ব্রাজিলের খেলা দেখবে বলে ঢাকা থেকে এসেছে বন্ধু আর তাঁর বাবাও
খুব ছোটবেলায় এক মাঝরাতে হইচই শুনে ঘুম ভেঙেছিল। আধো ঘুমে শুনেছিলাম, ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতেছে। আমাদের যৌথ পরিবারের মানুষের উচ্ছ্বাস আর উদ্যাপন তখন আমার কাছে ছিল এক বিস্ময়। ফুটবল বুঝতাম না, ভূগোলও না। তবু সেই রাত থেকেই হৃদয়ে গেঁথে যায় একটি নাম—ব্রাজিল। এরপর কেটে গেছে অনেক বছর, জীবনের নানা বাঁক পেরিয়েছি, কিন্তু হলুদ-সবুজ রঙে মাখামাখি পতাকার দেশটির নাম রয়ে গেছে একই জায়গায়।
১৪ জুন প্রথমবারের মতো স্টেডিয়ামে বসে ব্রাজিলের খেলা দেখতে যাচ্ছি। মিশিগান থেকে প্রায় ৬০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাব নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। যাওয়া-আসা মিলিয়ে প্রায় ২০ ঘণ্টা গাড়ি চালাতে হবে। সপ্তাহান্তের ৪৮ ঘণ্টার ছুটির বড় অংশই কেটে যাবে পথে। তবু যাচ্ছি—শৈশবের স্মৃতি আর বর্তমানের বাস্তবতাকে একসুতায় গাঁথতে। আমাদের প্রজন্মের কাছে ব্রাজিল মানে রোনালদো, রিভালদো আর রবার্তো কার্লোস। তাঁদেরই উত্তরসূরি নেইমার-ভিনিসিয়ুসদের খেলা সরাসরি মাঠে দেখা নিঃসন্দেহে বিশেষ এক অভিজ্ঞতা হবে।
ফুটবল গণমানুষের খেলা। তবে এবারের বিশ্বকাপে টিকিটের আকাশছোঁয়া মূল্য নিয়ে সমালোচনা কম নয়। একটি গ্রুপ পর্বের ম্যাচের ক্যাটাগরি-১ টিকিটের দাম প্রায় ১ হাজার ৫০০ ডলার। সবচেয়ে কম দামের টিকিটও এক হাজার ডলারের নিচে পাওয়া কঠিন। এমন মূল্য অনেক সমর্থকের নাগালের বাইরে। আমার স্ত্রী বিভা উপহার হিসেবে টিকিটটি কিনে দিয়েছেন। নইলে হয়তো এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতো না।
তবে ব্রাজিলের খেলা দেখার আনন্দকে ছাপিয়ে যাচ্ছে আরেকটি বিষয়। আমার বন্ধু অংকুর ওয়ারেস খান ও তাঁর বাবা খায়রুল খান বাংলাদেশ থেকে এসেছেন শুধু এই ম্যাচ দেখার জন্য। প্রায় এক যুগ পর তাঁদের সঙ্গে দেখা হবে। একসঙ্গে স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখব। তা–ও আবার ব্রাজিলের।
ঢাকার ৩২ নম্বর চামেলীবাগে তাঁদের বাসায় আমি একসময় ভাড়া থাকতাম। ২০১০ বিশ্বকাপের সময় সংস্কারের কাজের জন্য আমাদের ফ্ল্যাট ছেড়ে দিতে হয়েছিল। তখন অংকুর বলেছিল, ‘বিশ্বকাপটা আমাদের বাসায় থেকে দেখো।’
তাদের পরিবারে বিশ্বকাপ মানেই ছিল উৎসব। কাজিন, চাচা, বন্ধুরা মিলে রাত জেগে খেলা দেখা, আড্ডা আর উচ্ছ্বাস। সেই এক মাস আমি অংকুরের ঘরেই ছিলাম। অতিথি হিসেবে আমাকে নিজের বিছানা ছেড়ে দিয়েছিল সে। আর নিজে কখনো সোফায়, কখনো অন্য ঘরে মেঝেতে ঘুমিয়েছে। সেই বিশ্বকাপেই খায়রুল আঙ্কেল আমাকে উপহার দিয়েছিলেন ব্রাজিলের একটি জার্সি। আজও সেই স্মৃতি অমলিন।
অংকুর আমার পরম বন্ধু। একসঙ্গে কাটানো অসংখ্য স্মৃতি আমাদের। কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রে আসার পথে সে ফেসবুকে লিখেছে, ‘বিদেশ যাওয়া এর আগে কখনো এত উত্তেজনাকর মনে হয়নি।’
সে নিয়মিত কাজের সূত্রে বিভিন্ন দেশে যায়। যুক্তরাষ্ট্রে আসা নিয়ে তার এই উত্তেজনায় আমার অংশ কতটা, আর বিশ্বকাপের অংশ কতটা, তা আমি জানি না। তবে এটুকু জানি, প্রায় এক যুগ আগে আমার প্রবাসে আসার আগে শেষ রাতে বিমানবন্দরের পথে একটি ফ্লাইওভারের নিচে চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বিশালদেহী বন্ধু আমাকে জড়িয়ে ধরে ভেউ ভেউ করে কেঁদেছিল। সেই বন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়ার উত্তেজনা স্টেডিয়ামে বসে নেইমারদের খেলা দেখার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।