একজন দৃষ্টিহীন মানুষের চলাফেরা, কাজ করা, মানুষের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া, কখনো বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়া, আবার সেখান থেকেই হাসির উপাদান খুঁজে নেওয়া।
শাফি নিজের অভিজ্ঞতার কথাই বলতে চান। তবে একটু অন্যভাবে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের আশপাশে যাঁরা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ আছেন, তাঁরা বরাবরই উপেক্ষিত। তাঁরাও যে সৃজনশীল কোনো কাজ করতে পারেন, এটা হয়তো অনেকেই জানেন না। আমাদের জীবনের গল্প, প্রতিদিনের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে খুব বেশি জানার সুযোগ নেই। গল্প, সিনেমা বা নাটকেও আমরা উপেক্ষিত থাকি।’
তাই নিজের জীবনের গল্প নিজেই বলতে চান শাফি। হাসতে হাসতে।
থামবেন না
নিজেকে নিয়ে খুব দূরের কোনো পরিকল্পনা করতে চান না শাফি। আপাতত যে কাজ করছেন, সেটিই ভালোভাবে করে যেতে চান। অনেক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে ইউনিলিভারের মতো প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়াকে তিনি নিজের জন্য বড় পাওয়া মনে করেন।
আর স্ট্যান্ডআপ কমেডি তাঁকে দিয়েছে অন্য রকম একটি জায়গা। মঞ্চে উঠে নিজের গল্প বলার সুযোগ, মানুষের হাসি, প্রশংসা, পরিচিতি—সব মিলিয়ে নতুন একটি জগৎ তৈরি হয়েছে তাঁর জন্য।
একসময় যে তরুণকে মনে হয়েছিল, কালো চশমার আড়ালে হয়তো কৌতুকের অভিনয় করছেন, তিনি এখন নিজের জীবনটাই মঞ্চে তুলে ধরেন। সাদা ছড়ি হাতে একা পথ চলেন, মুঠোফোনে কাজ করেন, কম্পিউটারে অফিসের কাজ করেন, রাইড শেয়ারিং বাইকে চড়ে অফিসে যান। আর সুযোগ পেলেই মঞ্চে উঠে মানুষকে হাসান।
দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর শাফির জীবনে অনেক কিছুই বদলে গেছে। বদলায়নি শুধু একটি বিষয়—সামনে এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা।