তরুণ জীবপ্রযুক্তিবিদদের নেটওয়ার্ক

সারা বছরই নানা আয়োজনে সরব থাকে এনওয়াইবিবিছবি: সংগঠনটির সৌজন্যে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের এক প্রান্তে কয়েকজন ব্যানার লাগাচ্ছেন, অন্যদিকে কেউ চেয়ার সাজাতে ব্যস্ত, কেউ এলইডি ডিসপ্লেতে তথ্যচিত্র চালিয়ে দেখছেন—সব ঠিকঠাক আছে কি না। কেউ আবার শেষবারের মতো পোস্টারের লেখা ও তথ্যগুলো মিলিয়ে নিচ্ছেন। চারদিকে ব্যস্ততা। ‘সিরিয়াস মুখ’ করে এদিক–ওদিক ঘুরঘুর করছেন শখানেক শিক্ষার্থী। তাঁরা নেটওয়ার্ক অব ইয়ং বায়োটেকনোলজিস্ট অব বাংলাদেশের (এনওয়াইবিবি) সদস্য।

এটি বাংলাদেশের তরুণ জীবপ্রযুক্তিবিদদের সংগঠন। প্রায় ১৫ হাজার সদস্যের এই নেটওয়ার্ক দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবপ্রযুক্তি শিক্ষার্থী ও তরুণ গবেষকদের এক করছে। বর্তমানে দেশের ২৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে তাদের স্টুডেন্ট চ্যাপটার।

সংগঠনের সদস্যরা গবেষণা করতে সহায়তা করেন। গবেষণা উপস্থাপন করেন। সম্মেলন আয়োজন করেন। জার্নাল ক্লাব করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য দিকনির্দেশনা দেন। প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করেন। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবপ্রযুক্তিপ্রেমীদের মধ্যে গড়ে তোলেন শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। সম্প্রতি যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সপ্তম আন্তর্জাতিক তরুণ জীবপ্রযুক্তিবিদ সম্মেলন ও ফিউচার বায়োটেকনোলজি সামিটের আয়োজন করেছিলেন তাঁরা। এতে উঠে এসেছে এমন

অনেক গবেষণা, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য, কৃষি ও জীবপ্রযুক্তির সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলে দিতে পারে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উপস্থাপন করেছেন তরুণ বয়সে ডায়াবেটিসের সঙ্গে সম্পর্কিত জেনেটিক পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা। আবার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেখিয়েছেন, উদ্ভিদের জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে কীভাবে নির্দিষ্ট এনজাইমের উৎপাদন বাড়ানো ও উদ্ভিদের কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য ও উৎপাদনশীলতা উন্নত করা সম্ভব। এই গবেষণাগুলো হয়তো আজই পৃথিবী বদলে দিচ্ছে না, কিন্তু এগুলো ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করছে।

তরুণ গবেষকদের স্বীকৃতি দেওয়াও সংগঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। অনূর্ধ্ব ৪০ বছর বয়সী জীবপ্রযুক্তিবিদদের স্বীকৃতি দিতে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সম্মাননা দেয় তারা। দেশ ও দেশের বাইরে কর্মরত বাংলাদেশি জীবপ্রযুক্তিবিদ ও নারী জীবপ্রযুক্তিবিদদেরও দেওয়া হয় বিশেষ স্বীকৃতি।

সংগঠনটির আন্তর্জাতিক শাখার তত্ত্বাবধায়ক আবদুল মহীন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজার ফার্মাসিউটিক্যালসে বিজ্ঞানী হিসেবে যুক্ত আছেন। তিনি বলেন, ‘এই সংগঠনের সুবাদেই আমি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশি জীবপ্রযুক্তিবিদদের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরেছি। পিএইচডি আবেদনের পর যুক্তরাষ্ট্রে সুযোগ পাওয়া ও পরে চাকরির ক্ষেত্রেও সংগঠনের বিশাল নেটওয়ার্ক বেশ সাহায্য করেছে।’

সংগঠনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আদনান মান্নান বলেন, এনওয়াইবিবির অন্যতম বড় সাফল্য হলো চট্টগ্রামের একজন শিক্ষার্থী খুলনার আরেকজন শিক্ষার্থীকে যেমন চিনতে পারছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় থাকা বাংলাদেশি জীবপ্রযুক্তিবিদদের সঙ্গেও যুক্ত হতে পারছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা জীবপ্রযুক্তিবিদদের এই নেটওয়ার্ক পারস্পরিক যোগাযোগ, মেলবন্ধন ও সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করছে।

২০০৬ সালে রাষ্ট্রীয় পদক পাওয়া প্রয়াত বিজ্ঞানী অধ্যাপক আহমদ শামসুল ইসলাম, বিজ্ঞান সংগঠক মুনির হাসান এবং সে সময়ের তরুণ গবেষক মুশতাক ইবনে আয়ুব, আদনান মান্নান ও এস এম মাহবুবুর রশিদের উদ্যোগে এনওয়াইবিবির যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেই ছোট্ট উদ্যোগ আজ দেশের ২৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিস্তৃত হয়েছে। সদস্যসংখ্যা ১৪ হাজার ছাড়িয়েছে, এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

তরুণদের কাছে সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার পৌঁছে দিতে সংগঠনটি আয়োজন করে নোবেল বিজ্ঞান বক্তৃতা। কারণ, জীবপ্রযুক্তি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে প্রতিদিনই নতুন কিছু আবিষ্কৃত হচ্ছে। আর এই দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। এনওয়াইবিবি বিশ্বাস করে, বাংলাদেশের জীবপ্রযুক্তির ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের অর্থনীতি। জড়িয়ে আছে স্বাস্থ্য, কৃষি, ওষুধশিল্প, খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ এবং একটি নতুন জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার সম্ভাবনা। আর সেই ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখেই তরুণ জীবপ্রযুক্তিবিদেরা কাজ করছেন।

সংগঠনটির সভাপতি অনিক সাহার ভাষায়, তরুণদের দক্ষতা ও মানোন্নয়নই তাঁদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তাই প্রতিটি আয়োজনেই তরুণদের অংশগ্রহণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এনওয়াইবিবির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের শিক্ষক মুশতাক ইবনে আয়ুব বলেন, ‘এনওয়াইবিবি প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশে জীবপ্রযুক্তি শিক্ষার বিকাশ ঘটানো, জীবপ্রযুক্তি সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করা এবং জীবপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা। একই সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও জীবপ্রযুক্তিবিষয়ক বিভিন্ন উদ্যোগ ও কর্মকাণ্ডে কার্যকর ভূমিকা রাখার লক্ষ্য ছিল। অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে।’