বাবার পেনশনের ছয় হাজার টাকায় সংসার সামলেছেন মা

default-image

সোমাশ্রী চাকমা, রাঙামাটি

আমাদের তিনজনের পরিবার। মা, বড় ভাই আর আমি। আট বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছি। স্ট্রোকের পর প্রায় ২২ মাস পক্ষাঘাতগ্রস্ত থেকে বাবা আমাদের ছেড়ে গিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক। তাঁর পেনশনের টাকায় মা কীভাবে সংসার সামলেছেন, জানি না। আমার জানামতে, টাকার অঙ্কটা মাসে ছয় হাজারের মতো। বাবা মারা যাওয়ার আগে আমার ভাইকে শ্রীলঙ্কা পাঠাতে পেরেছিলেন। বৃত্তিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছিল বলে তাঁকে কোনো টাকা পাঠাতে হয় না। কিন্তু আমার পড়ালেখার খরচ জোগাতে মাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। এখন মা একটু নিশ্চিন্ত। ছেলেমেয়ের পড়ালেখার খরচ নিয়ে তাঁকে আর ভাবতে হবে না। ধন্যবাদ প্রথম আলোকে। এই বৃত্তির টাকা জমিয়ে আমি মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে পারব।

বাগানের প্রত্যেকটা মেয়ে যেন ‘লিপি’ হতে পারে

default-image

লিপি শীল, শ্রীমঙ্গল

আমি চা–বাগানের মেয়ে। বাগানের নাম টিপরাছড়া। এই ছোট্ট বাগানে আমিই প্রথম মেয়ে, যে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছি। এখানে প্রায় সবাই চা-বাগানের ১২০ টাকা মজুরিতে সংসার চালান। আমাদের তা-ও নেই। বাবা বাগানে একটা মুদির দোকান দিয়েছিলেন, এটাই সম্বল। বাবা অসুস্থ হওয়ার পর ভাইয়া তাঁর পড়াশোনার পাশাপাশি দোকানের হাল ধরেছে। তবু সংসার চালাতে খুব কষ্ট হতো। ভাগ্যিস, আমি কলেজ থেকে উপবৃত্তি পেয়েছিলাম। উপবৃত্তির টাকায় সেলাই মেশিন কিনেছি। বাগানের মানুষের জামা সেলাই করে যা আয় হতো, সেটা দিয়ে কলেজের পড়ালেখার খরচ মিটিয়েছি। এখন আমার স্বপ্ন, আমাদের বাগানের প্রত্যেকটা মেয়ে যেন ‘লিপি’ হতে পারে, সবাই যেন উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান। আমি সে লক্ষ্যে কাজ করব।

একটা লাল গাড়ির স্বপ্ন

default-image

রুনা আক্তার, ঢাকা

ছয় বছর বয়সে বাবা মারা যান। আগেই মায়ের সঙ্গে বাবার বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল। আমরা দুই ভাই–বোন বাবার কাছে থাকতাম। বাবাকে হারিয়ে তাই আমাদের কোথাও ঠাঁই হচ্ছিল না। শেষে আমাকে এক আত্মীয়ের বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। শর্ত ছিল, বিনিময়ে সেই বাড়ির টুকটাক কাজ করে দেব। বাড়ির ছোট ছেলেটাকে দেখেশুনে রাখব, ওর সঙ্গেই স্কুলে যাব। কবে স্কুলে ভর্তি হব, সেই আশায় দিন গুনছিলাম। কিন্তু এক দিন রোজার সময়, ইফতারের জন্য কিছু জিনিস কিনতে আমাকে নিচে পাঠান দাদি। আমি টাকাটা হারিয়ে ফেলি। তখন আমাকে মেরে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়।

মনে আছে বৃষ্টি পড়ছিল। ছোট্ট আমি একা একা রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদছিলাম। এক ভদ্রলোক আমাকে তুলে এনে এক শিক্ষিকার বাসায় আশ্রয় দেন। পরে নিয়ে যান পথশিশুদের উন্নয়নে কাজ করে, এমন একটি এনজিওর আশ্রয়কেন্দ্রে।

সেখান থেকে কীভাবে এতটা পথ পাড়ি দিয়ে এইউডব্লিউ পর্যন্ত পৌঁছেছি, পেছনে ফিরে ভাবলে আমার নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য লাগে। বাবা বলতেন, ‘তুমি পড়ালেখা করলে এক দিন আমাদের জন্য একটা লাল গাড়ি কিনতে পারবে। আমরা গাড়িতে করে ঘুরব।’ স্বপ্ন দেখি, এক দিন সত্যিই আমি সেই লাল গাড়ি কিনব। আর বাবার মতো করে সবাইকে স্বপ্ন দেখাব।

বাবার আয় ১২০ টাকা, কলেজে যাওয়া-আসার ভাড়া ১০০ টাকা

default-image

ঈশিতা গোয়ালা, মৌলভীবাজার

সিলেটের ছোট্ট কেজুরীছড়া চা–বাগান থেকে আমার উঠে আসা। বাবার ১২০ টাকা মজুরিতে মা-বাবা-দাদি-দুই ছোট বোন, ভাইকে নিয়ে আমাদের সাতজনের সংসার চলেছে। আপনারা জানেন, কিছুদিন আগে মজুরি বেড়ে ১৭০ টাকা হয়েছে। অথচ আমার কলেজে যাওয়া-আসার খরচই ছিল ১০০ টাকা। বাবার স্বল্প আয়ে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। আমি তাই সেলাইয়ের কাজ শিখেছি। কলেজে পড়ার সময় সেলাইয়ের কাজ করে যা আয় হতো, তা দিয়েই চলত। তবু প্রতিদিন কলেজে যাওয়া হতো না। এইউডব্লিউতে পড়ার সুযোগ পেয়ে বাবাকে কিছুটা হলেও নির্ভার করতে পেরেছি। আমার ছোট ‍দুই বোন এখনো পড়ালেখা করছে। আমাদের আরও অনেকটা পথ পাড়ি দেওয়া বাকি।

সবাই বলেছে, ‘এতগুলো মেয়েকে পড়ালেখা করিয়ে কী হবে?’

default-image

রিংকি ভৌমিক, হবিগঞ্জ

চার বোনের মধ্যে আমি বড়। বাবা একজন চা–শ্রমিক। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় মা আমাদের ফেলে অন্যত্র চলে যান। তখন মানুষের অনেক সমালোচনার শিকার হতে হয়েছে। লোকে বলেছে, ‘এতগুলো মেয়েকে পড়ালেখা করিয়ে কী হবে? সময় থাকতে বিয়ে দিয়ে দাও। নয়তো মায়ের মতো অঘটন ঘটাবে।’ খুব ভেঙে পড়েছিলাম আমরা। বড় মেয়ে হিসেবে দায়িত্ব, চাপ, সব এসে পড়ছিল আমার ওপর। তবু বাবার অনুপ্রেরণায় আমরা হাল ছাড়িনি। অনেক সংগ্রামের পর এইউডব্লিউতে পড়ার সুযোগ পেয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে ফুল ফ্রি বৃত্তি দেয়, কিন্তু হাত খরচের জন্যও তো কিছু টাকার দরকার। বাড়িতে টাকা চাইতে সংকোচ হয়। প্রথম আলো ও আইডিএলসির বৃত্তি পাওয়ায় এখন আমি আমার খরচ বহন করতে পারব।

গণস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে চাই

default-image

শিল্পী কৈরী, মৌলভীবাজার

খুব ইচ্ছে ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কোচিং করব, নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নেব। কিন্তু কোচিং করার মতো টাকা আমাদের ছিল না। খুব অসহায় লাগছিল তখন। ভেবেছিলাম ভালো কোথাও পড়ার সুযোগ হয়তো আর হবে না। আমার সৌভাগ্য, এখন এইউডব্লিউতে পড়তে পারছি। অনেক কষ্ট করে এত দূর পড়ালেখা করেছি। বাড়ি থেকে কলেজে যেতে অটোরিকশার ভাড়াই লাগত ৪০ টাকা। আমার চা–শ্রমিক বাবা কীভাবে এত টাকা দেবেন? তার ওপর বিজ্ঞানের ছাত্রী ছিলাম। রসায়ন, উচ্চতর গণিতের মতো বিষয়গুলো প্রাইভেট তো পড়তেই হতো। আমার অবস্থা বুঝে শিক্ষকেরা আমার কাছ থেকে কম টাকা নিতেন। গণস্বাস্থ্য নিয়ে পড়ালেখা করে আমাদের এলাকায় কাজ করতে চাই।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন