মুক্তিযুদ্ধে অ্যান এসেছিলেন ক্যামেরা কাঁধে

ফরাসি আলোকচিত্রী অ্যান ডি হেনিংয়ের তোলা ছবিগুলো মহান মুক্তিযুদ্ধের অসামান্য দলিল। সেই ছবিগুলো নিয়েই একক প্রদর্শনী চলছে রাজধানীর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। প্রদর্শনী উপলক্ষে ৫০ বছর পর বাংলাদেশ ঘুরে গেলেন অ্যান ডি হেনিং। বাংলাদেশ–দরদি আলোকচিত্রীর সাক্ষাৎ পেয়েছেন রাসেল মাহ্‌মুদ

ট্রাকে একজন মুক্তিযোদ্ধার পাশে অ্যান ডি হেনিং, ৮ এপ্রিল ১৯৭১
ছবি: সংগৃহীত

বসার ঘরটায় অ্যান ডি হেনিংয়ের অপেক্ষায় ছিলাম। বেসরকারি একটি টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন। সাক্ষাৎকার পর্ব শেষ হতেই হাসিমুখে এগিয়ে এলেন। সাদা শার্টের সঙ্গে কালো প্যান্ট পরা অ্যানের কাঁধে ক্যামেরা। ১৯ ডিসেম্বর সকালে এই বেশভূষায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসভবনে গিয়েছিলেন। সেদিনই প্যারিসের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন তিনি। ব্যস্ততায় সকালের পোশাকটা পরিবর্তনের সময় পাননি। তাই বিনীত হয়ে সময় চাইলেন।

১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় এসেছেন অ্যান ডি হেনিং। উঠেছেন ঢাকা আর্ট সামিটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি রাজীব সামদানির গুলশানের বাসায়। এই পরিবারের সঙ্গে অ্যানের হার্দিক সম্পর্ক। ছবির পেছনের মানুষকে খুঁজতে গিয়ে প্যারিসে তাঁকে আবিষ্কার করেন রাজীব। তারপর মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর ছবি নিয়ে প্রদর্শনীর ব্যবস্থাও করেন। সে প্রসঙ্গ ধরেই অ্যানের সঙ্গে আলাপ শুরু হলো। 

৭৫ পেরোনো অ্যান ডি হেনিং বাংলাদেশে এলেন ৫০ বছর পর। জানতে চাই, এত দিন পর এসে কেমন দেখলেন বাংলাদেশ? অ্যান বললেন, ‘অনেক কিছু বদলে গেছে। একদিকে আমি বুড়িয়ে গেছি, শরীরটা অনেক দুর্বল হয়ে গেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ বেশ তরুণ ও ঝকঝকে হয়ে উঠেছে।’

ফরাসি আলোকচিত্রী অ্যান ডি হেনিং এখন
ছবি: রাসেল মাহ্‌মুদ

অ্যানের তোলা মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর ছবি নিয়ে ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী ‘উইটনেসিং হিস্ট্রি ইন দ্য মেকিং: ফটোগ্রাফস বাই অ্যান ডি হেনিং’। প্রদর্শনীতএত বছর পর নিজের তোলা ছবিগুলো দেখে ভালো লাগার কথা জানান উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে, ‘এসব ছবি বিখ্যাত গিমে জাদুঘরে প্রদর্শিত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রদর্শনী আমার জন্য একেবারে বিশেষ একটা ব্যাপার। কারণ, এটা অন্য রকম একটা সময়।’

মহান বিজয় দিবসে জাতীয় সংসদ ভবনে বেড়াতে গিয়েছিলেন অ্যান। সেখানেও এক অন্যরকম অনুভূতি হয়েছে তাঁর। অ্যান বলেন, ‘নানা বয়সী মানুষের ভিড় দেখলাম সংসদ ভবন এলাকায়। মানুষ পতাকার সঙ্গে মিলিয়ে লাল-সবুজ পোশাক পরেছে, মেয়েরা মাথায় ফুলের টায়রা পরেছে। সবাইকে অপূর্ব লাগছিল।’

কথায় কথায় ডুব দিলাম মহান মুক্তিযুদ্ধে। যে সময় তরুণ অ্যান এসেছিলেন বাংলাদেশে। ছবি তুলে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের খবর।

রাইফেল কাঁধে কুষ্টিয়ার এই বীর মুক্তিযোদ্ধার ছবিটি অ্যান ডি হেনিংয়ের তোলা

অ্যানের একাত্তর

১৯৭১ সাল। অ্যান ডি হেনিং তখন নেপালে। সে সময় তিনি জানতে পারেন, নিরীহ বাঙালির ওপর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে পাকিস্তানি সৈন্যরা। আরও জানতে পারেন, পাকিস্তান সরকার সাংবাদিকদের পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। দ্রুত কলকাতায় চলে আসেন এই ফরাসি আলোকচিত্রী। সেখানে তিন সহকর্মী আলোকচিত্রী মিশেল লেন্ট, অ্যাসোসিয়েট প্রেসের (এপি) সংবাদদাতা ডেনিস নিল্ড ও কলম্বিয়া ব্রডকাস্টিং সিস্টেমের (সিবিএস) সংবাদদাতা প্যাট্রিক ফরেস্টের সঙ্গে দেখা করেন। তারপর তাঁরা সীমান্ত পেরিয়ে প্রবেশ করেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। সেখান থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতায় পৌঁছান কুষ্টিয়ায়। অ্যানের স্মৃতিতে দিনগুলো এখনো উজ্জ্বল—‘আমরা কজন সাংবাদিক মুক্তিযোদ্ধাদের একটি জিপগাড়িতে করে কুষ্টিয়ায় পৌঁছাই। তখনকার পরিস্থিতি নিজ চোখে দেখি এবং ছবি তুলি।’

মুক্তিবাহিনীর কাছ থেকে বাংলাদেশের পতাকা সংবলিত একটা ব্যাজ পেয়েছিলেন অ্যান। সেটি বুকপকেটে লাগিয়ে ছবি তুলে বেড়িয়েছেন কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ী অঞ্চলে। নতুন দেশের স্বপ্ন নিজের করে পেতে মানুষের দুর্ভোগ ও সংগ্রাম নিজ চোখে দেখেছেন অ্যান। কুষ্টিয়ায় ফ্রেমবন্দী করেছেন রাইফেল কাঁধে খালি গায়ে এক তরুণ যোদ্ধাকে। যে ছবি বছর দুয়েক আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এ ছাড়া কুমারখালী থেকে শরণার্থী–ট্রেনে ওঠা পরিবার, গরুর গাড়িতে করে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে চলা মানুষসহ যুদ্ধকালের নানা ছবি তোলেন তিনি। যার মধ্যে একটি ছবিতে দেখা যায়, মানচিত্র সংবলিত বাংলাদেশের পতাকা তুলে ধরেছেন একদল মানুষ।

অ্যানের এসব ছবি এখন মহান মুক্তিযুদ্ধের অনন্য দলিল।

আলোকচিত্রী অ্যান ডি হেনিংকে বাংলাদেশের পতাকা দেখাচ্ছেন কয়েকজন সাধারণ মানুষ। ৮ এপ্রিল ১৯৭১

বঙ্গবন্ধুকে দেখতে

১৯৭২ সালের এপ্রিল। অ্যান তখন কলকাতায় থাকেন। জানতে পারেন, আওয়ামী লীগের প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সেই সম্মেলনে যোগ দিতে ছুটে আসেন তিনি। স্বাধীন বাংলাদেশে সেবারই তাঁর প্রথম আগমন।

তবে সম্মেলনের জন্য নয়, অ্যানের মূল উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুকে একনজর দেখা। যাঁর কথা হৃদয়ে ধারণ করে ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে লাখো বাঙালি, তিনি কেমন? এই প্রশ্নের উত্তর চাক্ষুষ করতেই অ্যান চলে আসেন স্বাধীন বাংলাদেশে। সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর ছবি তোলেন। সে সময়ের কথা মনে করে বলছিলেন, ‘সেদিন মঞ্চে খুব নির্ভার শেখ মুজিবকে দেখলাম। পানি খাচ্ছেন, পাইপ টানছেন আর খাতায় নোট নিচ্ছেন।’

১৯৭২ সালে অ্যান আওয়ামী লীগের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর যেসব ছবি তোলেন, তা নষ্ট করে ফেলে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা। কিন্তু এমন বিখ্যাত একজন নেতার চিহ্ন মুছে ফেলা এত সহজ নয়।

স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের প্রথম সম্মেলনে নোট নিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই ছবি তুলেছিলেন ফরাসি আলোকচিত্রী অ্যান ডি হেনিং। ছবিটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রদর্শনী থেকে তোলা

যেখানে নিষেধাজ্ঞা, সেখানেই অ্যান

ফরাসি মুক্তমনা এক পরিবারে অ্যান ডি হেনিংয়ের জন্ম। মা-বাবা কখনো তাঁর ওপর নিজেদের চাওয়া চাপিয়ে দেননি। বিশেষ করে মায়ের কাছ থেকে বিপুল উৎসাহ পেয়েছেন। কিশোরীকাল পর্যন্ত অ্যানদের বাড়িতে টেলিভিশন ছিল না। ম্যাগাজিন দেখে দেখে ছবি তোলার শখ মাথায় উঁকি দেয়। ২৩ বছর বয়সে শুরু করেন আলোকচিত্র সাংবাদিকতা।

দিন দিন অ্যান হয়ে ওঠেন একজন দুঃসাহসী আলোকচিত্রী। ভিয়েতনাম যুদ্ধের ছবি তুলেছিলেন মার্কিন সেনাদের পায়ে-পায়ে ঘুরে। ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলপথ হয়ে দুর্গম জঙ্গল, বরফাচ্ছাদিত বৈকাল হ্রদ পেরিয়ে সেখানে পৌঁছাতে হয়েছিল তাঁকে। এরপর পৃথিবীর বহু দেশ ঘুরেছেন। শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বিভিন্ন সংঘাতময় বিভিন্ন অঞ্চলে ছবি তুলেছেন। ছবি তুলেছেন অনেক জাতির মানুষের সঙ্গে মিশে।

অ্যান ডি হেনিং এখন থাকেন ফ্রান্সের প্যারিসে। ঢাকা ছেড়ে সেদিনই চলে যাবেন। বিদায় নেওয়ার সময় দুজনই হাত বাড়াই। চকিত আমি তাঁর তর্জনীর দিকে তাকাই। ১৯৭১ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধারা তর্জনী দিয়ে বন্দুকের ট্রিগারে চাপ দিয়েছেন, আর অ্যান ডি হেনিংয়ের তর্জনী চাপ দিয়েছে ক্যামেরার বোতাম!