খাবার নিয়ে কনটেন্ট বানিয়ে তান্হা পেয়েছেন জার্মানির নিমন্ত্রণ
জার্মানির খাবার, সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা নিতে সাত দিনের এক বিশেষ সফরে গিয়েছিলেন তান্হা ইসলাম। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির এই স্নাতক মূলত খাবারদাবার ও ভ্রমণবিষয়ক কনটেন্ট তৈরি করেন। বার্লিনের রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে ব্ল্যাক ফরেস্টের স্থানীয় বাজার—নানা জায়গা ঘুরে তাঁর ঝুলিতে জমা হয়েছে নানা স্বাদ ও অভিজ্ঞতা। সেসব শুনতেই যোগাযোগ করি তান্হার সঙ্গে।
তান্হা খাবার নিয়ে কাজ করেন প্রায় ১০ বছর। এরই মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের খাবার ও সংস্কৃতির খোঁজে ১০টির বেশি দেশ ঘুরেছেন। ২০২৩ সালে টিকটকের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিভাগের আমন্ত্রণে নেপালেও গিয়েছিলেন। তবে জার্মানির এবারের সফরটি ছিল আলাদা। কারণ, শুধু নতুন খাবারের স্বাদ নেওয়াই নয়, খাবার কীভাবে একটি দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তা-ও জানার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
২০ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর ‘কালিনারি ট্রেন্ডস ইন জার্মানি’ শীর্ষক এই আয়োজন করে গ্যেটে ইনস্টিটিউট ও জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিশ্বের ১৫টি দেশ থেকে অংশ নেন ১৫ জন। তাঁদের মধ্যে ১০ জন রন্ধনশিল্পী। বাকিরা কনটেন্ট নির্মাতা, ফুড ফটোগ্রাফার ও খাবারবিষয়ক পেশাজীবী। বাংলাদেশ থেকে একমাত্র প্রতিনিধি ছিলেন তান্হা।
সফরের প্রায় তিন মাস আগে ফেসবুকে তান্হার সঙ্গে যোগাযোগ করে জার্মান দূতাবাস। কয়েক দফা প্রশ্নোত্তর পর্ব ও আলোচনার পর মেলে জার্মানির টিকিট।
বার্লিনে পৌঁছানোর পর প্রথম দিনের সন্ধ্যায় ঐতিহাসিক ক্ল্যারশেস বলহাউসের লুনা ডি’ওরো রেস্তোরাঁয় ছিল স্বাগত নৈশভোজ। জার্মানির আঞ্চলিক খাবারের বৈচিত্র্য তুলে ধরতে রন্ধনশিল্পী টোবি বেক তৈরি করেছিলেন নানা ধরনের পদ। সেসবের ইতিহাস ও তৈরির পদ্ধতিও তুলে ধরেন তিনি।
পরদিন গ্যেটে ইনস্টিটিউটে পরিচয়পর্বে অংশ নেন ১৫ অংশগ্রহণকারী। নিজ নিজ সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল বড় পর্দায় দেখিয়ে তাঁরা নিজেদের কাজ তুলে ধরেন, ভাগ করে নেন মজার সব অভিজ্ঞতা।
তান্হা বলছিলেন, ‘জার্মানির খাবার বুঝতে শুধু রেস্তোরাঁয় গেলেই হয় না। জানতে হয় মানুষ কোথা থেকে কী কিনছে, কোন খাবার বেছে নিচ্ছে।’ এ জন্যই অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে আয়োজন করা হয়েছিল বাজার ঘুরে দেখার পর্ব। কম দামের স্থানীয় বাজার, সাধারণ সুপারমার্কেট থেকে শুরু করে অভিজাত কাদেওয়ে শপিং সেন্টার—বিভিন্ন জায়গায় খাবার ও পণ্যের বৈচিত্র্য দেখেছেন আমন্ত্রিতরা।
সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বার্লিনের গাটোর এলাকার ভিয়ারফেল্ডারহফ জৈব খামার পরিদর্শন। সেখানে শস্য থেকে আটা তৈরি করে রুটি বানানোর কর্মশালায় অংশ নেন তাঁরা। জার্মানদের দৈনন্দিন খাবারে রুটির গুরুত্ব এবং সেই খাবার তৈরির পেছনের শ্রম সম্পর্কে কাছ থেকে জানার সুযোগ হয়েছে তান্হাদের। নিরামিষ ও উদ্ভিদনির্ভর খাবারের নানা ধরনও চেখে দেখেছেন তাঁরা।
জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সফরেও গিয়েছিল খাদ্যরসিকদের এই দল। রাষ্ট্রদূতদের জন্য যেভাবে খাবারদাবারের আয়োজন করা হয়, প্রায় একই কায়দায় আপ্যায়ন করা হয়েছে তান্হাদেরও। তিনি বলেন, ‘জার্মানরা মনে করেন, খাবার মানুষের চিন্তাভাবনা ও মনোজগতে প্রভাব ফেলে। তাই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভালো খাবার পরিবেশনের বিষয়টিকেও তাঁরা গুরুত্ব দেন। খাবার যে শুধু ক্ষুধা মেটানোর জন্য নয়, মানুষের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি ও আলোচনার পরিবেশ গড়ে তোলারও একটি মাধ্যম, এই সফরে তা নতুনভাবে বুঝেছি।’
বার্লিনে তিন দিন কাটানোর পর ট্রেনে করে ফ্রাইবুর্গের উদ্দেশে রওনা হন অংশগ্রহণকারীরা। বার্লিন ছিল ব্যস্ত ও প্রাণচঞ্চল, আর ফ্রাইবুর্গ অনেকটাই শান্ত, সরল ও মনোরম। শহরের আশপাশের মানুষের জীবনযাপন ও স্থানীয় খাবারের ব্যবস্থাও তান্হার নজর কেড়েছে।
ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক বানানোর কর্মশালায় অংশ নেওয়াকে বলা যায় সফরের এই অংশের ‘হাইলাইট’। তান্হা বলেন, ‘ব্ল্যাক ফরেস্ট আমার খুব পছন্দ। তবে জার্মানিতে গিয়ে বুঝলাম, দেশে আমরা যেই ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক খাই, সেটার সঙ্গে ওদের ব্ল্যাক ফরেস্টের স্বাদের কোনো মিল নেই। একেবারেই আলাদা।’
জার্মানির খাবারদাবারের সংস্কৃতি ও আতিথেয়তাই তুলে ধরতে চেয়েছিলেন আয়োজকেরা। তবে তান্হা ফিরেছেন আরও বড় শিক্ষা নিয়ে। সাত দিনের সফরে তিনি বুঝেছেন, একটা দেশের খাদ্যসংস্কৃতির যত্ন নিতে হলে স্থানীয় উৎপাদকদের গুরুত্ব দেওয়া, খাদ্যাভ্যাসে সচেতনতা, এসবও কতখানি জরুরি।