যে কাজটি করে মাত্র ১৪ দিনেই আরও আশাবাদী হয়ে উঠতে পারেন, বলছেন মনোবিজ্ঞানী
‘ওয়াশিংটন পোস্ট’–এ লেখাটি লিখেছেন কলাম লেখক ডানা মিলব্যাঙ্ক। লেখাটিতে লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থাকায় সেটি তাঁর ভাষাতেই প্রকাশিত হলো।
শীতকালকে জীবনের বেশির ভাগ সময়ই আমি এমন একটি ঋতু হিসেবে দেখেছি, যেটা কোনোভাবে কম্বল, ওভারকোট, সোয়েটারে চেপে পার করে দিতে হয়। যতটা সম্ভব ঘরের ভেতরে থেকে, জানালাটা খুলে কেবল বাইরে একটু উঁকি দিয়ে দেখে, আবার চট করে জানালা লাগিয়ে দিয়ে।
অপেক্ষা করতাম প্রথম ড্যাফোডিল ফুল ফোটার, যে সময় ঠান্ডা জ্বরের মৌসুম কমে আসে, দিন বড় হতে শুরু করে, আর আমিও যেন নিজস্ব ‘শীতনিদ্রা’ থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে পারি। কিন্তু এখন শীত পার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করি না; বরং শীত আমার কাছে হয়ে উঠেছে আশা পুনর্গঠনের ঋতু।
সম্প্রতি এক বন্ধুর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শেনানডোয়া ন্যাশনাল পার্কে হাঁটতে গিয়ে বিষয়টি নতুন করে উপলব্ধি করলাম। তীব্র ঠান্ডার মধ্যেও চারপাশের প্রকৃতি ছিল বিস্ময়কর সুন্দর। বরফে জমে থাকা ঝরনা, গাছের নিচে বরফের সূক্ষ্ম নকশা, শত শত বছরের পুরোনো গাছ, অরণ্যের মাটিতে জন্মানো ছোট ছোট উদ্ভিদ—সবকিছু যেন প্রকৃতির নিজস্ব এক গল্প বলছিল।
পুরোনো কেবিন, পাথরের দেয়াল, একটি পরিত্যক্ত কবরস্থান। এসব দেখতে দেখতে মনে হলো, এই জায়গায় আমার আগে কত মানুষ এসেছে, কত জীবন কেটে গেছে।
একসময় যারা এখানে বাস করত, তারা নেই; কিন্তু প্রকৃতি রয়ে গেছে। শত শত বছরের পুরোনো গাছগুলো আজও দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ মনে হলো, আমি একা নই; আমি অনেক বড় একটি সময় ও জীবনের ধারাবাহিকতার অংশ।
অরণ্য থেকে ফিরে আমার মনে হলো, পৃথিবীর সবকিছু নিয়ে হঠাৎ খুব আশাবাদী হয়ে যাইনি। কিন্তু হতাশার একটা অংশ যেন সরে গেছে। তার জায়গায় এসেছে নিজের দেশ ও পৃথিবীর জন্য কিছু করার নতুন ইচ্ছা।
গবেষণা কী বলছে?
একাধিক গবেষণায় প্রমাণিত, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো আমাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য উপকারী। প্রকৃতির বৈচিত্র্য মানসিক ক্লান্তি কমায়, আর তার বিশালতা আমাদের মধ্যে বিস্ময় ও গভীর সংযোগের অনুভূতি তৈরি করে।
বিশেষ করে প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ আশার অনুভূতি বাড়াতে পারে। এই আশা অবশ্য ‘সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে’ ধরনের সরল আশাবাদ নয়; বরং এটি হতাশার কাছে হার না মানার এবং নিজের লক্ষ্য পূরণে কিছু করার ক্ষমতা ও ইচ্ছা তৈরি করে।
কনকর্ডিয়া ইউনিভার্সিটি অব এডমন্টনের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হলি-অ্যান পাসমোর প্রকৃতির এই মানসিক উপকারিতা নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর তৈরি ‘নোটিশিং নেচার ইনভেনশন’ পদ্ধতিটি অত্যন্ত সহজ।
টানা ১৪ দিন প্রকৃতির অন্তত একটি বিষয় মন দিয়ে লক্ষ্য করতে হবে। একটি পাখি, গাছ, আকাশ, ফুল কিংবা সূর্যের আলো। এরপর সেই মুহূর্তে আপনার মনে কী অনুভূতি তৈরি হয়েছে, তা লিখে রাখতে হবে। দুই সপ্তাহে ১০টি পর্যবেক্ষণ করলেও ‘ইতিবাচক পার্থক্য তৈরি করার মতো উপযোগী’ উপকার পাওয়া যেতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই ১৪ দিনের অনুশীলন যাঁরা সম্পন্ন করেছেন, তাঁদের জীবন নিয়ে সন্তুষ্টির মাত্রা যাঁরা অনুশীলন করেননি, সেই দলের তুলনায় ৬৮ শতাংশ বেশি। আর গভীর ইতিবাচক অনুভূতির মাত্রা ৭৭ শতাংশ বেশি ছিল।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এর জন্য আপনাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রকৃতির মধ্যে থাকতে হবে না। জানালা দিয়ে আকাশ দেখা, একটি পাখির ডাক শোনা কিংবা ঘরের গাছটির দিকে মন দিয়ে তাকানোও যথেষ্ট হতে পারে।
প্রকৃতির সৌন্দর্য অনুভব করতে পারার জন্য বিশেষ কোনো ঋতুরও প্রয়োজন নেই। শীতেও প্রকৃতি একইভাবে আমাদের মন ভালো করতে পারে।
আমাদের চারপাশে যখন এত রাগ, হতাশা ও অনিশ্চয়তা, তখন প্রকৃতির দিকে তাকানোকে কেউ হয়তো তুচ্ছ মনে করতে পারেন। কিন্তু হতাশা আমাদের নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে। আর আশা আমাদের কিছু করার শক্তি দেয়।
তাই প্রতিদিন একটু সময় নিয়ে আকাশ দেখুন। পাখির ডাক শুনুন। গাছের পাতার দিকে তাকান। সূর্যাস্তের রং খেয়াল করুন। তারপর নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন, ‘এই মুহূর্তে আমি কী অনুভব করছি?’
হয়তো মাত্র ১৪ দিনের এই ছোট্ট অভ্যাসই আপনাকে পৃথিবীকে নতুন চোখে দেখতে শেখাবে এবং নিজের ভেতরেও ফিরিয়ে আনবে একটু আশা।
সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট