স্কুলজীবনে খালেদা জিয়ার চিঠি পেয়েছিলেন তাঁরা, কেমন ছিল সেই অভিজ্ঞতা
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর থেকেই ফেসবুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাঁর একটি চিঠি। একসময় ভালো রেজাল্ট করা শিক্ষার্থীদের এই চিঠি দেওয়া হতো। কেমন ছিল এই চিঠি পাওয়ার অভিজ্ঞতা, জানিয়েছেন কয়েকজন।
‘জাতির ভবিষ্যৎ’ বলে সম্বোধন করেছিলেন
নুসরাত নওশীন, ইনস্ট্রাক্টর, টেক্সটাইল প্রকৌশল বিভাগ, ন্যাশনাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, মানিকগঞ্জ
সময়টা ২০০৩ সাল। আমি তখন মানিকগঞ্জ জেলার সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী। অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হওয়ার পর জানলাম, আমি ২০০২ সালের পরীক্ষায় ‘ট্যালেন্টপুলে’ বৃত্তি পেয়েছি। একাডেমিক জীবনের প্রথম এই অর্জন নিয়ে বেশ ভীষণ আনন্দিত ছিলাম। কিন্তু আমার কিশোরী মনে সবচেয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছিল কিছুদিন পরের একটি ঘটনা।
একদিন আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক ডেকে পাঠালেন। জানালেন, আমরা যারা বৃত্তি পেয়েছি, আমাদের সবার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিশেষ উপহার পাঠিয়েছেন। আমার হাতে যখন সেই উপহারের প্যাকেটটি এল, সেই সময়ের রোমাঞ্চ আজও মনে আছে। প্যাকেটে ছিল তিনটি বই। সঙ্গে আমার নাম লেখা প্রধানমন্ত্রীর সেই বিশেষ চিঠি।
সেই বয়সে একজন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ব্যক্তিগতভাবে নাম উল্লেখ করা চিঠি পাওয়া ছিল স্বপ্নেরও বাইরে। মনে হচ্ছিল একটা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলাম। চিঠিতে তিনি আমাকে ‘জাতির ভবিষ্যৎ’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। প্রথমবারের মতো নিজের ওপর গভীর আত্মবিশ্বাস জন্মেছিল। মনে হচ্ছিল, দেশের অভিভাবক স্বয়ং আমার পড়াশোনার খবর রাখছেন, আমার ওপর আস্থা রাখছেন। সেই মুহূর্তে অনুভব করেছিলাম, আমাকে আরও বড় হতে হবে, দেশের জন্য নিজেকে যোগ্য করে তুলতে হবে।
হয়তো এই উৎসাহই পরে এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাই। সফলভাবে টেক্সটাইল প্রকৌশলে বিএসসি শেষ করি মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আজও যখন সযত্নে রাখা সেই বইগুলো আর প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরযুক্ত চিঠিটি হাতে নিই, ২০০৩ সালের মতো একই অনুপ্রেরণা অনুভব করি। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর দেওয়া উৎসাহ আমার মতো হাজারো শিক্ষার্থীর মধ্যে রয়ে যাবে।
বাবার কাছে এই উপহার ছিল গর্বের
জাহিদ সারোয়ার, সহকারী শিক্ষক, আনালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নওগাঁ
শিক্ষাজীবনের শুরু রাণীনগর ১ নং মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেই সময়ে পঞ্চম শ্রেণিতে প্রচলিত ছিল প্রতিযোগিতামূলক বৃত্তি পরীক্ষা। ২০০২ সালে সেই পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ‘ট্যালেন্টপুলে’ বৃত্তি পাই। সত্যি বলতে, সেই সময়ে বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সামাজিকভাবে অত্যন্ত মেধাবী হিসেবে মূল্যায়ন করা হতো, যা আমাদের মনে একধরনের আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি করত।
ঘটনাটি ২০০৩ সালের। খবর এল, প্রধান শিক্ষক ডেকে পাঠিয়েছেন। স্যারের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখলাম তাঁর মুখে একগাল হাসি। পরম স্নেহে বললেন, ‘তোরা তো বেশ ভাগ্যবান! স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী উপহার পাঠিয়েছেন।’
এলাকার বেশ কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তির উপস্থিতিতে স্যার আমার হাতে দুটি বই তুলে দেন। সেখানে বাবাও উপস্থিত ছিলেন। বইয়ের মলাট উল্টে যা দেখলাম, নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া স্বাক্ষরিত একটি ব্যক্তিগত শুভেচ্ছা বার্তা! মফস্সলের এক খুদে শিক্ষার্থীর কাছে এটি ছিল হাতে আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতো ঘটনা। বাসায় ফিরে কতবার যে স্বাক্ষরটি দেখেছি, তার হিসাব নেই। নিশ্চিত হতে চেয়েছিলাম, এটি কি সত্যিই প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর!
শুভেচ্ছা বার্তার কথাগুলো ছিল ভীষণ মমতায় ঘেরা। তিনি লিখেছিলেন, ‘তোমরাই জাতির ভবিষ্যৎ। নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলতে তুমি আরও মনোযোগী হয়ে লেখাপড়া করবে।’ বার্তার শেষ অংশে নিজেকে কেবল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং উপস্থাপন করেছিলেন আমাদের ‘আপনজন’ হিসেবে। বাবার কাছে এই উপহার ছিল এক বিশাল গর্বের বিষয়; তিনি আত্মীয়স্বজন সবাইকে এটি দেখাতেন।
আজও মাঝে মাঝে সেই বই দুটি আর চিঠিটি উল্টেপাল্টে দেখি। স্মৃতিটা যেমন আনন্দ দেয়, তেমনি মনে একরাশ প্রশ্নও জাগায়। ভাবি, কেন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে এমন চমৎকার একটি প্রতিযোগিতামূলক আয়োজন মুছে ফেলা হলো? আগামীর রাষ্ট্র পরিচালনায় যাঁরা আসবেন এবং যাঁরা আমাদের শিক্ষা নিয়ে ভাবেন, তাঁদের প্রতি সবিনয় অনুরোধ—শিক্ষাব্যবস্থায় এমন ইতিবাচক প্রতিযোগিতার ধারা যেন আবার ফিরিয়ে আনা হয়। কারণ, একটি মেধাভিত্তিক সমাজই আমাদের সুন্দর ভবিষ্যতের পথ দেখাতে পারে।
এটি আমার জীবনের অন্যতম শুদ্ধ আর শ্রেষ্ঠ এক অনুভূতি
ডা. সুমাইয়া সুলতানা, মাস্টার অব পাবলিক হেলথ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
২০০৩ সালের সেই দিনগুলোর স্মৃতি আজও ভিড় করে। তখন আমি পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সামনে আমার জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা—প্রাথমিক বৃত্তি। সেই পরীক্ষায় ভালো করার জন্য পরিবারের বড়রা কতশত উপহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু আমার মনের কোণে অন্য এক পুরস্কারের প্রতি তীব্র আকর্ষণ জমা ছিল—তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর চিঠি।
পরীক্ষা হলো, ফলাফলে ‘ট্যালেন্টপুলে’ বৃত্তি পেলাম। শুরু হলো কাঙ্ক্ষিত সেই উপহারের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা। একসময় সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটল, উপহারের প্যাকেট আমার হাতে এসে পৌঁছাল।
সেটা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি। সুন্দর একটি উপহারের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্যাডে সরাসরি আমার নাম সম্বোধন করে লেখা একটি চিঠি। সেই চিঠিতে স্নেহভরা সব সুন্দর সুন্দর কথা। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমার কাছে বিস্ময়কর ছিল প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর। কত শতবার যে সেই স্বাক্ষর ছুঁয়ে দেখেছি, হিসাব নেই।
ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া একটা ছোট্ট মেয়ের কাছে এই প্রাপ্তি যে কত বড় অনুপ্রেরণা হতে পারে, আজ বোঝানো কঠিন। বর্তমানে চিকিৎসক পেশার আমার যে দীর্ঘ পথচলা, তার পেছনে ছোটবেলার সেই চিঠি বড় আশীর্বাদ হিসেবে কাজ করেছে।