জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বেকারত্ব নিয়েও গবেষণা করেছেন তাহরিন তাহরীমা চৌধুরী
বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখা সম্ভাবনাময় তরুণদের নিয়ে প্রতি বৈশাখেই বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দেও ক্রীড়া, অভিনয়, সংগীত, ব্যবসা, গবেষণায় অগ্রগামী ৭ তরুণকে নিয়ে হাজির হয়েছে। এখানে পড়ুন অর্থনীতিবিদ তাহরিন তাহরীমা চৌধুরীর গল্প।
গবেষণার বিস্তৃত ভুবনে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন তাহরিন তাহরীমা চৌধুরী। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এই গবেষণা ফেলো বর্তমানে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) অ্যাগ্রিকালচারাল ট্রান্সফরমেশন প্রোগ্রামে উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ হিসেবে কাজ করছেন। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তাঁর গবেষণাকে দিয়েছে বাস্তবতার স্পর্শ, গভীরতা এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গি।
ঢাকায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা তাহরিন ২০০২ সালে ভিকারুননিসা নূন স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। জানালেন, ‘সেবার এসএসসিতে সারা দেশে যে চারজন মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ ফাইভ পায়, একমাত্র নারী শিক্ষার্থী
ছিলাম আমি।’
এই কৃতিত্ব তাঁকে জাতীয় পত্রিকার শিরোনামে নিয়ে আসে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে নৈশভোজেও অংশ নেন। তখন সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘বড় হয়ে ব্যারিস্টার হতে চাই।’ কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যায় সেই লক্ষ্য। উচ্চমাধ্যমিকে উঠে অর্থনীতির প্রতি আগ্রহ বাড়ে, আর সেখান থেকেই নির্ধারিত হয়ে যায় ভবিষ্যৎ পথ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ার ক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল গণিত। মানবিক বিভাগ থেকে অর্থনীতি পড়তে আসা সব শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রেই কথাটি সত্য। ফলে অর্থনীতি বিভাগে প্রথম বছরটা ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং, কিন্তু অধ্যবসায় আর পরিশ্রমের মাধ্যমে সেই বাধা অতিক্রম করেন। শেষ পর্যন্ত স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে অর্জন করেন প্রথম শ্রেণি; স্নাতকোত্তরে অর্জন করেন তৃতীয় স্থান।
পড়াশোনা শেষে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা দিয়ে পেশাজীবন শুরু। দ্রুতই গবেষণার জগতে ঢুকে পড়েন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যোগ দেন গবেষক হিসেবে। শুরুতে গবেষণা তাঁর কাছে ছিল নতুন এক জগৎ। তাঁর ভাষায়, ‘সাঁতার না জেনেই পানিতে নেমে সাঁতার শেখার মতো’ অভিজ্ঞতা। তবে সিনিয়র গবেষকদের তত্ত্বাবধানে কাজ করতে করতে ধীরে ধীরে রপ্ত করেন গবেষণার নানা দিক।
তাহরিনের গবেষণার ভুবন বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক। এর মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বেকারত্ব নিয়ে গবেষণাটি বেশ আলোচিত হয়। এই গবেষণায় জানা যায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করা প্রায় ৬৬ শতাংশ শিক্ষার্থী আংশিক বেকারত্বের (আন্ডার এমপ্লয়েড) শিকার। তাঁরা পছন্দমতো কাজ পান না। অর্থাৎ তাঁরা টিউশনি, কল সেন্টার বা কোচিংয়ে ক্লাস নেওয়ার মতো কাজ করেন; পূর্ণকালীন কাজের (ফুলটাইম) সঙ্গে যুক্ত নন।
বিআইডিএসের তৎকালীন মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরীর তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিমাপ পদ্ধতি নিয়ে তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ভিত্তিতে পদ্ধতিগত কিছু সংস্কার করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি খাত, দক্ষতা ঘাটতি—বিভিন্ন বিষয়ে কাজ তাঁকে এনে দেয় আলাদা স্বীকৃতি। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে তিনি জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করেন।
আন্তর্জাতিক পরিসরেও রয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি। ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের (আইআইএসডি) সঙ্গে বাংলাদেশে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর গবেষণাপত্র কানাডিয়ান ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশন ও ওয়েস্টার্ন ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশন ইন্টারন্যাশনালের মতো আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থাপিত হয়েছে, হয়েছে প্রশংসিত।
এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিয়ে জাতিসংঘের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কমিশনের (ইউএনএসকাপ) সঙ্গে এককভাবে কাজ করেছেন। ২০২০ থেকে ২০২২ পর্যন্ত কোভিড-১৯–এর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও তাঁর একাধিক গবেষণা আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়। এসব কাজ তিনি আমেরিকান ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের সম্মেলনেও উপস্থাপন করেন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব বিশ্লেষণে ২০২৩ সালে ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ইফপ্রি) সঙ্গে কাজ করেছেন তাহরিন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে তাঁর গবেষণাগুলো দেশ-বিদেশে আলোচিত হয়েছে।
তাঁর এই পথচলায় ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জও ছিল। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও পারিবারিক কারণে সম্ভব হয়নি। পরে বিয়ে, বাবার অসুস্থতা, সন্তান—সব মিলিয়ে সেই স্বপ্ন আরও পিছিয়ে যায়। তবু থেমে থাকেননি। এখন আবার নতুন করে বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁর লক্ষ্য, বিদেশ থেকে পিএইচডি করে দেশে ফিরে গবেষণায় আরও বড় অবদান রাখা।