অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বন্ধুর পথে জাইমা
২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাত পৌনে ১২টা। শহীদ ওসমান হাদীকে নিয়ে প্রধান প্রতিবেদন তৈরি করছিলেন ডেইলি স্টার-এর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জাইমা ইসলাম। দ্বিতীয় এডিশনে সংবাদটি যাতে কোনোভাবে মিস না যায়।
এর মধ্যে খবর এল যে প্রথম আলোয় হামলা করেছে উগ্রবাদীরা। দ্রুত প্রতিবেদন জমা দিয়ে দোতলায় আসতে আসতে দেখেন নিচে ভাঙচুর চলছে। সে অবস্থায়ও মনোবল হারাননি জাইমা। অল্প কথায় ফেসবুকে তুলে ধরেছিলেন পরিস্থিতির ভয়াবহতা, ‘আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না। ভেতরে আটকা পড়েছি। চারপাশে প্রচুর ধোঁয়া। তোমরা আমাকে হত্যা করছ।’
দুই দশকের সাংবাদিকতায় নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখিই হতে হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলমের টাকা পাচার থেকে শুরু করে নিরাপত্তা বাহিনীর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছেন জাইমা। কিন্তু সে রাতের ঘটনা সবকিছুকেই ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তারপরও মনে কোনো ধরনের ক্ষোভকে প্রশ্রয় না দিয়ে এই হামলাটাকে অভিজ্ঞতার ঝুলিতে জমিয়ে রাখতে চান জাইমা, ‘তারাও তো আমাদের পাঠক। আমাদের তারা অপছন্দ করে। অপছন্দ করার অধিকার তাদের আছে।’
ঠিক কীভাবে বন্ধুর এ পথে পা রাখলেন, জানতে চাই জাইমার কাছে। ‘আমার কিন্তু ও রকম কোনো অনুপ্রেরণামূলক গল্প নেই। ১৫ বছর বয়সে ম্যাগাজিনে লেখালেখি শুরু করি।’ বলেন জাইমা। ‘তখন আমি স্কুলে পড়ি। স্কুল শেষ হলে বন্ধুরা বাইরে গিয়ে ঘোরাঘুরি করত। মা আমাকে গুনে গুনে শুধু রিকশাভাড়াটা দিত। সে কারণে লেখালেখি শুরু করি, যাতে হাতে কিছু পয়সা আসে। লিখতে আমার ভালো লাগত। স্কুল শেষ করে নিউ এজ অফিসে চলে যেতাম। লাইফস্টাইল আর্টিকেল লিখতাম।’
সানবিমস থেকে ও-এ লেভেল শেষ করে ২০০৯ সালে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর ওমেনে ভর্তি হন জাইমা। এখানে পড়ার সময়ে ডেইলি স্টার, বিশ্বব্যাংকসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ করেন। ২০১২ সালে ডেইলি স্টার পত্রিকায় তিন মাস ইন্টার্নশিপ করে পরের বছরই প্রতিবেদক হিসেবে যোগ দেন।
সাংবাদিকতা এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। নারীর জন্য পেশাটা আরও চ্যালেঞ্জিং। শুরুর দিকে চ্যালেঞ্জগুলো জাইমাকেও মোকাবিলা করতে হয়েছে। সেসব দিনের কথা স্মরণ করে জাইমা বলেন, যখন জুনিয়র ছিলাম, নারী হিসেবে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। পুলিশের লোকজন হ্যারাস করেছে। রাতের বেলা ফোন দিয়ে আজেবাজে কথা বলছে। এগুলো হ্যান্ডল করে এগিয়ে যেতে হয়েছে। মাঝেমধ্যে ঝুঁকিটা আবার আমার হয় না। আমার পারিপার্শ্বিক মানুষের হয়। আমার সোর্সদের হয়। খুব সিম্পল একটা স্টোরি করলাম, দেখা গেল আমার সোর্সকে বদলি করে দেওয়া হচ্ছে। ঝুঁকি মোকাবিলায় একজন প্রতিবেদকের সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভিজ্ঞতাও বাড়ে।
নিউজরুমে এখনো নারীর জন্য অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে বলে মনে করেন জাইমা। জাইমার অভিজ্ঞতায় নারীরা এখন যেটার মুখোমুখি হয় বেশি, সেটা হলো নিরাপত্তার কথা ভেবে তাদের রিপোর্টিংয়ে পাঠাতে চায় না সুপারভাইজাররা। ‘আমাকেও এটা ফেস করতে হয়েছিল।’ বলেন জাইমা। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘২০১৩ সালে ডিসেম্বরে ঢাকার গোপীবাগে মাঝরাতে একজন পীরকে খুন করা হয়েছিল। মাঝরাতে নিরাপত্তার কথা ভেবে আমাকে পাঠাতে চায়নি অফিস। কিন্তু আমি চ্যালেঞ্জ নিয়ে ঘটনাটি কাভার করতে মাঝরাতেই গিয়েছিলাম। অথবা তাদের আন্ডারএস্টিমেট করা হয়। এখন পর্যন্ত আমাদের নিউজরুমে যথেষ্ট নারী নাই।’
নিরাপত্তার স্বার্থে গুম নিয়ে করা জাইমার প্রতিবেদনে তার নাম ঊহ্য রাখে অফিস। জাইমা বলেন, ‘নাম দেওয়ার সিদ্ধান্ত আমার হাতে থাকলে আমি নাম দিতাম। আমি জেনেশুনে নাম দিতাম। প্রতিবেদন প্রকাশের পর আমার সঙ্গে এটা হতে পারে বা আমার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এটা হতে পারে জেনেও আমি নাম দিতাম। কারণ, আপনার কাজের পরিণাম কী হতে পারে, সেটা জেনেই আপনাকে কাজ করতে হবে, সেভাবে আপনার প্রস্তুতিও নিতে হবে।’
জাইমার ভাষায় ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। ভয় যদি প্রতিবেদককে নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে সে ভয় অতল গহ্বরের মতো তাকে টেনে নেবে।