বই, ইউটিউব, কম্পিউটারে যাঁদের দেখেছি, তাঁদের কথাই শুনেছি সামনে বসে

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত পরমাণু বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় গবেষণা সংস্থা— ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ, সংক্ষেপে সার্ন। এই সার্নই ইন্টারনেটের জন্মস্থান। সেখানেই ইন্টার্নশিপের সুযোগ পেয়েছিলেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির মাহিম ইসলাম। পড়ুন তাঁর অভিজ্ঞতা।

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় সার্নের ক্যাম্পাসে মাহিম
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

স্কুলে সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে নিয়ে একটা লেখা পড়েছিলাম। সেখানেই প্রথম জানতে পারি, পদার্থবিজ্ঞানের একটা গোটা কণা শ্রেণির নাম এই বাঙালি বিজ্ঞানীর নামে, ‘বোসন’। পরে জানলাম, ২০১২ সালে সুইজারল্যান্ডের সার্নে আবিষ্কৃত হয়েছে ‘হিগস বোসন’, যাকে ‘গড পার্টিকেল’ নামেও ডাকা হয়। নামের অর্ধেকটা আমাদেরই একজনের, ছোটবেলার সেই ভাবনাটা মাথায় থেকে গিয়েছিল।

সেখান থেকেই সার্ন নিয়ে কৌতূহল। পড়তে শুরু করলাম লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার নিয়ে। মাটির প্রায় ১০০ মিটার নিচে ২৭ কিলোমিটার লম্বা একটা বৃত্তাকার পথ, যার ভেতর কণাগুলোকে আলোর গতির কাছাকাছি বেগে ছুটিয়ে পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটানো হয়। সেই সংঘর্ষে তৈরি হওয়া বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা খোঁজেন পদার্থের মৌলিক গঠন ও মহাবিশ্বের ইতিহাসের নানা উত্তর। তখন এসব আমার কাছে দূরের একটা পৃথিবী ছিল। সেখানে আমি কখনো কাজ করতে পারব, ভাবিইনি।

আরও পড়ুন

সার্নের সামার স্টুডেন্ট প্রোগ্রামে আবেদন করতে উৎসাহ জুগিয়েছিল আমার দুই সিনিয়র, জারিন আনজুম ও জেমস পিটার গোমেজ। আবেদনে লাগে সিভি, স্টেটমেন্ট অব পারপাস, একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট ও সুপারিশপত্র। সত্যি বলতে, আমার সিজিপিএ খুব ভালো ছিল না। কোনো অধ্যাপকের কাছ থেকে সুপারিশপত্রও জোগাড় করতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত আমাদের ল্যাব ইনস্ট্রাক্টর আমাকে একটি সুপারিশপত্র লিখে দিয়েছিলেন।

তখন আমার ভরসা বলতে ছিল নিজের আগ্রহে করা কিছু প্রজেক্ট। ক্লাসের বাইরে সময় নিয়ে সেগুলো বানিয়েছিলাম, শুধু ভালো লাগত বলে। আবেদন করার সময় সেগুলোই দেখিয়েছিলাম। হয়তো সেগুলোই কোথাও কাজে দিয়েছিল।

ফল প্রকাশের শেষ ধাপ ছিল ২৯ এপ্রিল। মাগরিবের নামাজ পড়ে বাসায় ফিরে মেইলটা খুললাম। দেখলাম, আমি নির্বাচিত হয়েছি।

২১ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী আবেদন করেছিলেন, সুযোগ পেয়েছিলেন ৩২২ জন, ৯০টিরও বেশি দেশ থেকে। বাংলাদেশ থেকে আমি একাই। বাংলাদেশ সার্নের সদস্যরাষ্ট্রও নয়। তাই মেইলটা পড়ার পর কয়েক মুহূর্ত কী করব, বুঝতে পারছিলাম না। মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করা ছাড়া তখন আর কিছু মাথায় আসেনি।

পুরো যাত্রাটাই আমার জন্য নতুন ছিল। সার্ন যাতায়াতের খরচ, ভাতা ও ভিসা প্রক্রিয়ায় সহায়তা দিয়েছিল। জীবনে প্রথমবার বিমানে চড়াও ওই যাত্রাতেই। থাকতাম ফ্রান্সের সাঁ-জেনি এলাকায়, আর কাজ করতাম সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় সার্নের ক্যাম্পাসে। সকালে এক দেশ থেকে আরেক দেশে গিয়ে অফিস করা, প্রথম কয়েক দিন ব্যাপারটা সত্যিই অদ্ভুত আর মজাদার লাগত।

সার্নে ইন্টার্নশিপের সুযোগ পেয়েছিলেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির মাহিম ইসলাম
ছবি: মাহিমের সৌজন্যে

আমি কাজ করেছি সার্নের অ্যালিসের (আ লার্জ আয়ন কোলাইডার এক্সপেরিমেন্ট) কম্পিউটিং গ্রিড নিয়ে। আমার দুই সুপারভাইজার ছিলেন নরওয়ে ও রোমানিয়ার।

আমার কাজটা একটু সহজ করে বলি। সার্নের এলএইচসি (লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার) নামে একটা যন্ত্র আছে। এই যন্ত্রের কাজ হলো, তীব্র গতিতে পরমাণুর ক্ষুদ্র কণাগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ ঘটানো এবং এর মাধ্যমে পদার্থের মূল উপাদান নিয়ে গবেষণা করা। এলএইচসিতে যে বিপুল পরিমাণ তথ্য তৈরি হয়, তা একটিমাত্র কম্পিউটারে বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। তাই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে থাকা হাজার হাজার কম্পিউটার মিলে এই কাজ ভাগ করে নেয়।

আমার কাজ ছিল অ্যালিসের সফটওয়্যারকে নতুন ধরনের প্রসেসরে চালানোর উপযোগী করা। এগুলো তুলনামূলকভাবে কম বিদ্যুৎ খরচ করে এবং ভবিষ্যতে বড় কম্পিউটিং অবকাঠামোর খরচ কমাতে কাজে লাগতে পারে। শুনতে হয়তো বেশ ‘টেকনিক্যাল’ মনে হচ্ছে। কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল, আমি যে কোডটা লিখছি, সেটা আমার কম্পিউটারে শুধু ‘চলছে’ কি না, সেটাই শেষ কথা নয়। পৃথিবীর অন্য প্রান্তের গবেষকেরাও যেন সেটার ওপর নির্ভর করতে পারেন, সেই দায়িত্বও নিতে হয়েছে। একজন ছাত্র হিসেবে এই অনুভূতি বেশ আলাদা।

সার্নে যাওয়ার পর বুঝেছি, ল্যাবের বাইরের অভিজ্ঞতাগুলোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বই আর ভিডিওতে অ্যালিস ডিটেক্টর বহুবার দেখেছি। কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে ওই বিশাল যন্ত্রটা দেখার অনুভূতি অন্য রকম। প্রকাণ্ড একটা যন্ত্র, অথচ তার প্রতিটি অংশ কত নিখুঁতভাবে তৈরি!

সার্নের লাইব্রেরিতে কাচের বাক্সে রাখা নোবেল পদক দেখেছি। আবার যে ভাষায় আমি প্রতিদিন কোড লিখি, সেই সি++ এর জনক বিয়ারনে স্ট্রোস্ট্রুপের বক্তৃতাও সরাসরি শুনেছি। যাঁদের কাজ এত দিন বই, ইউটিউব বা কম্পিউটার স্ক্রিনের মধ্যে দেখেছি, তাঁদের সামনে বসে কথা শুনতে পারাটা নিজের কাছেই একটু অবাস্তব লাগছিল।

আরেকটা জিনিস শিখেছি, প্রশ্ন করতে লজ্জা পাওয়া উচিত নয়। ঘরভর্তি গবেষকের সামনে ‘আমি বুঝিনি’ বলতে পারাটাও একধরনের আত্মবিশ্বাস। সার্নে সবাই সবকিছু জানে না। কেউ কিছু না জানলে প্রশ্ন করে, অন্য কেউ উত্তর দেয়। তারপর আবার কাজ এগিয়ে যায়। এই সংস্কৃতিটা আমার খুব ভালো লেগেছে।

ছুটির দিনে বন্ধুদের সঙ্গে সুইজারল্যান্ড, ইতালি আর ফ্রান্সের নানা জায়গায় ঘুরেছি। পাহাড়-পর্বতে উঠেছি, জেনেভা লেকে সাঁতার কেটেছি, নতুন নতুন খাবার খেয়েছি। প্রত্যেকের ভাষা, সংস্কৃতি, খাবার, জীবনযাপনের ধরন আলাদা, কিন্তু কাজের জায়গায় সবাই একই সমস্যার সমাধান করতে বসে।

আমিও তাদের বাংলাদেশের গল্প বলেছি। ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া একটা দেশের কথা অনেকেই আগে জানত না। বাঙালিরা যে ভীষণ বিদ্রোহী এক জাতি, অনেকে সেটা জেনে অবাক হয়েছে।

সার্নে যাওয়ার আগে ভাবতাম, সেখানে পৌঁছানোই হয়তো সবচেয়ে বড় অর্জন। ফিরে এসে মনে হয়েছে, আসল ব্যাপারটা ছিল সেখানে গিয়ে নিজেকে অন্যভাবে দেখা। আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, যে সিজিপিএ পেয়েছি, বা আমার আগের ফলাফল, এসবের বাইরে গিয়েও আমি কোনো একটা কাজে অবদান রাখতে পারি। নিজের হাতে বানানো একটা ছোট প্রজেক্টও কখনো কখনো দরজা খুলে দিতে পারে।

দেশে ফিরে জুনিয়রদের তাই একটা কথাই বলি, ফলাফল খারাপ হয়েছে বলে নিজেকে আগে থেকেই বাদ দিয়ো না। যোগ্যতার সবটা শুধু ট্রান্সক্রিপ্টে লেখা থাকে না। যে বিষয়ে সত্যিই আগ্রহ, সেটা নিয়ে নিজে থেকে কিছু বানাও, শেখো, চেষ্টা করো। সুযোগ এলে আবেদন করো। হয়তো দরজাটা খুলবেই।