শাবিপ্রবির জ্বালানি ও খনিপ্রকৌশলের শিক্ষার্থীরা কাজ করছেন দেশে–বিদেশে

পেট্রোফিজিকস ল্যাবে কাজ করছেন শিক্ষার্থীরাছবি: নোমান মিয়া

নীরবেই জ্বালানি খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরির কাজ করে চলেছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং (জ্বালানি ও খনিপ্রকৌশল) বিভাগ। সিলেটের সুরমা বেসিন দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসসমৃদ্ধ এলাকা। শাবিপ্রবির ক্যাম্পাস যেহেতু এই এলাকা থেকে খুব বেশি দূরে নয়, তাই বাস্তবভিত্তিক গবেষণার সুযোগ পাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।

একনজরে পিএমই

শাবিপ্রবির পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং (পিএমই) বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৪ সালে। ২০০৫ সালের ১ জুলাই শুরু হয় একাডেমিক কার্যক্রম। ২০১০ সালে প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের স্নাতক শেষ হয়। ২০১৮ সালে চালু হয় স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম। এতে গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষার নতুন দরজা খুলে যায়।

বর্তমানে বিভাগে বিএসসি ইন পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং, এমএসসি/এমই ইন পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং (গবেষণাভিত্তিক) এবং পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু আছে। প্রতিবছর আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে প্রায় ৩৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হন।

আরও পড়ুন

বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের কারিকুলাম এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন শিক্ষার্থীরা পেট্রোলিয়াম অনুসন্ধান থেকে শুরু করে উৎপাদন এবং বিতরণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান পায়। এতে তারা শিল্প খাতে সরাসরি কাজ করতে পারছে।’

বিভাগে এখন শিক্ষক আছেন প্রায় ১৬ জন। চারজন পিএইচডি ডিগ্রিধারী। তিনজন জাপান থেকে এবং একজন সৌদি আরবের কিং ফাহাদ ইউনিভার্সিটি অব পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মিনারেলস থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন।

এই বিভাগের পাঠ্যক্রমে পেট্রোলিয়াম অনুসন্ধান, রিজার্ভার ইঞ্জিনিয়ারিং, ড্রিলিং, প্রোডাকশন, মাইনিং টেকনোলজি এবং পরিবেশগত ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা শুধু তত্ত্বই পড়েন না, আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণাও নেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল টুইন, মেশিন লার্নিংভিত্তিক রিজার্ভ অনুমান এবং ডিজিটাল মডেলিংয়ের কাজও শেখেন তাঁরা। এসব প্রযুক্তি তাঁদের গবেষণা ও থিসিসে ব্যবহার করতে হয়।

শিক্ষার্থীরা শুধু তত্ত্বই পড়েন না, আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণাও নেন
ছবি: নোমান মিয়া

হাতে-কলমে কাজের আনন্দ

পিএমই বিভাগের গবেষণাগার আছে মোট ৫টি—পেট্রোফিজিকস ল্যাব, ড্রিলিং ও রিজার্ভার ইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাব, মাইনিং ও রক মেকানিকস ল্যাব, জিওলজি ও সেডিমেন্টোলজি ল্যাব এবং কম্পিউটেশনাল সিমুলেশন ল্যাব। সুযোগ-সুবিধা অবশ্য এখনো পর্যাপ্ত নয়। কারণ, এ ধরনের ল্যাব তৈরির খরচ অনেক। এর মধ্য দিয়েই চলছে ক্লাস, প্রকল্প, থিসিসের কাজ।

চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার মাহির বলেন, ‘ড্রিলিং ল্যাবে কাজ করতে গিয়ে মনে হয় আমরা ভূগর্ভের রহস্য উন্মোচন করছি। এআইভিত্তিক রিজার্ভ মডেলিং প্রজেক্ট ও মেশিন লার্নিং–সংক্রান্ত কাজ করে বুঝেছি, ভবিষ্যতে প্রযুক্তি কীভাবে জ্বালানিসংকট কমাতে সাহায্য করে। নতুন যেসব গ্যাস কূপ খনন করা হচ্ছে, সেগুলোর মাধ্যমেও বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান পাচ্ছি।’

তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী দয়াল সাহা বলেন, ‘পেট্রোফিজিকস ল্যাবে আমরা “রক স্যাম্পল” বিশ্লেষণ করি। এর মধ্য দিয়ে অভিজ্ঞতা হয়। কখনো কখনো রাত পর্যন্ত থাকতে হয়, শিক্ষকেরাও আমাদের সঙ্গে থাকেন। গাইড করেন।’

আরও পড়ুন

ছড়িয়ে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা

মেশিন লার্নিংয়ের সাহায্যে রিজার্ভ অনুমান, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা বিশ্লেষণ, খনিজ সম্পদ খুঁজে বের করায় এআই ব্যবহার, তেল-গ্যাসের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ডিজিটাল মডেল ব্যবহার, এমন নানা ধরনের গবেষণা হয়েছে এই বিভাগে। শিক্ষকেরা বলছেন, বর্তমান জ্বালানিসংকটের সময় এই বিভাগের গ্র্যাজুয়েটরা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখছেন। অনেকে নতুন গ্যাস ও তেলক্ষেত্র অনুসন্ধানের কাজেও যুক্ত আছেন।

অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বললেন, ‘জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় আমরা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং এআইভিত্তিক সমাধান নিয়ে কাজ করছি, যেন দেশের জ্বালানি খাত নিরাপদ ও টেকসই হয়।’ আরেক অধ্যাপক সাইফুল আলম যোগ করেন, ‘শিক্ষার্থীদের আমরা শেখাই যে শুধু উত্তোলন নয়, টেকসই উন্নয়নই আসল চ্যালেঞ্জ।’

বিভাগের দেওয়া তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত ৪৫০ স্নাতক বের হয়েছেন। এর ৪০ শতাংশই বিদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, গবেষণা কিংবা কোম্পানিতে চাকরি করছেন। শেভরন এবং শ্লুমবার্জারের মতো আন্তর্জাতিক কোম্পানিতেও আছেন কেউ কেউ। দেশের ভেতর পেট্রোবাংলা, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড, বড়পুকুরিয়া কয়লা মাইনিং কোম্পানি কিংবা মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানিতে গেলেও শাবিপ্রবির জ্বালানি ও খনিপ্রকৌশল বিভাগের অ্যালামনাইদের দেখা পাবেন।

পেট্রোবাংলার উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) পরিদপ্তরের অধীনে ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত মো. তানভীর হাসান। তিনি বলেন, ‘শাবিপ্রবির এই বিভাগ আমাকে শুধু ডিগ্রি দেয়নি, বাস্তব দক্ষতা দিয়েছে। পুঁথিগত বিদ্যার সঙ্গে বাস্তবতার সরাসরি সংযোগ ঘটিয়েছে। পেট্রোবাংলায় কাজ করতে এসে বুঝেছি, আমাদের শিক্ষা আন্তর্জাতিক মানের। আমরা যখন দেশের বাইরে সেমিনার কিংবা ট্রেনিং প্রোগ্রামে যাই, তখন বিষয়টা আরও অনুধাবন করি।’

ইন্টার্নশিপের সুযোগও শিক্ষার্থীদের তৈরি হতে বড় ভূমিকা রাখে। গত বছর যেমন ১৮ জন শিক্ষার্থী সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডে এবং পাঁচজন বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিতে চার সপ্তাহের ইন্টার্নশিপ করেছেন। পেট্রোবাংলার সঙ্গে শাবিপ্রবির জ্বালানি ও খনিপ্রকৌশল বিভাগ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এতে শিক্ষার্থীরা আরও ভালো প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ পাচ্ছেন।

সিলেট গ্যাসফিল্ডের ব্যবস্থাপক, প্রকৌশলী মো. ফারুক হোসেন বলেন, ‘জ্বালানিসংকটের এ সময়ে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি সীমিত সুযোগের মধ্যেও দক্ষ জনশক্তি তৈরি করছে। আশা করি, জ্বালানিসংকট কাটাতে ভবিষ্যতে তারা আরও জোরালো ভূমিকা রাখবে।’

অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি সহায়তা এখনো সীমিত। তবে আধুনিক গবেষণাগার, যথেষ্ট অনুদান এবং শিল্প খাতের সঙ্গে আরও বড় সহযোগিতা দরকার। যদি সরকার এই সহায়তা দেয়, তাহলে আমাদের বিভাগ দেশের জ্বালানি খাতে আরও বেশি অবদান রাখতে পারবে।’