দেশেই তৈরি হচ্ছে উন্নত এসি

এসির বাজার একটা সময় পুরোপুরি ছিল আমদানিনির্ভর। এই দৃশ্য বদলে যায় ২০০০ সালের দিকে। দেশে উৎপাদনের কারণে এসির দাম কমেছে। এতে মধ্যবিত্তের নাগালে এসেছে এই ঘর শীতল করার যন্ত্র

বাংলাদেশে এখন যেসব শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি বিক্রি হয়, তার বেশির ভাগই দেশে তৈরি অথবা সংযোজিত। বহুজাতিক ব্র্যান্ডগুলো এ দেশে যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে কারখানা করে এসি উৎপাদন করছে। বাংলাদেশি কয়েকটি ব্র্যান্ডও গড়ে উঠেছে, যারা বাজারে ভালো করছে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশে উৎপাদনের কারণে এসির দাম কমেছে। এতে মধ্যবিত্তের নাগালে এসেছে এই ঘর শীতল করার যন্ত্র। আবার কারখানায় কর্মসংস্থান হয়েছে।

দেশীয় ব্র্যান্ডের মধ্যে সুপরিচিত মিনিস্টার। মিনিস্টার মাইওয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক খান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা ‘মিনিস্টার’ ও ‘মাই ওয়ান’ নামের দুটি ব্র্যান্ডের এসি দেশে তৈরি করেন। প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি হওয়ায় এসির দাম অনেক কমেছে। মানও উন্নত হয়েছে। তিনি বলেন, তাঁরা এখন এসি রপ্তানির উদ্যোগও নিয়েছেন।

দেশে উৎপাদনের কারণে মধ্যবিত্তরা কিনতে পারছেন ঘর শীতল করার এই যন্ত্র
ছবি: সুমন ইউসুফ

উদ্যোক্তারা জানান, এসির বাজার একটা সময় পুরোপুরি ছিল আমদানিনির্ভর। জাপান, কোরিয়া ও তাইওয়ান থেকে বিদেশি ব্র্যান্ডের এসি আমদানি করা হতো। একটা সময় চীন থেকে এসি আমদানি শুরু হয়। চীনা এসি বাজারে দাম কমাতে ভূমিকা রাখে। অবস্থা বদলাতে থাকে ২০০০ সালের দিকে। আমদানিকারকদের অনেকেই চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে খুচরা যন্ত্রাংশ এনে দেশে সংযোজন করে এসি বাজারজাত করতে থাকে। ইতিমধ্যে দেশীয় কয়েকটি কোম্পানি দেশে ইলেকট্রনিক পণ্যের কারখানা করে। তাদের কেউ কেউ শুরুটা করেছিল রেফ্রিজারেটর দিয়ে। একসময় ওই সব কারখানায় এসি উৎপাদন ও সংযোজনের ব্যবস্থাও চালু হয়।

দেশে কারখানা করা উদ্যোক্তারা সরকারের নীতি সহায়তাও পেয়েছেন। তাঁরা বলছেন, দেশে তৈরি করলে যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক-কর কম লাগে। পুরো তৈরি অবস্থায় এসি আমদানি করলে খরচ অনেক বেশি পড়ে। তখন বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোও বাজারে কারখানা করতে মনোযোগী হয়। তাদের যারা পরিবেশক ছিল, সেসব কোম্পানির সঙ্গেই তারা দেশে এসি উৎপাদন
শুরু করে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সরকারি নীতির কারণে ইলেকট্রনিক পণ্যের কারখানা যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি গড়ে উঠেছে মোটরসাইকেল কারখানা। গাড়ির কারখানাও হচ্ছে।

দেশে এসি উৎপাদন করে এমন বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। পাশাপাশি দেশের সর্বত্র বিদ্যুৎ–সুবিধা পৌঁছে গেছে। দেশে উৎপাদনের কারণে এসির দাম কমেছে। এই তিন কারণে এসির বিক্রি বেড়েছে।

দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া গ্রী ব্র্যান্ডের এসি একসময় আমদানি হতো। এখন দেশেই তা তৈরি করে ইলেকট্রোমার্ট লিমিটেড। বাজারের বড় অংশের হিস্যা তাদের।

ইলেকট্রোমার্ট লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল আফসার প্রথম আলোকে বলেন, ২০০৫ সালের পর মূলত দেশে এসির চাহিদা বাড়তে থাকে। সবচেয়ে বেশি সম্প্রসারণ ঘটেছে ২০১৭ সাল থেকে। এ সময় দেশের সর্বত্র বিদ্যুৎ–সুবিধা পৌঁছে যায়। একই সঙ্গে এসিতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে এখন বিদ্যুৎখরচও কম হয়। তিনি জানান, ইনভার্টার প্রযুক্তিযুক্ত দেড় টন ক্ষমতার একটি এসি যদি দিনে গড়ে ৮–১০ ঘণ্টা চলে, তাহলে মাসে সর্বোচ্চ দেড় হাজার টাকার বিদ্যুৎ খরচ হবে (তবে বিদ্যুৎ খরচের বিষয়টি বিদ্যুতের দামের ওঠানামা বা ব্যবহৃত মোট ইউনিটের ওপরও অনেকটা নির্ভর করে কমবেশি হতে পারে)।

উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে এসিতে এখন বিদ্যুৎও লাগে কম
ছবি: সুমন ইউসুফ

নুরুল আফসার বলেন, আগে অনেকের ধারণা ছিল, এসি চালালে বহু টাকার বিদ্যুৎ বিল আসবে। সেই আশঙ্কা কেটে যাওয়ায় মানুষ এসি কিনতে আগ্রহী হয়েছে।

শহরাঞ্চলে গ্রীষ্মকালে গরম ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠছে। ফলে যাঁদের সংগতি আছে, তাঁরা চেষ্টা করছেন বাড়িতে এসি ব্যবহার করতে। একই কথা বললেন ইলেকট্রা ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক মো. সাহিদ আহম্মেদ আবদুল্লাহ। তাঁরা ‘ইলেকট্রা এসি’ উৎপাদন করেন। তিনি জানান, দেশি এসি আর বিদেশি এসির তুলনা করলে মানের দিক থেকে তফাত খুব বেশি কিছু নেই। কিন্তু দামে আকাশ-পাতাল তফাত। তা ছাড়া দেশি কোম্পানিগুলো মেরামত ও অন্যান্য যে সুবিধা দেয়, তা অন্যদের ক্ষেত্রে তেমন পাওয়া যায় না। এসব কারণেই দেশে এসির বাজার সম্প্রসারিত হয়েছে।