ছোটবেলার জন্মদিনে
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

ছেলেবেলায় আমার মাকে পুতুলের মতো লাগত। নানাবাড়ি যাওয়ার সময় গোসল করে এলোচুলে মা যখন নতুন শাড়ি পরত, হাত–পায়ে নেলপলিশ লাগাত, আমি তাকিয়ে থাকতাম। একটু বড় হওয়ার পর মাকে শাড়ি কম পরতে দেখেছি। তাই কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় মাকে শাড়ি পরার জন্য বায়না ধরে বসে থাকতাম। আমার সে বায়নার কাছে মা হেরে যেত। শেষমেশ শাড়ি পরত। আমি কুচিগুলো ঠিক করে দিতাম।

একটু বড় হতেই বাধল বিপত্তি। মা যেন কেমন বদলে যেতে থাকল। আমার সবকিছুতেই বিধিনিষেধ। খাওয়ার সময় শব্দ কেন হলো, হাঁটার সময় শব্দ কেন হলো, একটা কাজ ঠিকমতো করো না, কথা শোনো না, এত জেদ কেন—সবকিছুতে আমার দোষ খোঁজাই যেন তাঁর কাজ। তখন ভীষণ রাগ হতো। মাঝেমধ্যে ইচ্ছা হতো, বাড়ি থেকে পালিয়ে দূরে কোথাও চলে যাই। সত্যিই যদি চলে যাই তখন মা বুঝবে মজা।

একদিন এমন দিন সত্যিই চলে এল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। হলে থাকতে হবে।

বাবা আমাকে হলে পৌঁছে দিয়ে গেলেন। আমি হলে ঢুকলাম এবং প্রথমবারের মতো আবিষ্কার করলাম, আমি আমার পরিবার ছেড়ে দূরে চলে এসেছি। সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে প্রচণ্ড নিঃসঙ্গ মনে হতে শুরু করল। সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে কাঁদলাম সেদিন। এর ঠিক এক সপ্তাহ পর বাসায় গেলাম। দরজাটা খুলে ঢুকতেই দেখি মা সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো কথা হয়নি সেদিন। কোনো শব্দের ব্যবহার হয়নি। মা আর মেয়ে নয়, যেন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শুধু দুজন মানুষ। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে দুজনেই শুধু কাঁদলাম অনেকক্ষণ।

মায়ের সঙ্গে লেখক
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

আমি যেন আমার মাকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম। এ যেন নতুন কেউ, যাকে এত দিন দেখতে পাইনি। শুরু হলো মায়ের সঙ্গে আমার নতুন অধ্যায়।

মাত্র এক সপ্তাহের বিচ্ছিন্নতা আমাদের সম্পূর্ণ বদলে দিল। এরপর কখনোই আমাদের কোনো কিছু নিয়ে বিবাদ হয়নি। দুজন দুজনকে পরিষ্কার বুঝতে পারতাম। কোনো জবাবদিহি, কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতো না। প্রতি শুক্রবার সকালে আমার ফোন বেজে উঠত। ফোন ধরতেই মায়ের গলা, কখন বাসায় আসবা? সাধারণত যখন মায়ের মন ভালো থাকত তখন তুমি করে বলত। অবশ্য এরপর আর কখনোই তুমি ছাড়া কথা বলেনি। প্রায়ই ফোনে গল্প হতো। বিশেষ করে, পড়াশোনা শেষে যখন কর্মজীবন শুরু করলাম, তখন রোজ অফিস থেকে বের হয়ে মাকে কল দেওয়াটা আমার রুটিন হয়ে গিয়েছিল।

একটা বয়স পর্যন্ত বেশ বিধিনিষেধের মধ্যে বড় হয়েছি সত্যি, তবে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেই আমি স্বাধীনতার স্বাদ পুরোপুরি পেয়েছি। ‘এখন ঘুরতে যেতে হবে না, বিয়ের পর জামাইকে নিয়ে যেয়ো’—এমন কথা মা কোনো দিন আমাকে বলেনি। বরং নিজের পায়ে দাঁড়াতে, নিজের জীবনকে উপভোগ করতে বলেছে।

এখন বুঝতে পারি অবচেতনে মা আমাকে কীভাবে গড়ে দিয়েছে। মা বলত, কোনো কাজ ঠিকমতো করি না, এই কথাটা আমার যেকোনো কাজ ঠিকমতো শেষ করতে অনুপ্রাণিত করে। লোকের কথা শুনতে হবে, এই কথাই যেন কাজ শেষে লোকের প্রশংসা পেতে সাহায্য করে। ওই সময়গুলোয় আমার সব কাজে মা ভুল ধরত বলেই হয়তো এখন আমার কাজে অন্য কেউ এসে সহজে ভুল খুঁজে পায় না।

হুট করে একদিন কালোমেঘ এসে মাকে নিয়ে সাজানো আমার রঙিন গল্পের ডায়েরিটা ভিজিয়ে দিয়ে গেল। মা হারিয়ে গেল মেঘের দেশে। মেঘেদের দল, আমার মায়ের যত্ন নিয়ো।