নিজেই বক্স ক্যামেরা বানিয়ে বদলে যাওয়া ঢাকার ছবি তুলেছেন এই আলোকচিত্রী

ছবিতে ছবিতে দ্রুত বদলে যাওয়া ঢাকাকে তুলে ধরেছেন আলোকচিত্রী তূর্য্য মুশফিক। ‘লিভিং রুইনস’ নামের এই সিরিজের ছবিগুলো তোলার জন্য তিনি ব্যবহার করেছেন নিজের বানানো একটি বক্স ক্যামেরা। ডিজিটাল যুগে কেন এই ক্যামেরা, জানতে গিয়েছিলেন জাওয়াদুল আলম

নিজের বানানো বক্স ক্যামেরার সঙ্গে আলোকচিত্রী তূর্য্য মুশফিকছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

প্রদর্শনীতে ঢুকতেই বিশাল এক ছবিতে চোখ আটকে যায়। ছাদ থেকে নেমে ছবিটি প্রায় মেঝে ছুঁয়েছে। ছবির বিষয় একটি আমগাছ। কংক্রিটের মধ্যে তার টিকে থাকার সংগ্রাম।

পুরোনো একতলা একটি ঘরের পেছনে গাছটি জন্মেছিল। ঠিকমতো বেড়ে উঠতে পারলে একদিন হয়তো ফল দিত, ছড়াত ছায়া। কিন্তু গাছটির ওপর দিয়ে চলে গেছে উড়ালসড়ক। অযত্ন, আলোর অভাব আর কংক্রিটের চাপে গাছটির একাংশ মরতে বসেছে। তবু বেঁচে থাকার চেষ্টা থামেনি। একটু আলো-বাতাসের সুযোগ পেলেই অন্য দিক থেকে ডালপালা মেলেছে।

একটা বক্স ক্যামেরায় ছবিটি তুলেছেন তূর্য্য মুশফিক। একই ক্যামেরায় তোলা তাঁর ‘লিভিং রুইনস’ বা ‘জীর্ণ শহর’ সিরিজের ২২টি ছবি স্থান পেয়েছে ‘চেঞ্জিং গ্রাউন্ডস’ প্রদর্শনীতে। এতে যুক্তরাজ্যের শিল্পী জিলাহ বাউয়েসের ১৭টি ছবিও যৌথভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে। ১৭ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি আজ শেষ হবে। একই প্রদর্শনী যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামের একটি গ্যালারিতেও চলছে।

‘জীর্ণ শহর’

ঢাকার দিলু রোডে গত জুলাইয়ে অপরাজেয় আমগাছের ছবিটি তুলেছিলেন তূর্য্য মুশফিক। তাঁর কাছে গাছটি শুধু একটি গাছ নয়, যান্ত্রিক ঢাকার টিকে থাকা সাধারণ মানুষের প্রতীকও। তূর্য্য বলেন, আমগাছটির মতোই এই শহরের মানুষকেও প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়। জীবিকার তাগিদে অনেক মানুষ প্রিয়জনদের ছেড়ে ঢাকায় এসে বসতি গড়েন। বিপুলসংখ্যক মানুষের জায়গা করে দিতে গিয়ে শহরটিও হয়ে উঠেছে নিষ্প্রাণ। যানজট, দূষণ, সবুজের অভাব ও অপরিকল্পিত নগরায়ণে অতিষ্ঠ মানুষ। তবু দিনশেষে ক্লান্ত মানুষগুলোই সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন।

মার্চ থেকে ঢাকার বিভিন্ন অলিগলিতে ঘুরেছেন তূর্য্য। সঙ্গে ছিল নিজের বানানো বক্স ক্যামেরা। এই ক্যামেরায় ধারণ করেছেন শহরের মানুষের জীবন, দ্রুত বদলে যাওয়া নগর আর প্রাণপ্রকৃতির ওপর তার প্রভাব।

প্রদর্শনীতে অপরাজেয় আমগাছের ছবিটি
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

তূর্য্য নিজেও ঢাকার বাইরে থেকে আসা মানুষ। উন্নত জীবন ও জীবিকার আশায় ১৫ বছর আগে ঢাকায় এসেছিলেন। এক যুগের বেশি সময়ে দেখেছেন কীভাবে বেড়েছে শহরের জনসংখ্যা, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কংক্রিটের স্থাপনা। অন্যদিকে আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে সবুজ, হারিয়ে গেছে অনেক জলাশয়। সেখান থেকেই সিরিজটির নাম ‘জীর্ণ শহর’।

ঢাকার যে গল্প তূর্য্য বলতে চেয়েছেন, সেটি যেকোনো ক্যামেরা, এমনকি মুঠোফোনেও তোলা সম্ভব। তাহলে বক্স ক্যামেরা কেন?

তূর্য্য বলেন, ‘বক্স ক্যামেরা ব্যবহারের কিছু কারণ আছে। এই ক্যামেরার জন্য যে লেন্সটি বানিয়েছি, সেটি ছবিতে একধরনের ডিস্টর্টেড ভিশন তৈরি করে। আবার ছবি পেপারে তোলা, নেগেটিভ থেকে পজিটিভ করা, এরপর স্ক্যান করে ডিজিটাল রূপ দেওয়া কিংবা প্রিন্ট—এই পুরো প্রক্রিয়ায় ছবির মধ্যে যুক্ত হয় অনেক স্তর ও পরিবর্তন। অর্থাৎ ছবিটি একের পর এক কারিগরি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যায়।’

তাঁর কাজের পদ্ধতিতেও এই রূপান্তর গুরুত্বপূর্ণ। তূর্য্যর ভাষায়, শুধু ছবি তোলাকেই তিনি শিল্পের একমাত্র মাধ্যম মনে করেন না। কখনো ছবি তোলার পর তা দিয়ে কোলাজ তৈরি করেন, কখনো ছবি তোলার আগেই কোনো ভাস্কর্য বা অবয়ব তৈরি করে সেটিকে ক্যামেরায় ধারণ করেন। শরণার্থীদের নিয়ে করা তাঁর আগের কাজসহ বিভিন্ন শিল্পকর্মেও এমন রূপান্তর দেখা যায়। ‘বলা যায় এটা আমার কাজের একধরনের ব্যক্তিগত সিগনেচার,’ বলেন তূর্য্য।

তূর্য্যর বক্স ক্যামেরা দেখছেন একজন দর্শনার্থী
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

ক্যামেরার গল্প

ক্যামেরার সহজ ও আদি রূপগুলোর একটি বক্স ক্যামেরা। উনিশ শতকের শেষভাগে শুরু হয়েছিল এর ব্যবহার, ডিজিটাল ক্যামেরার যুগে এসে এটি প্রায় হারিয়েই গেছে। বছর দশেক আগে কৌতূহল থেকে এমন একটি বক্স ক্যামেরা বানিয়েছিলেন তূর্য্য। তখন তিনি পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী। পাঠশালার প্রয়াত শিক্ষক আনিসুর রহমান তাঁকে উৎসাহ দিয়েছিলেন। দৃকের একটি প্রদর্শনী থেকে ফেলে দেওয়া কাঠের বোর্ড দিয়ে ক্যামেরাটি বানিয়েছিলেন। তবে সেটি বাইরে নিয়ে কাজ করার উপযোগী ছিল না। ফলে পরে আর তেমন ব্যবহার করা হয়নি।

এ বছরের শুরুতে তূর্য্যর মাথায় আবার বক্স ক্যামেরা তৈরির চিন্তা আসে। মার্চে বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মীদের নিয়ে কাজে নেমে পড়েন। উপকরণ সংগ্রহ করতে তাঁকে ঢাকার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটতে হয়েছে। মোহাম্মদপুরের এক কাঠমিস্ত্রিকে সঙ্গে নিয়ে দিনরাত কাজ করে তৈরি করেন ক্যামেরার কাঠামো। পাটুয়াটুলীর একটি চশমার দোকানে কয়েক ধাপে তৈরি হয় লেন্স। চশমার কারিগরেরা এ ধরনের লেন্স তৈরিতে অভ্যস্ত নন। ফলে তাঁদের বুঝিয়ে প্রয়োজনমতো লেন্স তৈরি করাতে হয়েছে। এরপর হালকা ওজনের লেন্স হোল্ডার তৈরির জন্য একাধিকবার যেতে হয়েছে নবাবপুরের লেদের কারখানায়। সব মিলিয়ে ক্যামেরাটি তৈরি করতে সময় লেগেছে প্রায় এক মাস।

মজা করে তূর্য্য বলেন, ‘ঢাকা শহর নিয়ে আমাদের অনেক অভিযোগ। কিন্তু ঢাকার মতো এত কম খরচে এত উপকরণ এবং দক্ষ কারিগর পাওয়া যায় কি না, আমার জানা নেই। আমার ক্যামেরা তৈরির পেছনে ওই কারিগরদের অবদানও কোনো অংশে কম না।’

দৃক গ্যালারির প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীদের জন্য তূর্য্যর সেই বক্স ক্যামেরাটিও রাখা আছে। ক্যামেরার পেছনের অংশ খুলে দেখালেন ভেতরের ছোট্ট ডার্করুম। অর্থাৎ ছবি তোলার পর ক্যামেরার ভেতরেই ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ায় ফিল্ম ডেভেলপ করা যায়। ক্যামেরাটি বহনের জন্য রয়েছে একটি স্যুটকেস। বক্স ক্যামেরার আলো-আঁধারি উপস্থাপনার সঙ্গে সুহৃদ সামসের তৈরি আবহ সংগীতও প্রদর্শনীতে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।

ঢাকার বিভিন্ন অলিগলি ঘুরে তোলা তূর্য্যর ছবি
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

ছবি তোলার পাশাপাশি বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পাঠশালায় খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন তূর্য্য। কাজের ফাঁকে যখনই সময় পেয়েছেন, ক্যামেরাটি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন। কখনো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, কখনো পুরান ঢাকা, কখনো বাংলামোটর, আবার কখনো নিজের বাড়ির ছাদে ছবি তুলেছেন। সারা দিন ঘুরে বাড়ি ফিরে ফিল্ম ডেভেলপ ও ছবির প্রয়োজনীয় কাজগুলো করতেন। এ কাজে তাঁকে সহযোগিতা করেছেন সহধর্মিণী নিশাত জাহান।

তূর্য্য বলেন, তাঁর তৈরি ক্যামেরায় দিনের আলোতেই সবচেয়ে ভালো ছবি আসে। তাই সিরিজের সব ছবি সকাল থেকে সন্ধ্যার আগপর্যন্ত সময়ে তোলা। ঢাকার করুণ চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তুলতে সব ছবি সাদা–কালো করেছেন। ধীর শাটার গতিতে তোলায় ছবিগুলোতে তৈরি হয়েছে আলাদা এক আবহ।

ছবির গল্প

প্রদর্শনীর ছবিগুলোর পেছনের গল্প নিয়ে নিজের প্রকাশনী ‘লোক-আলো বুকস’ থেকে একটি বইও প্রকাশ করেছেন তূর্য্য। বইটির বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করেছেন তাঁর সহকর্মী ইমদাদুল হক।

তূর্য্য বলেন, ‘যেহেতু শিক্ষকতা করি, তাই ছবি তোলার পাশাপাশি গবেষণা ও লেখালেখিও আমাকে আকৃষ্ট করে। আমার মেন্টর ও আলোকচিত্রী সরকার প্রতীক এসব কাজে অনেক উৎসাহ দেন। বক্স ক্যামেরাটি বানানোর সময়ও তিনি পরামর্শ দিয়েছেন। ক্যামেরা তৈরির সময় প্রতিদিনের দিনলিপিও একটি ডায়েরিতে লিখে রেখেছি। ফলে কেউ এখন এ ধরনের ক্যামেরা বানাতে চাইলে আমার ডায়েরি থেকে সাহায্য নিতে পারবেন।’

প্রদর্শনীতে এসে অনেক আলোকচিত্রী ও শিক্ষার্থী বক্স ক্যামেরা তৈরির বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। বিষয়টি তূর্য্যকে অনুপ্রাণিত করেছে। নিজের তৈরি ক্যামেরাটি আরও উন্নত করার কথা ভাবছেন এখন। পাশাপাশি এই ক্যামেরায় রঙিন ছবি তোলার পরীক্ষাও করতে চান।

ছবি তোলা, শিক্ষকতা ও গবেষণার কাজ চলবে। তবে এসবের ভিড়েও তূর্য্য মুশফিকের স্বপ্ন—একদিন এমন একটি ঢাকার ছবি ফ্রেমবন্দী করবেন, যেখানে মানুষ প্রাণভরে শ্বাস নিতে পারবে, শিশুরা পাবে একটি মানবিক শহর, আর প্রকৃতি বেড়ে উঠবে নিজের মতো করে।