জীবন যেমন
বাঁশের খুঁটি আর ঢেউটিনের ছাউনি দেওয়া ঘরটাতে আমি আর মা থাকতাম, ঝড়ের রাতগুলো আজও ভুলতে পারি না
কালবৈশাখী কী, তখনো জানতাম না। তবে ‘সাইক্লোন’ বা ‘ঘূর্ণিঝড়’ শব্দগুলো পরিচিত ছিল। আমাদের ছোট্ট একটা ঢেউটিনের ছাউনি দেওয়া ঘর ছিল। বাঁশের খুঁটি। আমি আর মা থাকতাম। পাশাপাশি দুটি বিছানা, একটি পড়ার টেবিল। ঘরের অর্ধেকজুড়ে মাচা। গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না, রাতে হারিকেন জ্বলত, ঘুমানোর আগে আলো কমিয়ে রাখা হতো।
চৈত্র-বৈশাখ এলেই সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে মনে ভয় ঢুকে যেত। মনে হতো, আজ রাতেই বুঝি ঝড় আসবে। একটু বাতাস বইলেই মায়ের সঙ্গে চুপটি করে থাকতাম। ঘরটা নড়বড়ে—মনে হতো, চালসহ পুরো ঘরটাই বুঝি উড়ে যাবে।
এক বৈশাখের রাতে ঘুমিয়ে আছি। হঠাৎ বাতাসের প্রচণ্ড শব্দে ধড়ফড় করে জেগে উঠি। মনে হচ্ছিল, পুরো গ্রামটাই উড়িয়ে নেবে। আমাদের ঘরটা বাতাসে কাঁপতে লাগল। দরজায় চেয়ার-টেবিল ঠেস দিয়ে আটকে দেওয়া হলো। মা খুব ভয় পেয়ে গেল। আমিও ভয়ে কাঁপছিলাম।
আশপাশে টিন উড়ে যাওয়ার শব্দ পাচ্ছিলাম। সবাই আল্লাহকে ডাকছিল। সামনের ঘর থেকে চাচা আজান দিচ্ছিলেন। আমাদের ঘরের দুই পাশে ছিল দুটি বড় গাছ—একটি আম, অন্যটি বরই। এত বড় বরইগাছ এলাকায় আর ছিল না। ভাবছিলাম, যদি কোনো ডাল ভেঙে পড়ে!
মা আমাকে চৌকির নিচে ঢুকে পড়তে বললেন, ঘর ভেঙে পড়লে যেন চাপা না পড়ি। চৌকির নিচটা এত নিচু যে সোজা হয়ে বসাও যায় না। দোয়া-দরুদ যা পারতাম পড়তে লাগলাম। ঝড় ততক্ষণে আরও বেড়েছে। আকাশ গর্জন করছে। মা বললেন, ‘মেঘ ডাকলেই ঝড় কমবে।’
একসময় ঝড় কিছুটা কমল। ধীরে ধীরে মানুষের কথা শোনা যেতে লাগল। শেষে পুরোপুরি থেমে গেল। তখন রাত প্রায় বারোটা। বাইরে বের হয়ে দেখি, বিশাল বরইগাছটা হেলে পড়েছে। রাস্তাজুড়ে অনেক গাছ পড়ে আছে। কলাগাছ, শজনেগাছ—নরম ডালপালার সব গাছ ভেঙে গেছে। কোথাও কোথাও গাছের মগডালে আটকে আছে চাল থেকে খুলে আসা ঢেউটিন।
সেই রাতের পর অনেক ঝড় দেখেছি। বড় হয়েছি, পাকা ঘরে থেকেছি, ঝড়ের খবর টেলিভিশনে দেখেছি। তবু সেই টিনের ঘরের রাতগুলোর মতো ভয় আর কখনো পাইনি। এখনো ঝড় উঠলে মনে পড়ে চৌকির নিচে গুটিসুটি বসে থাকা এক শিশুর কথা, আর দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক মায়ের আতঙ্ক।
ছোটবেলার ঝড়ের রাতগুলো আজও ভুলতে পারি না।